৩ বছর ধরে ১০০ কার্ডধারীর চাল আত্মসাৎ ডিলারের

আপডেট : ০৭ জুন ২০২০, ০৬:৪৯ এএম

সাড়ে তিন বছর ধরে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির অন্তত ১০০ কার্ডধারীর চাল আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের এক ডিলারের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, স্থানীয় কাপাসিয়া ইউনিয়নের ডিলার জাহিদুল ইসলাম তার স্ত্রী, মা-বাবা ও ভাই-বোনসহ ৩০ আত্মীয়ের নাম সুবিধাভোগীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এভাবে ১৬ দফায় প্রায় ৪৮ টন চাল আত্মসাৎ করেছেন এই ডিলার, যার আর্থিক মূল্য প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ টাকা। এ নিয়ে ডিলার জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। আর এসব অনিয়ম চাল বিতরণের দায়িত্বে থাকা ট্যাগ অফিসারের যোগসাজশে হয়েছে বলে ওই অভিযোগে জানানো হয়েছে।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, সুবিধাভোগীর তালিকায় ডিলার জাহিদুল ইসলাম তার বাবা আব্দুল কাদের, মা জরিনা বেগম, ভাই জহুরুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর মিয়া, বোন আইছছুল বেগম, চাচা আব্দুল ওয়াহেদ, চাচি লাইলী বেগম, ভাবি সালেমা বেগম, হাজেরা বেগম, ভাতিজা নূর আলম এবং স্ত্রীসহ মোট ৩০ স্বজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আর গত সাড়ে তিন বছর ধরে তাদের নামে চাল উত্তোলনও করছেন।

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ভূমিহীন, কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর ও ভিক্ষুকসহ দুস্থ কার্ডধারীরা সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর, মার্চ ও এপ্রিলে ১০ টাকা কেজিতে ৩০ কেজি করে চাল পান। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কর্মসূচিটি শুরু হলেও ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে সরকারি গুদামে চাল সংকটের কারণে স্থগিত হয় এবং ২০১৮ সালের মার্চ থেকে আবারও শুরু হয়। সে হিসেবে গেল মার্চ পর্যন্ত ১৬ দফায় অন্তত ১০০ জনের প্রায় ৪৮ টন চাল আত্মসাৎ করেছেন ডিলার জাহিদুল। যা টাকার অঙ্কে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ টাকা।

ইউএনওর কাছে দেওয়া অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৬ দফায় চাল পেয়েছেন ডিলার জাহিদুল ইসলামের পরিবারের ৩০ সদস্য। এতে করে প্রকৃত গরিব ও দুস্থরা বঞ্চিত হয়েছেন। সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল আত্মসাতের সংবাদ প্রকাশ হলে কাপাসিয়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের মানুষ তালিকা যাচাই করেন। ওই তালিকায় নিজেদের নাম দেখতে পান ভুক্তভোগী বঞ্চিত প্রকৃত কার্ডধারীরা। পরে একে একে বের হতে থাকে ডিলার জাহিদুলের কার্ড জালিয়াতির ঘটনা। এ নিয়ে গত ১৩ ও ১৯ মে উপজেলা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) লিখিত অভিযোগ দেন বঞ্চিতরা। এর প্রেক্ষিতে ইউএনও বিষয়টির তদন্ত করতে নির্দেশ দেন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে। তারা তদন্তকালে ডিলারের অনিয়মের সত্যতা পান। এ পরিস্থিতিতে ডিলার জাহিদুল ইসলাম বঞ্চিত কার্ডধারীদের বাড়িতে গিয়ে কার্ড দিয়ে আসেন ও ভয়ভীতি দেখান।

বঞ্চিত কার্ডধারী ছবেদ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুরু থেকে একবারও চাল পাইনি। আমরা ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এবার শুধু এপ্রিলের চাল পেয়েছি। এতে আমরা খুব খুশি। তবে আমরা আমাদের প্রত্যেকের এ যাবৎকালের সব পাওনা চাল চাই।’

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিলার জাহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে আমি এই ব্যবসা করে আসছি। এ ঘটনায় আমি যড়যন্ত্রের শিকার। আর আমার অজান্তে পরিবারের সদস্যরা কেউ কার্ড পেয়ে থাকতে পারে।’

অন্যদিকে যোগসাজশের অভিযোগ অস্বীকার করে ট্যাগ অফিসার ও ভাটি কাপাসিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছি। অনিয়মের সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আলাউদ্দিন বসুনিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ছাড়াও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এ ঘটনার তদন্ত করেছি। সেই রিপোর্টও জমা দিয়েছি। এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা ইউএনও নেবেন।’

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী লুৎফুল হাসান গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুজন কর্মকর্তা তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছেন। সেখানে নতুন একজনকে ট্যাগ অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন ইউপি সচিবকে দিয়ে চাল বিতরণ চলছে। শীঘ্রই তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ডিলারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত