১৯৮৬। খেলাধুলায় এই সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়েছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। হাত দিয়ে গোল করেছেন। শতাব্দীর সেরা গোলে বিশ্বকাপ জিতেছেন। তবে বছরটা ম্যারাডোনার হলেও ১০ জুন দিনটা ভারতের। এই দিনে লর্ডসে প্রথম টেস্ট জিতেছিল ভারত।
ক্রিকেটের মক্কায় তিরাশির বিশ্বকাপ জিতেছিল কপিল দেবরা। সেই জয় ওয়ানডেতে ভারতকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। ছিয়াশির লর্ডস তাদের টেস্টে প্রতিষ্ঠিত করে। ওই মাঠে ১১ টেস্ট খেলে ওটা ছিল ভারতের প্রথম জয়। পরে তারা আরও একটা টেস্ট জিতেছে লর্ডসে। ২০১৪ সালে। দ্বিতীয় ইনিংসে ৭ উইকেট নিয়ে ইশান্ত শর্মা একাই গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন ইংল্যান্ডকে। ৪ উইকেটে ১০৫ রান নিয়ে পঞ্চম দিন স্বাগতিকরা ব্যাট করতে নামে। অ্যালিস্টার কুক আর ইয়ান বেলের উইকেট শর্মা চতুর্থ দিনেই তুলে নিয়েছিলেন। শেষ দিন লাঞ্চের আগে অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি তাকে শর্ট বল করতে বলেন। ইশান্ত প্রথমে রাজি হননি। ম্যাচটা জেতার পর মিডিয়াকে সেই কাহিনী বলেছিলেন ধোনি, ‘আজ লাঞ্চের আগের শেষ ওভারে ইশান্ত তো শর্ট বল করতেই চাইছিল না! আমি ওকে স্রেফ বললাম, তোমাকে সেটাই করতে হবে আর বলেই পেছন ফিরে কিপিংয়ের জায়গায় চলে গেলাম। তার পরেই ইশান্তের ওই অসাধারণ পারফরম্যান্স।’ ক্যাপটেনের প্রতি কৃতজ্ঞ ইশান্ত উত্তরে বলেন, ‘এই উইকেটগুলোর একটাও আমার নয়। এগুলো সব আমার ক্যাপ্টেনের জন্য। ক্যাপ্টেন আমাকে বলেছিল, তুমি যথেষ্ট লম্বা। তোমাকে বাউন্সার দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।’
এমন অনেক গল্প ছিয়াশির লর্ডসও উপহার দিয়েছিল ভারতকে। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করেছিলেন ‘কর্নেল’ দিলীপ ভেংসরকার। অনেকে তার খেলার স্টাইলের সঙ্গে সি কে নাইডুর ব্যাটিংয়ের মিল পান। তিনিও নাইডুর মতো জঙ্গিমনোভাবে ব্যাটিং করতেন। ক্রিকেট মক্কায় তার সেঞ্চুরি সংখ্যা তিনটি। কোনো বিদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে যা সর্বাধিক। যে কারণে ভেংসরকারকে বলা হয় ‘লর্ডসের লর্ড’। ভারতের হয়ে ১১৬টি টেস্ট খেলেছেন। ওয়ানডে খেলেছেন ১২৯টি । ৮৩’র বিশ্বকাপ জিতেছেন। ৮৫’র বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন। দেশকে নেতৃত্বও দিয়েছেন। তবে সব ছাপিয়ে লর্ডসই তাকে অমরত্ব দিয়েছিল। যেমন দিয়েছিল কপিলকেও।
ছিয়াশির লর্ডসে আগে ব্যাট করেছিল ইংল্যান্ড। গ্রাহাম গুচের সেঞ্চুরিতে ২৯৪তে অলআউট হয়। গাওয়ার-গ্যাটিং এবং গুচকে আউট করেছিলেন চেতন শর্মা। ৬৪ রানে পাঁচ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। জবাবে ভারত করেছিল ৩৪১ রান। ভেংসরকার ১২৬ রানে অপরাজিত ছিলেন। মহিন্দর অমরনাথ করেন ৬৯। ইংল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংসে ১৮০ রানে গুটিয়ে যায়। ৫২ রানে ৪ উইকেট নেন অধিনায়ক কপিল। ৩ উইকেট নিয়েছিলেন মানিন্দর সিং। পঞ্চম দিনে মাত্র ১৩৪ রান তাড়া করতে নেমে এক পর্যায়ে ভারতের স্কোর ছিল ৪ উইকেটে ৭৮। কপিল দেব মাঠে আসেন যখন দলের রান ৫ উইকেটে ১১০। নেমেই ১০ বলে ২৩ রান তুলে ম্যাচ শেষ করে দেন। কপিলই ম্যাচ সেরা হন। তবে লর্ডসে টানা তিন টেস্ট সেঞ্চুরির কীর্তি গড়া ভেংসরকারও পুরস্কারটা পেতে পারতেন। ওই টেস্ট হারের ফলে ডেভিড গাওয়ারের ক্যাপ্টেন্সির পতন শুরু হয়েছিল।
ভারত সেই সিরিজ ২-০তে জিতেছিল। অধিনায়ক কপিল দেব দারুণ খেলেছিলেন। অবশ্য ইংল্যান্ডে বরাবরই ভালো খেলেন তিনি। ঊনআশির সফরে সাড়া জাগানো বোলিং করে ইয়ান বোথামকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফেলে দিয়েছিলেন। তিরাশিতে করেছিলেন ১৭৫ নট আউট। তাছাড়া লর্ডসে ভিভ রিচার্ডসের সেই ক্যাচ। বিশ্বকাপ জয়। ছিয়াশিতে অধিনায়ক হিসেবে সিরিজ জয়। নব্বইতে এডি হেমিংসকে লর্ডসেই পরপর চার ছক্কা মেরেছিলেন কপিল। ইংল্যান্ডের মাঠেই কেন এত সাফল্য? ‘ঠিক বলতে পারব না। তবে ইংল্যান্ডের অপেক্ষাকৃত ছোট মাঠ, সবুজ উইকেট, বল সিমে পড়ে বাঁক নিচ্ছে... এগুলো আমার মনকে অদ্ভুত চ্যালেঞ্জে ফেলে দিত। একটা অদৃশ্য শক্তি ডাক দিয়ে বলত, দ্যাখ তো পারিস কি না? আমি সেই উত্তেজনার পেছন পেছন ছুটতাম। ইংল্যান্ডে খেলতে আমি ভীষণ আনন্দও পেতাম। এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সব কিছু। সবুজ ঘন ঘাসের আউটফিল্ড। এখানকার সামার মনে হতো আমাদের দেশের উইন্টার। মনে হতো সারা দিন এখানে বল করে যেতে পারি। মনে হয় ইংল্যান্ডের মাঠ একটা নির্ভরতা দিত।’
কপিলের নির্ভরতা ছিল ইংল্যান্ডের মাঠ। ভারতের নির্ভরতা ছিল লর্ডস। এই মাঠেই ভারতীয় ক্রিকেটের উত্থানের বড় কাহিনীগুলো লেখা হয়েছে। সৌরভ গাঙ্গুলি জার্সি উড়িয়েছেন। কপিলের হাতে উঠেছে বিশ্বকাপ। তাছাড়া এই মাঠেই প্রথম টেস্ট খেলেছিল সিকে নাইডুর ভারত। ১৯৩২ সালের ২৫ জুন। হোম অব ক্রিকেটে ভারতের প্রথম টেস্ট জয় ১০ জুন। লর্ডসে ভারত বিশ্বকাপও জিতেছিল ২৫ জুনে। তাহলে কি জুন মাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে রহস্য!
