করোনা পরিস্থিতিতে সমস্যায় পড়া দেশের পোশাক খাত আগামী পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যে আগের অবস্থানে ফিরবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন নিট গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক।
করোনাভাইরাসের ক্ষতি মোকাবিলায় সরকারের ঘোষিত বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সংলাপে অংশ নিয়ে তিনি এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ফজলুল হক বলেন, অন্য সব খাত থেকে গার্মেন্টসের ব্যাপারটা একটু আলাদা। গার্মেন্টসের সমস্যা দ্বিমাত্রিক। একটা স্থানীয়, অন্যটা আন্তর্জাতিক। সরকারি ঋণ অথবা আমি আমার টাকা দিয়ে হয়তো এখানে কারখানা চালু রাখলাম। কিন্তু যতক্ষণ চাহিদা যথাযথভাবে সৃষ্টি না হচ্ছে, বায়ার থেকে আমরা অর্ডার না পাচ্ছি, ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরে যেতে পারছি না।
তিনি বলেন, আমরা কঠিন একটা সময় পার করছি। আমি বরাবরই আশাবাদী একটা লোক। আমি আশা করি সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে আমরা আগের জায়গায় ফিরে যেতে পারব। কপাল ভালো থাকলে আমরা আগের চেয়েও ভালো করতে পারি।
এ আশার পেছনে যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে নানা রকম বাণিজ্যযুদ্ধ এবং ইউরোপ ও আমেরিকা কয়েকদিন আগে একটি অনানুষ্ঠানিক জোট ঘোষণা করেছে। একটা বড় ধরনের চীনবিরোধী মনোভাব তৈরি হচ্ছে। আমরা আশা করছি ভালো অর্ডার ওখান থেকে স্থানান্তরিত হবে। তবে সেটা কালকেই হবে না, এর জন্য সময় লাগবে। এ বছরের শেষের দিকে গার্মেন্টস খাতের অর্ডারের ক্ষেত্রে আমরা একটা ভালো ফ্লো আশা করতে পারি। তবে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে গার্মেন্টগুলোকে টিকিয়ে রাখা।
তিনি বলেন, ছয় মাস কারখানাগুলো টিকিয়ে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ কারখানা চালু না থাকলে সুযোগ তৈরি হলেও কোনো বন্ধ কারখানায় কেউ অর্ডার দেবে না। আমি মনে করি কারখানাগুলো আমরা কীভাবে চালু রাখতে পারব, এটাই বড় চ্যালেঞ্জ। শ্রমিকদের বেতন, মজুরি, অন্যান্য আনুষঙ্গিক অনেক বড় খরচ। মাঝারি মানের একটি ফ্যাক্টরি চালু রাখতে মাসে চার-পাঁচ কোটি টাকা খরচ করতে হয়, এটা উৎপাদন খরচের বাইরে। তিনি বলেন, গার্মেন্টসের জন্য সরকারের প্যাকেজ যে মেকানিজমে তৈরি হয়েছে, এটা মোটামুটিভাবে নিশ্চিত অন্য কারও হাতে এই টাকা যায়নি। সরকার ঘোষিত প্যাকেজটি পোশাক খাতের জন্য খুবই ভালো। এজন্য অন্তত কারখানা চালু রাখা গেছে। কিন্তু আগামী এক-দেড় মাস পর কী হবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এটা নির্ভর করছে অর্ডারের পরিমাণের ওপর ও এরপর সহায়তা কী পরিমাণ লাগবে।
সংলাপে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন ও গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। এই প্রতিবেদনটি সিপিডির ‘বাংলাদেশ উন্নয়নের স্বাধীন পর্যালোচনা (আইআরবিডি)’ প্রকল্পের আওতায় তৈরি করা হয়েছে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চলছে। ইন্টারপোল তাদের সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশকে করোনা অতিমারীর কারণে আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তালিকায় রেখেছে। এ অবস্থায় সুশাসনের অভাব ও আইনের শাসন প্রয়োগ না হলে ক্রমবর্ধমান মন্দঋণের চাপ ও তারল্য সংকটের ঝুঁকি নিয়ে সুষ্ঠুভাবে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এতে অসাধু গোষ্ঠীর সুযোগ নেওয়ার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। এছাড়া সরকারের চলমান ত্রাণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতার অভাব ও দুর্নীতির খবর প্রকাশ পাচ্ছে। প্রকৃত জনগোষ্ঠীর কাছে প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা পৌঁছে দিতে হলে সুবিধাভোগী বাছাই, ত্রাণ বিতরণ ও ত্রাণের আওতা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম বিস্তৃত করা জরুরি।
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সিপিডির জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ১৫ শতাংশ শ্রমিক এপ্রিলের পুরো বেতন পেয়েছেন, বাকিরা কেউ আংশিক ও ২৭ শতাংশেরও বেশি শ্রমিক অর্ধেকেরও কম বেতন পেয়েছেন বা একেবারেই কিছু পাননি। প্রায় ৬৩ শতাংশ শ্রমিক বাড়িভাড়া দিতে পারেননি। জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৩৫ শতাংশ শ্রমিক বর্তমানে কর্মহীন। তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্র মাঝারি ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা অনিশ্চিত অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়েছেন। তারা ব্যাংক থেকে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ পাচ্ছেন না। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে আরও সহযোগিতার পরামর্শ দেন তিনি।
সংলাপে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালন ড. আহসান এইচ মনসুর, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক লীলা রশিদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
