করোনায় তামাদি সংকট নিরসনে আইন জরুরি

আপডেট : ১২ জুন ২০২০, ০৩:৪৬ এএম

এই করোনা দুর্যোগে সবচেয়ে বেকায়দায় পড়েছেন আমাদের আদালত সংশ্লিষ্টরা। ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত দেশের আর সব কিছুর মতো আদালতগুলোও ছিল সাধারণ ছুটিতে। জরুরি কয়েকটির মতো শুধু জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি চালু ছিল কেবল গ্রেপ্তার হওয়া আসামির হাজতি পরোয়ানা ইস্যুর কাজে। ১০ মে থেকে আদালত এখন আছে ভার্চুয়ালে জরুরি আর জামিন শুনানিতে। তারও আগে ১৯ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন কারাবন্দি আসামিদের আদালতে হাজির করা বারণ করে, অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রয়োজনে মামলার কার্যক্রম মুলতবি রাখতে নির্দেশনা জারি করে। সাধারণ ছুটিতে ২ মাস থাকলেন বিচারক ও কর্মচারীরা। জরুরি আর জামিনের কাজ আছে অল্প কিছু আদালতে, বাকিরা এখনো বসে। জমে থাকা ৩৬/৩৭ লাখ মামলার বিচারপ্রার্থীরা তো অপেক্ষার প্রহর গোনায় অভ্যস্ত হয়েই আছেন। আইনজীবী ও তাদের ক্লার্করাও আছেন বেকায়দায়। স্ট্যাম্প ভেন্ডার, ফটোকপিওয়ালা, চাওয়ালা, বাদামওয়ালা, (পকেটমারও!) সবাই পড়েছেন বিপাকে।

ভার্চুয়ালে জায়গা হচ্ছে না সবার (অ্যাকচ্যুয়ালে তো গাদাগাদি!)। নিয়মিত আদালতের সব কাজ হচ্ছে না, সম্ভবও নয় ভার্চুয়ালে। জরুরি আর জামিনের যে কাজ হচ্ছে তাতে শুধু দরখাস্ত সাবমিট (দাখিল) আর সাবমিশন (আইনজীবীর বক্তব্য পেশ) ছাড়া তার আগে পরের বাকি সব কাজই করতে হচ্ছে সরেজমিন। এই ‘গোদের’ ওপর এখন উঠেছে তামাদির ‘বিষফোঁড়া’! জামিনের দরখাস্ত করতে না পারলে আরও কিছুদিন হাজতবাস (চাইলেই তো আর জামিনের নিশ্চয়তা নেই), জরুরি বিবেচনায় মক্কেল, আইনজীবী আর বিচারকের বোধ একসঙ্গে মেলে না সব ক্ষেত্রে। এসব তবু সওয়া যায়!

কিন্তু, আদালতে মামলা-মোকদ্দমা দাখিলে তামাদি (নির্ধারিত সময়সীমা) বলে কঠিন বিধান রয়েছে আইনে। অবশ্য আপিল, রিভিশন, রিভিউ এবং আরও কিছু দরখাস্তের ক্ষেত্রে বিলম্ব মওকুফের বিধানও আছে ১৯০৮ সালের তামাদি আইনের ৫ ধারায়। কিন্তু, সে বিধান প্রযোজ্য নয় দেওয়ানি মূল মামলা, ডিক্রি/আদেশ জারির (কার্যকরের) মামলা, এমনকি পিডিআর অ্যাক্টে সরকারি পাওনা আদায়ের সার্টিফিকেট মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে। তামাদি আইনের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে না পারলে ঐসব দায়েরের অধিকার চিরতরে শেষ, ৩ ধারার মোদ্দাকথা এই। তামাদি আইন ছাড়া আর যে সব আইনে মামলা, আপিল, রিভিশন, রিভিউ, দরখাস্ত দাখিলের নিজস্ব সময়সীমা আছে, সেসব ক্ষেত্রেও বিলম্ব মওকুফে তামাদি আইনের ৫ ধারা প্রয়োগের সুযোগ নেই, প্রযোজ্য করা আছে এমন দু’একটি আইন ছাড়া। তামাদি আইনের ২৯ ধারার বিধান এই। এসব দায়েরের অধিকারও যাবে চিরতরে। বেদখলি সম্পত্তি উদ্ধারের ব্যাপার হলে তো স্বত্বই যাবে চলে ২৮ ধারার বিধানে। ফৌজদারির এজাহার, নালিশ দায়েরে কোনো তামাদি নেই, যদিও বিলম্বের ব্যাখ্যা দিতেই হয় মামলার বিশ্বাসযোগ্যতার খাতিরে।

আইনজীবীরা উৎকণ্ঠিত হলেন বিশেষভাবে চেক ডিজঅনারের এন.আই.অ্যাক্টের (নেগোসিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১) ১৩৮ ধারার মামলা দাখিল নিয়ে। ব্রিটিশের এ আইনে ১৩৮-১৩৯ ধারার এই শেষ (১৭শ) অধ্যায়টি আদিতে ছিল নোটারি পাবলিক সংক্রান্ত। পাকিস্তানে এখনো সেই অবস্থাতেই আছে। ভারত ১৯৮৮ সালে এই অধ্যায়ে সেটা বাদ দিয়ে চেক ডিজঅনার সংক্রান্তে ফৌজদারি ব্যবস্থা লাগায়। সেই অনুকরণে আমাদের দেশে ১৯৯৪ সালে প্রায় হুবহু সেই ব্যবস্থাই করা হয়। ভারত ২০০২ সালে এই আইনে ইলেক্ট্রনিক্যাল বিষয়গুলোর বিধান যুক্ত করে ডিজিটাল যুগের উপযোগী করে নিয়েছে। আমাদের দেশে ২০০০ ও ২০০৬ সালে দু’বার সংশোধন হলেও ইলেক্ট্রনিক বিষয়গুলো মোটেও যুক্ত হয়নি আজও। চেক ডিজঅনারে ফৌজদারির এই বিধানে সুবিধা নাকি অসুবিধা বেশি হয়েছে সে আরেক জটিল আলোচনা। এখানে চেক ইস্যুর তারিখ লিখিত, চেকের ভ্যালিডিটি মেয়াদ নির্ধারিত, সেই মেয়াদের মধ্যে ব্যাংকে উপস্থাপিত চেক ডিজঅনারের তারিখ লিখিত, বিবাদিকে নোটিস পাঠাবার তারিখ লিখিত। অন্য মামলায় কারণ উদ্ভবের তারিখ আইনজীবী নিজে সুবিধামতো বসিয়ে দিতে পারলেও (আমাদের প্রজন্মের অনেকের এসএসসি সার্টিফিকেটে লেখা জন্মতারিখের মতো) চেক ডিজঅনারের এই মামলায় তা সহজ নয়। আইনজীবীদের দাবিতে একটা সুরাহা মিলেছে। ৭ মে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন এই মামলাসহ আর যত মামলা ও আপিল দায়েরে বিলম্ব মওকুফের সুযোগ নেই সে-সব এখন ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে দায়েরের নির্দেশনা দিয়েছে।

কিন্তু, তামাদি সংকটের সবটুকু যায়নি তাতে। এই এলোমেলো সময়ের বিপর্যস্ত জীবনে অনেকের তামাদির সময়সীমা ইতিমধ্যেই শেষ, অনেকে চেক ব্যাংকে উপাস্থাপনের বা নোটিস ইস্যু করতেই পারেননি। সবচেয়ে বড় কথা, খোদ চিকিৎসকেরই প্রাইভেট চেম্বার যেখানে বন্ধ, সেখানে আইনজীবী সবাই চেম্বার খুলে বসে থাকার আর মক্কেলকে স্বাগত জানাবার অবস্থায় আছেন কি! আরও বড় কথা, গণপরিবহন ৩১ মে পর্যন্ত ছিল একেবারেই বন্ধ। এখন সীমিত পরিসরে যদিও আধাখোলা তাতে সবার সওয়ার হওয়ার সাহস আছে কি! এমন এলোমেলো সময়ে সব মক্কেলের পক্ষে সব কাগজপত্র নিয়ে আইনজীবীর কাছে যাওয়া, মামলা সাজানো সম্ভব নয়। তাই, তামাদির এই সংকট পুরোপুরি কাটাতে দরকার নতুন একটি আইন। সে দায়িত্ব অবশ্যই সুপ্রিম কোর্টের নয়, সরকারের।

আইন করেই এমন তামাদি সংকট একবার কাটানো হয়েছিল আমাদেরই দেশে। জনজীবন এমনই এলোমেলো বিপর্যস্ত ছিল মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস। ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের বিজয়, ভারতের প্রবাস থেকে সরকার দেশে ফিরল ২২ ডিসেম্বর। ১৯৭২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জারি হয় “ই Bangladesh (Legal Proceedings) Order, 1972 (President’s Order, ”। ১৯৭২ সালের এই ১২ নম্বর আইনে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত পুরো এক বছরকাল বাদ রাখার বিধান করা হয় সব ধরনের মামলা, আপিল, রিভিশন, রিভিউ, রেফারেন্স দায়েরের তামাদি গণনায়। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যত একতরফা রায়, ডিক্রি, আদেশ হয়েছিল এবং তদবির অভাবে যত খারিজাদেশ হয়েছিল সব বাতিল করে সেসব আবার চালু করা হয়েছিল।

এই করোনা মহামারীতে যেদিন থেকে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে সেদিন থেকে যতদিন স্বাভাবিক না হয় ততদিনের করোনাকাল তামাদি গণনা থেকে বাদ দিতে তেমন একটি আইন দরকার। দিতে হবে এই সময়ের একতরফা নিষ্পত্তি, তদবিরের অভাবে খারিজের আদেশগুলো বাতিলের বিধান। সরকারি চাকুরের বিভাগীয় সাজার বিরুদ্ধে আপিলাদি, দুদকে সম্পদ বিবরণীর মতো অনেক কর্র্তৃপক্ষের কাছে দরখাস্তাদি দাখিলেরও নির্ধারিত সময়সীমা আছে, বিলম্ব মওকুফের সুযোগ নেই, সেখানে দাখিল না করে আদালতে আসারও সুযোগ নেই। এসব কর্র্তৃপক্ষের কাছে ঐসবের সময় গণনায় এই করোনাকাল বাদ দেওয়ারও বিধান থাকা প্রয়োজন। নিশ্চয়ই যথাসময়ে আইনটি হবে।

শেষবেলা চুপিচুপি একটা হিতোপদেশ। পারলে ঝামেলা আপোসে মিটিয়ে ফেলুন। আদালতে ঢুকলে বেরোবার পথ পাওয়া কত কঠিন তা জানেন যারা ঢুকে আছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ১৬শ (১৮৬১-১৮৬৫) প্রেসিডেন্ট স্বনামখ্যাত আব্রাহাম লিংকনের (ছিলেন বড় মাপের আইনজীবীও, এক্ষেত্রে সুখ্যাতি এতটাই ছিল যে লোকে তাকে ‘Honest Abe’ বলত, ১৮৬৫ সালে মাথায় আততায়ীর গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন) “The nominal winner is often a real loser in fees, expenses and waste of time.” উক্তিটি তার দেশে বাসী হয়ে গেলেও আমাদের এখনো প্রাতঃস্মরণীয়।

‘মামলায় শেষ পর্যন্ত যার জয় হয় সেও আসলে অর্থ আর সময়ের অপচয়ে ক্ষতিগ্রস্তই।’ বাংলায় কথাটি সতর্কবার্তা হিসেবে আদালতে আর বারে টাঙিয়ে রাখার কথা এই বেলা ভাবতে পারেন। সরকারি হাসপাতালে ‘রোগী ধরা দালাল হইতে সাবধান’ সতর্কবার্তা, হালে সরকারি অফিসে ঘুষের অভিযোগ দুদকের হট লাইনে দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি টাঙিয়ে রাখায় দালাল আর ঘুষের উৎপাত বন্ধ না হলেও কিছু রোগী তো সাবধান হয়, কিছু ভুক্তভোগী তো দুদকে খবর দেয়।

লেখক

লেখক ও আইনগ্রন্থকার, সাবেক সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত