মিয়াঁদাদ মাঠে নামতেন ‘যুদ্ধ’ করতে

আপডেট : ১২ জুন ২০২০, ০৬:৫২ এএম

চাপে পরলেই জাভেদ মিয়াঁদাদের সেরা খেলা বেরিয়ে আসত। মাইকেল হোল্ডিং, ডেনিস লিলিদের বিপক্ষে বীরত্বের প্রমাণ দিয়েছেন। ১২৪ টেস্ট খেলে অবসরের পর অনেকে  বলেছেন, পাকিস্তানের সেরা ব্যাটসম্যান মিয়াঁদাদই। তবে আব্দুল হাফিজ কারদার এমন আন্দাজ কিন্তু অনেক আগেই করেছিলেন। সত্তরের দশকে তরুণ মিয়াঁদাদের ব্যাটিং দেখার পর পাকিস্তানের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক বলেছিলেন, ‘এটাই দশকের সেরা আবিষ্কার।’

করাচিতে ১৯৫৭ সালের ১২ জুন জন্ম নেওয়া মিয়াঁদাদের অভিষেক ১৯৭৬-এ, লাহোরে। অভিষেকেই সেঞ্চুরি দিয়ে শুরু নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। ১৬৩ রানের সেই ইনিংস আসিফ ইকবালকে মøান করে দিয়েছিল। লাহোরে সেদিন ১৬৬ রানের ইনিংস খেলেছিলেন আসিফ। তার মন্থর আর সাবধানী ইনিংস ১৯টা স্ফুলিঙ্গের মতো বাউন্ডারিতে আড়ালে ফেলে দেন মিয়াঁদাদ। সেই যে আলো কেড়ে নেওয়া শুরু করলেন আর থামেননি। রিচার্ড হ্যাডলিকে পিটিয়ে উত্থান। এরপর সামলেছেন হোল্ডিং, লিলি, মার্শালদের। আশির দশকের আগুনে ফাস্ট বোলারদের সম্পর্কে মিয়াঁদাদ নিজেই পরে বলেছিলেন, ‘প্রথম যখন লিলি-টমসনকে খেলতে যাই, আমার মনে হয়েছিল- জাভেদ এ কোথায় এসে পড়লে! এরপর দেখলাম গার্নার-মার্শাল। একে তো সামনের পায়ে যাওয়া বলে কোনো ব্যাপার নেই। তারপর যদি বা একটা হুক বা পুলে বাউন্ডারি মেরেছি, বোলিং মার্কে ফেরার সময় ওরা এমনভাবে তাকাত। যেন খুন করে ফেলবে। ৪ দানব পরপর বল করছে আর নির্বাক থেকেও প্রতি মুহূর্তে বোঝাচ্ছে, জীবনের মায়া থাকলে, দ্রুত কেটে পড়ো। সেই পরীক্ষায় জিতেছি। বলেছি, এটা আমার রাজত্ব। আমি থাকব। তোরা চলে যাবি।’ উইন্ডিজের বিরুদ্ধে ৬৪ ইনিংসে মিয়াঁদাদের রান ১৯৩০। শেষ ওয়ানডে খেলেছিলেন ১৯৯৩ সালে। হেল্ডিং-মার্শালরা ফুরিয়ে গেলেও ততদিনে ওয়ালশ-অ্যামব্রোস এসে গেছেন।

টেস্টে মিয়াঁদাদের সেঞ্চুরি আছে ২৩টি। গড় ৫২.৫৭। রান ৮৮৩২। ওয়ানডে খেলেছেন ২৩৩টা। গড় ৪১.৭০। সেঞ্চুরি ৮টি। তবে মিয়াঁদাদকে এই পরিসংখ্যানে ধরা যাবে না। তিনি ছিলেন সত্যিকার ম্যাচ উইনার। এখনকার দিনের কোহলি-রোহিতদের মতো। যখন টি-টোয়েন্টির জন্ম হয়নি, তখন শেষ বলে ছক্কা মেরে রুদ্ধশ্বাস জয় এনে দিয়েছেন। ১৯৮৬ সালে শারজাতে চেতন শর্মার শেষ বলে মিয়াঁদাদের সেই ছক্কা আসলে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ‘মাস্তানির’ বিজ্ঞাপন। আর এটা সেই সময়ের বিজ্ঞাপন যখন ওয়ানডেতে ব্যাটিং বিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

ইয়ান চ্যাপেল একবার বলেছিলেন, ‘আমার দলে থাকলে মিয়াঁদাদ হতো চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটার। কিন্তু বিপক্ষ দলে থাকলে ও বাস্টার।’ অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক কিন্তু এমন কথা স্রেফ মজা করে বলেননি। কারণ তিনি জানতেন লিলিকে ব্যাট হাতে তেড়ে যেতে পারেন একমাত্র মিয়াঁদাদ। আবার মাঠে সেই ব্যাট দিয়ে ফুল ফোটাতে পারেন তিনিই। মিয়াঁদাদ বলতেন, ‘ক্রিকেট মাঠে আমার কোনো বন্ধু নেই। হতেই পারে না। কারণ খেলাটা আমার কাছে যুদ্ধ। মাঠে আমি যুদ্ধে নামি এবং জিততে চাই।’

বেশিবার সেই যুদ্ধে জিতেছেন। ব্যাট-বলের লড়াইয়ে তাকে হারিয়ে দেওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু দলের ভেতর যখন ষড়যন্ত্র হয়েছে , হেরে গেছেন। রেকর্ড ভালো হওয়া সত্ত্বেও অধিনায়কত্ব রাখতে পারেননি। ৩৪ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে জিতেছেন ১৪টিতে। হার মাত্র ৬টি। ইমরান খান ফিরে এলে নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে হয়েছে। যেমন ১৯৯২-এর বিশ্বকাপ। পরে ওয়াসিম আকরামকে অধিনায়ক করা হয়েছিল। দল থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছিল মিয়াঁদাদকে। আড়াল থেকে নাকি কলকাঠি নেড়েছিলেন ইমরান খান। বিশ্বকাপ জেতার পরেই ১৯৯৩ সালে পাকিস্তান দল থেকে বাদ পড়েন মিয়াঁদাদ। সেই চক্রান্তে বাসিত আলিকে ব্যবহার করা হয়। বাসিত দলে আসার পর থেকেই মিয়াঁদাদের সঙ্গে তুলনা করা হতো। এক সাক্ষাৎকারে বাসিত বলেছিলেন, ‘মিয়াঁদাদকে দল থেকে বাদ দেওয়ার চক্রান্ত শুরু হওয়ার পর থেকেই আমাকে ওর সঙ্গে তুলনা করা হতো। সত্যি বলতে, মিয়াঁদাদ যে মানের ক্রিকেটার, আমি তার একাংশও নই।’

বিরুদ্ধ এক পরিস্থিতিতে লড়াই করে (পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনের) ’৯৬-র বিশ্বকাপ খেলেছিলেন মিয়াঁদাদ। কাপ জিততে পারেননি। তাতে কিছু এসে যায় না। ততদিনে তিনি কিংবদন্তি হয়ে উঠেছেন। ইমরানের মতো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তার ছিল না। মার্জিত রুচির ধারও ধারতেন না। বরাবর ছিলেন স্পষ্টবাক। আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটের সমালোচনা করে একবার বলেছিলেন, ‘এখন তো ক্রিকেট খেলাটাই বদলে গেছে। একটু বল এদিক ওদিক করলেই ব্যাটসম্যান কমপ্লেন করতে শুরু করে। বাবুদের ডিজাইনার পিচ চাই সব সময়। আর টিমগুলোর বোলিং স্ট্যান্ডার্ডও কত খারাপ হয়ে গেছে। আমাদের সময় চিন্তাটিন্তা করে রিটায়ার করতে হতো না। ফাস্ট বোলাররা এমন আক্রমণ করত যে, ওরাই যেন বলে দিত, যাঃ এবার খেলা ছাড়। এখন সেই সব বোলার কোথায়?’ 

ফাস্ট বোলিংয়ের বিপক্ষে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন। জিতেছেনও। আর জিততে জিততেই মিয়াঁদাদ তৈরি করেছেন নিজের ঘরানা। অভিজাত করাচির মতোই যা পাকিস্তান ক্রিকেটে বিশিষ্ট হয়ে আছে। থাকবেও চিরকাল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত