সত্য কাহিনি অবলম্বনে শিহাব শাহিন নির্মিত ওয়েব সিরিজ ‘আগস্ট ১৪’ নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। প্রশংসার পাশাপাশি ‘১৮+’ দৃশ্যের কারণে খানিকটা বিতর্কের শিকারও।
এবার সোশ্যাল মিডিয়ায় ওয়েব সিরিজটির রিভিউ করলেন ‘ঢাকা অ্যাটাক’ সিনেমার পরিচালক দীপংকর দীপন। সাতটি পয়েন্ট উল্লেখ করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন, পাশাপাশি খামতি দেখিয়ে দিতেও ভুললেন না।
পড়ুন তবে সেই রিভিউ—
“বন্ধুরা অল্প ভাল কাজ করলে আমার পেশাগত ঈর্ষা হয়- সেটা পজিটিভ ঈর্ষা। কিন্তু বন্ধুরা খুব ভাল কাজ করলে আমার খুব আনন্দ হয়। সেটা সৃষ্টিশীলতার আনন্দ। প্রেরণা দেবার আনন্দ। তাগিদের আনন্দ। এই আনন্দটা যে না নেয় সে বোকা। ‘আগস্ট ১৪’ দেখে সে আনন্দটা হয়েছে।
৭টি পয়েন্ট বলবো সাত দুগুনে ‘আগস্ট ১৪’ সম্পর্কে -
১. শুধু প্লট, স্টোরি টেলিং আর অভিনয়গুনের জোরে বাংলা ওয়েব সিরিজকে বিশ্বমানে নিয়ে গেছেন শিহাব শাহিন। সিরিজটি পারফেক্ট ফিল্মের টেকনিকাল সাপোর্ট ডিজার্ভ করে। সেটা হলে বাজেট বাড়তো আরো ছয়গুন। সেটা যেহেতু সম্ভব না- ওটা নিয়ে আফসোস থাক অভিযোগ না। বাংলাদেশের সেরা প্রেমের নাটকগুলোর নির্মাতা - তার কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়েই ছক্কা মারলেন। শাহীন ভাই ছাড়েন তো প্রেম ট্রেম- ওটা অনেকেই করছে- এটা আপনার জনরা ভাই।
২. আমি বলেছিলাম- সিনেমা নাটক অনেক তৈরি হয়- কিন্তু মনে রাখার মত চরিত্র খুব কম তৈরি হয়। কারণ তার জন্য পুরোটা একসাথে ওয়ার্ক করতে হয। এখানে সেই রেয়ার বিষয়টা হয়েছে। তুশি রয়ে যাবে। রাউন্ড বা কমপ্লেক্স ক্যারেক্টার হিসাবে তুশি অবশ্যই আলাদা করে রাখার মত চরিত্র। তাসনুভা তিশা- অভিনয়শিল্পীর জীবনে খুব বেশি পারফরমেন্স লাগে না। তুশি তেমন একটা। অসাধারণ করেছো তিশা- আমি মন্ত্রমুগ্ধ। নির্মাতা হিসাবে আমি জানি এখানে পরিচালকের প্রাপ্য আছে।
৩. আমি অশ্লীল কিছু পাইনি ‘আগস্ট ১৪’-এ। বরং এটা না হলে ‘আগস্ট ১৪’ পূর্ণতা পেত না। ইমপ্যাক্ট রাখতো না। বরং শিহাব শাহীন কিছুটা কমই করেছে। আমি প্রথম রাতে ভাইকে যেখানে তুশি থাকলো- সেখানে সেখানে ব্যর্থ যৌন মিলন হলেও হতে পারতো। প্রয়োজনে নিজেকে ব্যবহার করা তুশির ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টের জন্য এটার দরকার ছিল। শিহাব শাহিন সংলাপে পার হয়ে গেছেন। তবে এই প্রসঙ্গে দুঃখ একটাই- ১৮+ কনটেন্টের ট্যাগ পাবার জন্য অনেকেই এটা দেখবে না। আমি এটা প্রতিটি সন্তানের পিতা-মাতাকে দেখানোর প্রয়োজনীয়তা প্রবলভাবে বোধ করি।
৪. শতাব্দী ওয়াদুদের অভিনয় প্রতিভা সম্পর্কে আমি জানি- আমার মনিটরে আমি তাকে আগে ইন্টারোগেশন করিয়েছি। কিন্তু এখানে যে পরিমিত বোধ সে দেখিয়েছে- সেটা অনন্য। বাকী চরিত্রগুলোর অভিনয় খুব সাবলীল-রিয়েলিস্টিক-আন্ডারটোন। ভাল অভিনয়ের ছড়াছড়ি ‘আগস্ট ১৪’তে । আমি জানি এখানে নির্মাতার প্রাপ্য আছে।
৫. কাস্টিং খুব ভাল হয়েছে। জিমি, রুমি, তালা মিস্ত্রী, ডিবি অফিসার- সব ক্ষেত্রে যুৎসই কাস্টিং হয়েছে। কনটেন্ট ড্রিভেন প্রজেক্টে আত্মবিশ্বাস থাকলে পরিচালক এই সাহসটা পায়। এই আত্মবিশ্বাস শিহাব শাহিনের ছিল। ফটোগ্রাফি ভাল। উত্তরার বহু চেনা হাউজে শ্যুট করলে আর আর্টে ভাল বাজেট না থাকলে নাজমুল কী করবে- কিন্তু যেখানে করতে পারার- সেখানে নাজমুল ফাটিয়ে দিয়েছে। অনেক সিনের ফটোগ্রাফি দুর্দান্ত। রনির- রেদোয়ান রনির একটা নাটকে তোমার কাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম- আবার হলাম। কালার গ্রেডিং ভাল না একেবারে।
৬. স্টোরি টেলিং টা খুব গ্রিপি ছিল। তুশি তার ছোট ভাই গৃহপরিচারিকাকে নিয়ে কেন এভাবে ঘুরছে- আর জিমিকে বারবার ফোন করছে- এই প্রশ্ন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় দর্শককে- আমাকেও বেড়াচ্ছিল- নেহাতই এক রিভিউয়ার স্পয়লার না বুঝে- আমার সেই হুককে স্পয়েল করে দিয়েছিল। সেটার দায়ও শিহাব শাহিনের। উনিই সেই স্পয়লার ভরা রিভিউটা শেয়ার দিয়েছিলেন- নয়তো তুশি এলোমেলো যাত্রা আমাকে ধরে রাখছিল- কিছু হচ্ছে না- কিন্তু টেনে রাখছিল। গল্প বলায় এই মুন্সিয়ানা বাংলাদেশের নাটক সিনেমার খুব রেয়ার। এটাক কথাই গলা চিল্লিয়ে বলি বারবার। শেষ পর্বে গড়গড় সব বলে না দিলে আরো ভাল লাগলো। পুলিশের সাথে বিশেষ করে ডিবির সাথে কাজ করার সুবাদে আমি জানি- আসামিরা বলে না- স্বীকার করে। সেটা মারধরের ভয়ে নয়। ইন্টারোগেশেন যে করে- সে জালটা ক্রমশ গুটিয়ে আনে। সেটা তথ্যের জাল। লজিকের সেই জালে আটকা পড়ে স্বীকার না করে উপায় থাকে না, আসামির।
৭. সানী সানোয়ারকে ধন্যবাদ- ‘আগস্ট ১৪’ তার সহায়তা না পেলে এতটা রিয়েলিস্টিক হতো না- এটা আমি স্ক্রিন দেখেই বুঝেছি। সানী, এভাবেই পাশে থাকিস- বাংলাদেশের সিনেমা-নাটক-ওয়েবের। রাফায়েলকে ধন্যবাদ। এমন প্রডাকশনেই তোমার নাম থাকা দরকার। মিঠু ভাইকেও। সাথে যারা যুক্ত আছেন- যারা ‘১৪ আগস্ট’ বানাতে ভূমিকা রেখেছেন সবাইকে ধন্যবাদ। সন্ধির গান আমার সব সময় খুব ভাল লাগে। আমি সুযোগ পেলেই বলি। আজ বড় করে বলার আরেকবার বড় করে বলার সুযোগ পেলাম।
শেষ কথা- ১৮+ কনটেন্ট– শ্লীল-অশ্লীল প্রশ্নে ‘আগস্ট ১৪’কে দুরে ঠেলে রাখবেন না প্লিজ। তাতে আপনার ক্ষতি। নির্মাতার প্রতি আস্থা রাখুন- ধাক্কা দেয়ার জন্য চরিত্রটাকে বাস্তবের কাছাকাছি নেয়া দরকার ছিল- আর তার জন্য দরকার ছিল দৃশ্যগুলোর। এই ওয়েব সিরিজটা দেখা- হজম করা (বদহজম নয়) প্রতিটি পরিবারেই জন্যই প্রয়োজন। যে সমস্যা নিয়ে ‘আগস্ট ১৪’ তৈরি তা করোনার মতই খুব ঘুরঘুর করছে চারপাশে। যেকোন মূহূর্তে জানালা টপকে ঢুকে যেতে পারে আপনার ঘরে। সেই আশঙ্কায় অনেক বাবা-মাই শতাব্দী ওয়াদুদের মত সন্তানকে জড়িয়ে কাঁদে আর প্রার্থনা করে ভীত চোখে।”
