মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন প্রধনমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘রাজনীতি করতে গিয়ে নাসিম ভাইকে সব সময় আমার পাশে পেয়েছি। রাজনীতিতে পাশে থেকে যারা সাহস ও সমর্থন দিয়েছেন, তারা একে একে আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। নাসিম ভাইয়ের পর ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ ভাইও চলে গেলেন। এটা আমার জন্য খুবই দুঃখজনক।’ সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহর মৃত্যুতে গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘করোনার ভয়ে তো আমরা মানুষকে না খাইয়ে মারতে পারি না। তাদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থাটা আমাদের নিতে হবে। যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেখানে লকডাউন করে তা আটকানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ আমি সংসদে আসব। কিন্তু অনেক জায়গা থেকে আমাকে সংসদে আসতে নিষেধ করা হয়েছিল। ভীষণভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, “না না, আপনি যাবেন না, নেত্রী যাবেন না।” তা আমি বললাম, হুমকি, বোমা, গ্রেনেড কত কিছুই তো মোকাবিলা করে করে এ পর্যন্ত এসেছি। এখন কী একটা অদৃশ্য শক্তির ভয়ে ভীত হয়ে থাকব।’
সরকারপ্রধান বলেন, ‘পার্লামেন্টের মেম্বার, আমাদের আওয়ামী লীগের পরিবারের একজন সদস্য তাকে হারিয়েছি। আমাদের কেবিনেটের একজন সদস্য তাকেও হারালাম। আর সেখানে আমি সংসদে যাব না, এটা তো হয় না।’
করোনা সংক্রমণে আজ সারা বিশ^ই আতঙ্কিত উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই আতঙ্কটা এমন পর্যায়ে চলে যাচ্ছে যেটা সত্যি খুব দুঃখজনক। এখানে উন্নত দেশ, অনুন্নত দেশ বা উন্নয়নশীল দেশ, অস্ত্রের দিক থেকে শক্তিশালী, অর্থের দিক থেকে শক্তিশালী অথবা হয়তো দরিদ্র রাষ্ট্র কোনো ভেদাভেদ নেই। সব যেন এক হয়ে গেছে এক করোনাভাইরাসের ভয়ে ও আতঙ্কে। সব জায়গায় কিন্তু একই অবস্থা। আমেরিকা থেকে শুরু করে আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় এই ওয়েবটা চলছে।’
করোনা পরিস্থিতিতে গভীর শোকার্ত পরিবেশে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বক্তৃতার সময় শোকে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা। অনেক কষ্টে তিনি বক্তব্য শেষ করেন। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে প্রয়াত দুই নেতার অবদানের কথা তুলে ধরেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।
প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যের শুরুতেই বলেন, মাননীয় স্পিকার, অত্যন্ত কষ্ট নিয়ে এখানে দাঁড়াতে হচ্ছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে মোহাম্মদ নাসিমের অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘তাকে ১৪ দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কারণ তিনি সবাইকে নিয়ে চলতে পারতেন। শরিক দলের সদস্যরাও তাকে ভালো জানতেন। তিনি সফলতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মৃত্যুতে বিরাট ক্ষতি হয়েছে নিঃসন্দেহে।’
শেখ আবদুল্লাহর মৃত্যুতে যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ হওয়ার নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১০টা-সাড়ে ১০টার দিকে শুনলাম তিনি খুব অসুস্থ। তাকে হাসপাতালে নিতে হবে। তার বঙ্গবন্ধু বিশ^বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে না নিয়ে নেওয়া হলো সিএমএইচে। কিন্তু জাহাঙ্গীর গেট পার হতে না হতেই তার আরেকটা হার্ট অ্যাটাক হলো এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনটা অ্যাটাক। রাত ১১টা বাজে তখন খবর এলো তিনি নেই। এই যে একই দিনে দুজনের মৃত্যু আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক।’
তিনি বলেন, মোহাম্মদ নাসিমের বাবা মোহাম্মদ মনসুর আলী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে রাজনীতি করতেন। যখন ছোট ছিলাম সেই সময় মোহাম্মদ নাসিম ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের একটা পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। সব থেকে বড় কথা, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক যখন মোহাম্মদ নাসিমের বাবাকে ডেকে নিয়ে যায় মন্ত্রী হওয়ার জন্য, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি কী করে ভাবলে আমি তোমার মন্ত্রিসভায় আসব? তা কখনই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৫ আগস্ট আমাদের বাসায় আক্রমণ হয়েছে শুনে মনসুর আলী অনেক চেষ্টা করেছিলেন, এমনকি বাসা থেকে চলে গিয়েছিলেন কিছু করা যায় কি না। যেহেতু মোশতাকের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এ জন্য জাতীয় চার নেতার সঙ্গে তাকেও কারাগারে হত্যা করা হয়।’
মোহাম্মদ নাসিম একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর আমার একটা প্রচেষ্টা ছিল শহীদ পরিবারগুলোর ছেলেমেয়েদের নিয়ে আওয়ামী লীগকে আরও ঐক্যবদ্ধ করা। রাজনীতি করতে গিয়ে নাসিম ভাইকে সব সময় আমার পাশে পেয়েছি। এটা ঠিক যে চলার পথ এত সহজ ছিল না। সে প্রতিটি ক্ষেত্রে আমার পাশে থেকেছে, সমর্থন দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময় মার্শাল ল জারির পরপরই সাভারে ফুল দেওয়ার জন্য সেনারা তাদের হকিস্টিক দিয়ে প্রত্যেকের ওপর নির্যাতন করেছিল। অনেককেই সাভার থানায় নিয়ে বন্দি করে রাখা হয় সেই সময়। নাসিমও ঘাড়ে ও হাতে আঘাত পায়। এরপর খালেদা জিয়ার আমলে অত্যাচারের সীমা নেই। এরপর এলো ওয়ান-ইলেভেন। তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হলো। সে সময় তার ব্রেইন স্ট্রোক করে। সেই সময় সে হাসপাতালে পৌঁছাতে পেরেছিল বলেই সে যাত্রায় নাসিম ভাই বেঁচে যান। তবে স্ট্রোক করার পর তার শরীরের একটা দিক প্যারালাইজড হয়ে যায়।’
করোনা মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি মানুষকে বোঝাতে, আপনারা অন্তত একটু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। এটা খুব সাংঘাতিক একটা সংক্রামক ব্যাধি। সংক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে দেশবাসীকে বলছি। পাশাপাশি এটা তো বাস্তবতা, করোনার ভয়ে তো আমরা মানুষকে না খাইয়ে মারতে পারি না। তাদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থাটা আমাদের নিতে হবে। জীবনযাত্রা যাতে চলে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা ঠিক করেছি যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে তা লকডাউন করা। যাতে সেখান থেকে যেন সংক্রমণ না হয়। পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেন সচল থাকে সেদিকে ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা একটা বাজেটও দিতে সক্ষম হয়েছি। এ কাজগুলো যখন করছি সেটা একধরনের যুদ্ধ। সেই সময় যাদের আমরা সব সময় কাছে পেয়েছি তাদের দুজনকে হারানো অত্যন্ত কষ্টকর।’
নেতাকর্মীদের মৃত্যুতে পাশে দাঁড়ানো আওয়ামী লীগের ঐতিহ্য হলেও করোনা সংক্রমণের কারণে সেটা সাম্প্রতিক সময়ে সম্ভব হচ্ছে না উল্লেখ করে দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কোনো একজন কর্মী মারা গেলে ছুটে গিয়েছি। জানাজায় অংশ নেওয়া, ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো, পরিবারের সঙ্গে দেখা করা সবই করেছি। কিন্তু এখন এমন একটা অস্বাভাবিক পরিবেশ সেটা আর করতে পারছি না। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একটু দেখা করা, তাদের একটু সান্ত্বনা দেওয়া সেই সুযোগটা পেলাম না। এটা সব থেকে কষ্টকর।’
শোক প্রস্তাবের ওপর এই আলোচনায় আরও অংশ নেন বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের; আওয়ামী লীগের মতিয়া চৌধুরী, ডা. হাবিবে মিল্লাত ও মৃণাল কান্তি দাস; ওয়ার্কার্স পার্টির অ্যাডভোকেট মুস্তফা লুৎফুল্লাহ এবং জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ। আলোচনা শেষে সর্বসম্মতিতে শোক প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়। পরে মোহাম্মদ নাসিম ও শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন ও তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। এরপর দিনের অন্যান্য কার্যসূচি স্থগিত করে অধিবেশন মুলতবি করা হয়।
