টিআইবির দাবি

৫-১০ গুণ বেশি দামে মানহীন সুরক্ষাসামগ্রী ক্রয়

আপডেট : ১৬ জুন ২০২০, ০৫:২৮ এএম

করোনা দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে একটি চক্র ৫ থেকে ১০ গুণ বাড়তি দামে মানহীন সুরক্ষাসামগ্রী কিনে লাভবান হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এসব সামগ্রী হাসপাতালে সরবরাহ করে স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।

গতকাল সোমবার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে ‘করোনাভাইরাস সংকট মোকাবিলায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে দুর্নীতিবিরোধী বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এ দাবি করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন ফার্মের নামে একটি সিন্ডিকেট সব ধরনের কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করছে। এর সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একাংশের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কারণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়া এ বিষয়ে অন্যরা কিছুই জানতে পারছেন না।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘করোনার মতো জাতীয় সংকটে অনিয়ম-দুর্নীতি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, করোনা মোকাবিলায় সরকারি পদক্ষেপে আমলা, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ত্রিমুখী আঁতাতের মাধ্যমে দুর্নীতি হয়েছে।’

করোনা পরিস্থিতিতে পরীক্ষাগারে দুর্নীতি, চিকিৎসায় অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা, চিকিৎসাসামগ্রী কেনায় দুর্নীতি, স্থানীয় পর্যায়ে সুরক্ষাসামগ্রী বণ্টনে অনিয়ম ছাড়াও ত্রাণ ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নানা অনিয়ম তুলে ধরে টিআইবি।

সংস্থাটি বলছে, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ২৩ শতাংশ হাসপাতালে স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা পাওয়া গেছে। নিম্নমানের সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে ৫৯ শতাংশ, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কর্র্তৃপক্ষের অবহেলা ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ ও দায়িত্ব বণ্টনে বৈষম্য পাওয়া গেছে ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্তর্ভুক্ত ৭৫ শতাংশ হাসপাতালের চিকিৎসক, ৬৬ শতাংশ হাসপাতালের নার্স ও ৬৬ শতাংশ হাসপাতালের অন্যান্য সেবাকর্মী সুরক্ষাসামগ্রী পেয়েছেন।

করোনা চিকিৎসায় নির্ধারিত হাসপাতালে প্রস্তুতি ও সক্ষমতার ঘাটতি এবং অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে আক্রান্তরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনুমোদন পাওয়া অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নমুনা পরীক্ষায় সরকার নির্ধারিত ফি থেকে এক-দেড় হাজার টাকা বেশি নিচ্ছে। দালালরাও সিরিয়াল বিক্রির নামে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া কভিড-১৯ নেগেটিভ সনদ বিক্রির একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

টিআইবি বলছে, ‘করোনাভাইরাস মোকাবিলায় জরুরি সহায়তা’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ৫০০-১০০০ টাকা দামের সেফটি গগলসের (১ লাখ) প্রস্তাবিত ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ৫ হাজার টাকা। ১ লাখ ৭ হাজার ৬০০ পিপিই কেনার ক্ষেত্রে প্রতিটির প্রস্তাবিত ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ৪ হাজার ৭০০ টাকা, যার বাজারমূল্য ১০০০-২০০০ টাকা। ৭৬ হাজার ৬০০ জোড়া বুট শু কেনার জন্য প্রতিটির প্রস্তাবিত মূল্য দেখানো হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা, যা বাজারে ৩০০-৫০০ টাকায় পাওয়া যায়। এছাড়া পাঁচটি কম্পিউটার সফটওয়্যারের প্রস্তাবিত ক্রয়মূল্য ৫৫ কোটি টাকা, চারটি ওয়েবসাইট উন্নয়নে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ৩০টি অডিও-ভিডিও ক্লিপের ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, গবেষণায় ২৯ কোটি ৫০ লাখ, ৩০টি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে ৪৫ কোটি টাকা, ইনভেশনে ৩৬ কোটি টাকা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের অন্যত্র নেওয়ার গাড়িভাড়া বাবদ ৩৭ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এমন ব্যয় অস্বাভাবিক।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ত্রাণ বিতরণে দুর্নীতির কারণে ১০ জুন পর্যন্ত ৮৯ জন জনপ্রতিনিধিকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে সব ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেওয়ার হার ৪ দশমিক ৯০, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১৪ দশমিক ৬০, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ৬১ দশমিক ৯০, কোনো ক্ষেত্রেই পদক্ষেপ না নেওয়ার হার ১৭ দশমিক ১০ এবং ২ দশমিক ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

গবেষণার আলোকে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে জেলা পর্যায়ে পরীক্ষাগার বাড়ানো, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সমন্বয় বাড়ানো, বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, স্বাস্থ্য খাতে অনিয়মরোধে জবাবদিহিতা নিশ্চিতসহ করোনা মোকাবিলায় ১৫টি সুপারিশ করেছে টিআইবি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত