২০১৯-২০ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট পাস

মানুষ না বাঁচলে কার জন্য বাজেট : অর্থমন্ত্রী

আপডেট : ১৬ জুন ২০২০, ০৫:৩০ এএম

জাতীয় সংসদে ২০২০ সালের ৩০ জুন সমাপ্য অর্থবছরে সংযুক্ত তহবিল থেকে মঞ্জুরিকৃত অর্থের অধিক ৪৬ হাজার ৫১৬ কোটি ১১ লাখ টাকা প্রদান ও ব্যয়ের অনুমোদন দিয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট পাস করা হয়েছে।

নির্দিষ্টকরণ সম্পূরক বিল, ২০২০ পাসের মধ্য দিয়ে এধ বাজেট পাস করা হয়। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বিলটি উত্থাপন করে পাসের প্রস্তাব করলে তা সর্বসম্মতিক্রমে সংসদে পাস হয়।

সম্পূরক বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এবারের বাজেট “মানবিক বাজেট।” অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, এবারের বাজেটে মানুষকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। মানুষ না থাকলে বাজেট কার জন্য? বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে দেশের মানুষকে আমাদের বাঁচাতে হবে।’ অর্থমন্ত্রী করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাজেট বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর  প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দাবিসহ ২৫টি মঞ্জুরি দাবি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা সংসদে উত্থাপন করলে পৃথকভাবে তা পাস করা হয়। এসব দাবির ওপর বিরোধী দলের সদস্যরা মোট ১৬৭টি ছাঁটাই প্রস্তাব আনেন। এর মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে সমাজকল্যাণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রাণালয়ের দুটি দাবির ওপর আলোচনা হয়। ছাঁটাই প্রস্তাবে আলাচনা করেন জাতীয় পার্টির পীর ফজলুর রহমান, শামীম হায়দার পটোয়ারী, বেগম রওশন আরা মান্নান এবং বিএনপির হারুন-অর-রশীদ।

সম্পূরক বাজেটে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮০৮ কোটি ৩০ লাখ ৯৮ হাজার টাকা রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ খাতে, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৩২ কোটি ৫৩ লাখ ২২ হাজার টাকা রয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় খাতে। এ ছাড়া গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় খাতে ৮৪২ কোটি ৯৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকা, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় খাতে ৮৩৭ কোটি ১৪ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় খাতে ৫৫৯ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা, ধর্ম মন্ত্রণালয় খাতে ৫২৭ কোটি ৪২ লাখ ৭ হাজার টাকা, নির্বাচন কমিশন খাতে ৫০৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে ৪৯৩ কোটি ৫৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় খাতে ৪৫৪ কোটি ৮৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা, শিল্প মন্ত্রণালয় খাতে ৪৫০ কোটি ১৯ লাখ ১ হাজার টাকা, পরিকল্পনা বিভাগ খাতে ৩৭৯ কোটি ৫৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় খাতে ২১৪ কোটি ৭৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা, পরিসংখান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা খাতে ২৯০ কোটি ৫৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকা, জননিরাপত্তা বিভাগ খাতে ২৯৪ কোটি ১১ লাখ ৮১ হাজার টাকা, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে ৯২ কোটি ৯৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ৫৯ কোটি ৮৪ লাখ ১৭ হাজার টাকা, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় খাতে ৫৩ কোটি ৯৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা, মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয় খাতে ৩৯ কোটি ৯৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকা, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে ৭৩ কোটি ২৬ লাখ ৬৭ হাজার টাকা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে ৬২ কোটি ২১ লাখ ২১ হাজার টাকা, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে ৫৩ কোটি ৩৪ লাখ টালা, সরকারি কর্মকমিশন খাতে ১৮ কোটি ১০ লাখ টাকা, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় খাতে ১২ কোটি ৭৮ লাখ ৯১ হাজার টাকা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় খাতে ১ কোটি ৫৪ লাখ ১০ হাজার টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

চলতি অর্থবছরে মূল বাজেট ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা ৫ লাখ ১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা করা হয়।

সম্পূরক বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী জানান, বাজেট দেওয়ার পর তা বাস্তবায়ন পর্যায়ে বিভিন্ন যৌক্তিক কারণে কিছুটা সংযোজন এবং তা সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়।

দেশে করোনা সংক্রমণ প্রসঙ্গ টেনে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এ বছর বাজেটের সংযোজন-বিয়োজন বা সমন্বয়ের কারণটি আমাদের সবার জানা। বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯-এর বিবেচনায় আমরা সম্পূরক বাজেটে রাজস্ব আয় ও ব্যয় কিছু সমন্বয় করার চিন্তা করেছি। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও আমরা ৮ দশমিক ২ শতাংশ কমিয়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করেছি। আমরা যদি এই পুনর্নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারি তা হবে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ।’

তিনি জানান, সম্পূরক বাজেট করোনা দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য স্বাস্থ্যসেবা খাত, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে অতিরিক্ত ৩ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বাজেট না দেওয়া হলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ তোলার কোনো ব্যবস্থা নেই উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এবারের (আসন্ন ২০২০-২১ অর্থবছর) বাজেটে সব ক্ষেত্রে প্রাধিকার পাচ্ছে দেশের মানুষ। দেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে। এই করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে আমাদের চেষ্টা থাকবে মানুষকে যতটা সম্ভব রক্ষা করা। আল্লাহর অশেষ রহমত থেকে আমরা সে কাজটি করব।’

‘নতুন অর্থবছরের বাজেট সবার জন্য’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সব সময় আমাদের বাজেটে অর্থনৈতিক উন্নয়নগুলোর কম্পোনেন্ট প্রাধিকার পায়। কিন্তু এবার আমরা তা করিনি। এবার মানুষকে প্রাধিকার দিয়েছি। এটা কেবল অর্থনৈতিক বাজেট নয়। এটা একদিকে অর্থনৈতিক বাজেট, পাশাপাশি মানবিক বাজেট।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের গ্রামের অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিতে বলেছেন। গ্রামের মানুষকে রক্ষা করতে হবে। তাদের দায়িত্ব নিয়ে আমরা বাজেট প্রণয়ন করেছি।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অন্যান্য বার আমরা রেভিনিউ অর্জন করি এবং রেভিনিউ খরচ করি। এবার আমরা রেভিনিউ আগে খরচ করব। তারপর রেভিনিউ অর্জন করব। আমরা এখন খরচ না করলে মানুষ বাঁচবে কী করে? আর মানুষ বাঁচাতে না পারলে দেশ কার জন্য? দেশের বাজেট কার জন্য? কাজেই এই বিবেচনা মাথায় রেখে আমি সবাইকে অনুরোধ করব, আসুন, সবাই আমরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই বাজেট যেন পরিচালনা করি। এ বছরটি একটি ভিন্ন বছর। করোনাভাইরাসের দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হলে সবাইকে নিয়ে কাজটি করতে হবে।’

সম্পূরক বাজেট নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনার জন্য অর্থমন্ত্রী সব সাংসদকে ধন্যবাদ জানান।  তিনি বলেন, ‘সম্পূরক বাজেট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সাংসদরা যেটা বলেছেন তার সবই আগামী (প্রস্তাবিত ২০১৯-২০) বাজেট নিয়ে। ওই বাজেট নিয়ে আলোচনার সময় আমরা এর জবাব দেব। অর্থমন্ত্রী ছাড়াও সম্পূরক বাজেট নিয়ে পাঁচজন সদস্য আলোচনায় অংশ নেন। তারা হলেন সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের, আওয়ামী লীগের সাংসদ আবুল হাসান মাহমুদ আলী, তাহজীব আলম সিদ্দিকী ও ওয়াসিকা আয়েশা খান এবং বিএনপির হারুন-অর-রশিদ। এবার সম্পূরক বাজেট নিয়ে মোট ৭০ মিনিট আলোচনা হয়। গতকাল  এক দিনই সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনা করে এটি পাস করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত