একজন স্থপতি কিংবা তার স্থাপত্য নকশা কীভাবে একটি নিরাপদ পরিবেশবান্ধব স্থাপনা সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আসন্ন বিভিন্ন মহামারী কিংবা রোগজীবাণু, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের ভয়াবহতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে বিষয়টি নিয়ে অনেক ভাবছিলাম। এখনো ভাবছি। বিষয়টি নিয়ে পড়াশোনা করছি, জানার চেষ্টা করছি। বিশেষ করে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষদের জন্য এটা খুব দরকার। তাদের পক্ষে অনেক টাকা খরচ করে সুন্দর বাসস্থান নির্মাণ সব সময় সম্ভব নয়। কিংবা বেশি ভাড়া দিয়ে বড় কোনো অ্যাপার্টমেন্টে যাওয়া সম্ভব নয়। হয়তো তারা চাকরি করছে লোকে লোকারণ্য অফিসে কিংবা বসবাস করছে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়। আমাদের হয়তো স্থাপনা নির্মাণের অনেক ধরনের কোড আছে। এমনকি পরিবেশ ভারসাম্য, ভূমিকম্প ও বন্যার জন্য আগামীতে কী করতে হবে সেসব অনেক বিষয়ে আমাদের অনেক তথ্য-উপাত্ত কিংবা নির্মাণ বিধিমালা রয়েছে। এখন এই মুহূর্তে যে বিষয়টি ভাবতে হবে সেটি হচ্ছে আগামীতে এ ধরনের মহামারী থেকে রক্ষার জন্য আমাদের শহর কিংবা গ্রামগুলোর স্থাপনা নির্মাণের বিধিমালায় কোন বিষয়গুলো সংযুক্ত করা প্রয়োজন এবং কীভাবে সেসব বাস্তবায়ন সম্ভব?
স্থাপত্য নকশা প্রণয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্যবহারিক গুণাবলির পরিবর্তনের মাধ্যমে কীভাবে আমরা কিছু বিপদ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারব সেই দিকনির্দেশনাও সংযুক্ত করা প্রয়োজন সেই সব বিধিমালায়। যেমন ধরা যাক, বর্তমানে আমরা সোশ্যাল আইসোলেশনের জন্য সাধারণত ঘরের মধ্যে সবসময় বসবাস করছি নিজেদের সুরক্ষার জন্য। দীর্ঘদিন ঘরের মধ্যে বসবাসের কারণে তার প্রভাব পড়ছে আমাদের শারীরিক-মানসিক ক্ষেত্রে। বিষণœতা, কাজে অনীহা, একঘেয়েমি এমনকি সহিংসতা বেড়ে যাচ্ছে আমাদের মধ্যে। গবেষণায় দেখা গেছে, যে স্থানে সঠিক সূর্যের আলো পৌঁছায় না, বাতাস চলাচল করতে পারে না, এমনকি সবুজের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ কোনো সম্পর্ক নেই সেখানে কার্বন ডাই অক্সাইড এবং চগ ২.৫ এর মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। যার দরুন মানুষের ওপর স্নায়ু চাপের সৃষ্টি হয়। মনের ওপর প্রভাব পড়ে। আর এই সমস্যা ছোটদের, বয়স্কদের এবং মহিলাদের সব থেকে বেশি হয়। এমনকি হরমোনাল পরিবর্তনও এসব কারণে হয়ে থাকে।
অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে এমনিতেই আমাদের বসবাসের জায়গাগুলোতে বসবাসকারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। তাই সেখানে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেশি। এমতাবস্থায় জানালা কিংবা কোনো খোলা জায়গা না থাকলে শ্বাসকষ্ট আছে এমন মানুষদের সমস্যা আরও বেড়ে যায়। তাছাড়া সূর্যের আলো, বসবাসের জায়গার আভ্যন্তরীণ রং মনের ওপর ওষুধের মতো কাজ করে। আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সমসাময়িক অনেক গবেষণায় উঠে এসেছে সেটি হলো বর্তমানে আমরা এই সময়ে নিজেদের সবসময় ডিজিটালি (ভার্চুয়ালি) সংযুক্ত রেখেছি। বিশেষভাবে ছোট ছেলেমেয়েদের অনেকেরই লেখাপড়া এখন ভার্চুয়াল মাধ্যমে। সকাল থেকে তাদের বসে থাকতে হচ্ছে ল্যাপটপ অথবা কম্পিউটারের সামনে। এতে করে তাদের মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি অত্যধিক ডিজিটাল সংযোগের কারণে একটি বাসায় বসবাসরত সবার মধ্যেই সামাজিক সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। আর এমনটি বলছে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বর্তমান গবেষণার বিভিন্ন ধারা। এমতাবস্থায় একজন স্থপতি কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন যা ব্যয়বহুল হবে না এবং সহজে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে?
কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, এমন কী ধরনের সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা আমাদের শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিশেষ নজর দিতে পারব, সুরক্ষা করতে পারব স্থাপত্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে? আমরা হয়তো খুব সহজেই নতুন কোনো নকশা চিন্তা করতে পারি! এমনকি অনেক ধারণা বর্তমানে প্রচলিতও আছে। সব ধারণা সহজেই বাস্তবায়িত হয় না, গ্রহণযোগ্যতা পায় না। তাই এমন কিছু আমাদের ভাবতে হবে যা সাধারণ মানুষ খুব সহজেই গ্রহণ করতে পারে। মানুষ যা বাস্তবায়ন করতে পারে তাদের সাধ্যের মধ্যে থেকে। কারণ সীমাবদ্ধতার কথা আমাদের ভাবতে হবে। তাছাড়া পরিবেশগত পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুতগতিতে। আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অনেক মহামারী। যা হয়তো সামনে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে আসতে পারে। এমন তথ্য স্থাপত্য ও পরিবেশ ভাবনায় অনেকবার উঠে আসছে। তাছাড়া ‘জিরো কার্বন’ স্থাপত্যের কথা বলা হচ্ছে। যেখানে নির্মাণ কৌশল এবং উপকরণের কথা ভাবতে হবে আরও বেশি করে। গবেষণা করতে হবে সুচারুভাবে। আমাদের দেশের জন্য একটি টার্গেট ঠিক করতে হবে। স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি। এভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদি টার্গেট নির্ধারণ করতে হবে। সমসাময়িক চিন্তার সঙ্গে স্থায়ী চিন্তার সংযোগ স্থাপন করতে হবে।
স্থাপত্যের সঙ্গে জীবন বিজ্ঞানের একটি ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় আমাদের দেশের স্থাপত্যের শিক্ষার সঙ্গে জীবন বিজ্ঞানের সংযোগ এখনো সুনির্দিষ্ট নয়, কিংবা শক্তিশালী নয় একথা বললেও ভুল হবে না। বলা যেতে পারে এখনো উপেক্ষিত! কারণ সেখানে অণুজীববিজ্ঞান, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, কোডিং ডিকোডিং সিস্টেম, স্বাস্থ্যবিষয়ক স্থাপত্যের মৌলিক চিন্তাভাবনা এই বিষয়গুলো স্থাপত্য শিক্ষার সঙ্গে এখনো সেভাবে সংযুক্ত হয়নি, হলেও নেহায়েত সামান্য। বিশেষ করে সমাজবিদ্যা, অণুজীব বিদ্যা এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে একজন স্থপতি কীভাবে ভবিষ্যতে কাজ করবেন কিংবা গবেষণা করবেন সেই জ্ঞান উন্নয়নের জন্য স্থাপত্যের শিক্ষাব্যবস্থায় আরও বেশি সময়োচিত সন্নিবেশন প্রয়োজন। এখন পৃথিবীর সব দেশের স্থাপত্য শিক্ষার স্কুলগুলো ভাবছে এ বিষয়গুলো নিয়ে।
একজন স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষার্থীকে অনেক বিষয় নিয়ে পড়তে হয়। সেখানে পদার্থ বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি থেকে শুরু করে সমাজবিজ্ঞান, রাজনীতি সব বিষয়ে কিছু না কিছু মৌলিক জ্ঞান প্রদান করা হয়। কিন্তু ছাত্রাবস্থা থেকে শুরু করে শিক্ষক জীবনের অভিজ্ঞতায় যে বিষয়টি উপলব্ধি করছি এখন পর্যন্ত স্থাপত্যবিদ্যায় ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে জীববিজ্ঞান, অণুজীববিজ্ঞান, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান, রসায়ন এই বিষয়গুলোকে খুব বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় না। কিংবা স্থাপত্যচর্চার সঙ্গে কীভাবে এগুলো নিয়ে চিন্তা করা সম্ভব সেই সব বিষয়ে মৌলিক জ্ঞান প্রদানের বিষয়বস্তু এখন পর্যন্ত সিলেবাসে সেভাবে গুরুত্ব পায় না। কিন্তু বর্তমানে স্থাপত্যের যেকোনো গবেষণার সঙ্গেই মানুষের জীবনধারণের রীতিনীতি, অভিযোজন, পরিবেশের প্রভাব, পরিবেশের সঙ্গে জিনগত বৈশিষ্ট্য, স্বাস্থ্যের প্রভাব, রোগজীবাণুর প্রভাব, জীবনধারা, হরমোনের প্রভাব, নৃবিজ্ঞান এই সব বিষয় প্রাধান্য পাচ্ছে। যার সঙ্গে কোনো না কোনো ভাবে ওপরে উল্লিখিত বিষয়গুলোর সম্পর্ক রয়েছে। কারণ একজন স্থপতি শুধু নকশা প্রণয়ন করেন না। তাকে ভাবতে হয় জীবনের প্রত্যেকটি ধারার বিষয়ে। জীবনকে জানতে হয়। শুধুমাত্র গবেষণায় নয়, বর্তমান বিশ্বে এই বিষয়গুলোকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেখা হচ্ছে প্রফেশনাল কাজের ক্ষেত্রেও। তাই দীর্ঘ পাঁচ বছর মেয়াদি স্থাপত্য শিক্ষায় এবং উচ্চতর গবেষণায় বাংলাদেশের স্থাপত্য শিক্ষার সিলেবাস নতুন করে ভাবা এখন সময়ের প্রয়োজন মানুষের কল্যাণে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণারত।
