ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটগুলো নাকি একটু বেশিই ব্যাটসম্যানবান্ধব। টেস্টে বোলাররা যাও একটু ক্যারিশমা দেখাতে পারেন কিন্তু ওয়ানডে বা এই সময়ের টি-টোয়েন্টিতে বোলারদের সেই সুযোগটা নেই। আর এ কারণেই বলা হয় রানের খেলা ক্রিকেট। এর মধ্যেই যদি কোনো ওয়ানডেতে ম্যাচ জেতানো সেঞ্চুরিয়ানকে বাদ দিয়ে ১০ ওভারে ৫৫ রান দিয়ে ৩ উইকেট নেওয়া কোনো বোলার সেরা হন, তবে চমকে যাবেন কি? চমকানোরই কথা। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের এই দিনে এমনটাই হয়েছিল। সেঞ্চুরিয়ান সাঈদ আনোয়ারকে টপকে পাকিস্তানকে ফাইনালে তোলায় সেরার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন শোয়েব আখতার। এটা সম্ভব হয়েছিল কেবল শোয়েব আখতার বলেই, আর সেরা ফর্মের শোয়েব ছিলেন এমনই।
’৯৯-এর ১৬ জুন নিউজিল্যান্ডের দেওয়া ২৪২ রানের জবাবে সাঈদ আনোয়ারের ব্যাট থেকে আসে ১৪৮ বলে অপরাজিত ১১৩। তার আগে কিউইদের আড়াইশোর কমে আটকে দেওয়ার নায়ক কিন্তু শোয়েব। সেদিন ওল্ড ট্রাফোর্ডে শোয়েবের হাত থেকে শুধু যে আগুনের গোলা ছুটেছিল তা নয়। ১৪০ কিমি গতির ওপর ডেলিভারি তো ছিলই, সঙ্গে ইতিহাস হয়ে যাওয়া তিনটি বিখ্যাত বল। যার দুটি জাদুকরী ইয়র্কার আর একটি মায়াবি সেøায়ার। তিনটিই ব্যাটসম্যানদের লেগ স্টাম্প উপড়ে ফেলে। সেদিন আর যে কারও চেয়ে নিখুঁত নিশানায় তাক করছিলেন শোয়েব, তার বলে ভ্যারিয়েশন ছিল অবিশ্বাস্য, যতজন ব্যাটসম্যান তার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, প্রায় সবাইকেই ছিঁড়েফুঁড়ে রেখেছেন। এমনকি সতীর্থ উইকেটকিপার মঈন খান পর্যন্ত একটি ডেলিভারি থেকে কোনোরকমে নিজের মুখ জখম হওয়া থেকে বাঁচান। পাকিস্তানের সাবেক গতি তারকা নিউজিল্যান্ডের ইনিংসে তিনটি স্পেলে বল করেন। শুরুতে ৪ ওভার, পরে ৩ ওভার করে দুটি। সবকটিতেই একটি করে উইকেট নিয়েছেন আর প্রত্যেকবারই নিউজিল্যান্ড রানের গতি তোলার পথে ছুটতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়েছে। সেদিনের শোয়েব এতটাই ভয়ংকর ছিলেন যে, ওই স্পেলটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা স্পেল হয়ে আছে।
সেমিফাইনালে তিন উইকেট, দলকে প্রতিবার ম্যাচে ফেরানো এসব কিছু ছাপিয়ে যায় শোয়েবের গতি। বিশ্বকাপের আগেই ঘণ্টায় ১০০ মাইল গতিতে বল করে ক্রিকেট বিশ্বের চোখ কপালে তুলে দিয়েছিলেন। সেই গতিটাই যেন ১৯৯৯ বিশ্বকাপের মঞ্চে বয়ে আনেন পাকিস্তান পেস তারকা। এই টুর্নামেন্টের আগে তাই তার নামও বদলে ‘রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেস’ হয়ে যায়।
ম্যাচের প্রথম স্পেলে শোয়েবের শিকার ছিলেন নিউজিল্যান্ড ওপেনার নাথান অ্যাস্টল। এক প্রান্তে ওয়াসিম আকরামের সুইং অ্যাস্টলকে সাপের মতো বাঁকিয়ে দিচ্ছিল। কোনো মতে সামলে শোয়েবের তৃতীয় ওভার পর্যন্ত টিকে ছিলেন। পরে তৃতীয় ওভারের তৃতীয় বলে
প্রথমবার শোয়েবের মুখোমুখি হতেই লেগ স্টাম্প উড়ে যায় অ্যাস্টলের। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিদ্যুৎগতির বল অ্যাস্টলের রক্ষণব্যূহ ভেদ করে দেয়। প্রথম স্পেল ৪ ওভারে ১৯ রানে ১ উইকেট শোয়েবের। দ্বিতীয় স্পেলে যখন ওয়াসিম তাকে আবার ডাকেন, ততক্ষণে নিউজিল্যান্ডের ইনিংস দাঁড়িয়ে গেছে। ৩১ ওভারে ৩ উইকেটে ১৩০ রান তুলে আড়াইশোর দিকে এগোচ্ছে কিউইরা। শোয়েব এলেন, প্রথম ওভারের চতুর্থ বলেই উইকেটরক্ষক মঈন খানের মুখ প্রায় যাচ্ছিল। ব্যাটসম্যানকে নাস্তানাবুদ করে আসা বাউন্সার কোনো মতে সামলান মঈন। এরপরের ওভারেই চোখধাঁধানো সেই ইয়র্কার। স্টিফেন ফ্লেমিং প্রথম তিন বলে দুটি চার তুলে নেন। একটি ইনজামাম উল হকের মিস ফিল্ডিংয়ে। ফিল্ডার মিস করছেন বলেই কি না আর এদিক-ওদিক বল দিলেন না শোয়েব। রাউন্ড দ্য উইকেটে ছুটে এসে সোজা ফ্লেমিংয়ের ব্যাট ও পায়ের মাঝ বরাবর লক্ষ্য করে ঘণ্টায় ১০০ মাইল গতির বল। ফ্লেমিং ব্যাট নামানোর সুযোগই পাননি। মুহূর্তেই স্টাম্প উপড়ে পড়ে। তৃতীয় স্পেলে ৪৬তম ওভারে আসেন শোয়েব। ক্রিস কেয়ার্নস ও ক্রিস হ্যারিস মিলে শেষদিকে দ্রুত রান তোলায় মনোযোগী। কিন্তু প্রথম তিন বল অগ্নিমূর্তিতে ছোড়া শোয়েব চতুর্থ বল করলেন মামুলি সেøায়ার। তাতে বিভ্রান্ত হ্যারিস উইকেট আর আগলে রাখতে পারেননি।
শুধু এই স্পেলই নয়, ক্যারিয়ারজুড়ে আরও অনেকবারই এমন ভয়ংকর সব স্পেল উপহার দিয়েছেন রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেস। এক সাক্ষাৎকারে শোয়েব জানান, নকল করতে করতে পেস বোলিংটা তার প্যাশন হয়ে গেছে। ‘আমি ইমরান খান, ওয়াকার ইউনিস, ওয়াসিম আকরামদের নকল করতাম। তাদের মতো জোরে বল করতে চাইতাম। এক সময় এই জোরে বল করাই আমার সুখ ও একমাত্র আনন্দ হয়ে গেল। ছুটে এসে বুক ভরা শ্বাস নিয়ে শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে বল করা। পুরো গ্যালারি আমাকে দেখছে, উৎসাহ জোগাচ্ছে। দারুণ এক অনুভূতি। আর সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো আমার বুকের ওই তারকাটি। মানে পাকিস্তানের হয়ে বল করা। আমি যখন প্রথম দলে সুযোগ পাই, পাকিস্তানের জার্সিটা পরে তিন রাত একাধারে কাটিয়ে দিয়েছিলাম।’
সত্যি শোয়েব আখতার এই আকাক্সক্ষা বা প্যাশনটা রেখেছিলেন বলেই বিশ্ব দেখেছিল ২১ বছর আগের সেই স্পেল বা ঘণ্টায় ১০০ গতিতে বল করা প্রথম বোলারকে।
