করোনার ভয় দেখিয়ে রোগী ভাগানোর কৌশল

আপডেট : ১৭ জুন ২০২০, ০৫:৪৮ এএম

করোনাকালে অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনদের কাছে গুজব ছড়িয়ে সরকারি বিভিন্ন হাসপাতালের রোগী ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দালালচক্রের সদস্যরা। কখনো করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে, কখনো চিকিৎসা হয় না বলে গুজব ছড়িয়ে বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে অপচিকিৎসার তথ্য উদঘাটন করেছে র‌্যাবের অনুসন্ধান দল। গতকাল মঙ্গলবার র‌্যাবের একাধিক কর্মকর্তা ও হাসপাতালে আসা রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

তারা জানান, দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আসা রোগীদের কেউ যখন পঙ্গু হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট কিংবা শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করেন, তখনই দালালচক্রের সদস্যরা সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ও নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে রোগী ও স্বজনদের মনে ভীতি ছড়িয়ে দেয়। এতে অনেক রোগী দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসার শিকার হন।

র‌্যাব-২-এর অধিনায়ক (পুলিশ সুপার) মহিউদ্দীন ফারুকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, র‌্যাব-২-এর অনুসন্ধানে আগারগাঁও পঙ্গু হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল ও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালকেন্দ্রিক একাধিক দালালচক্রের প্রায় ৫০০ সদস্যের তথ্য উদঘাটন হয়েছে। গত সোমবার থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে এ ধরনের একটি চক্রের একজন ভুয়া চিকিৎসকসহ চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়েছে। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে পঙ্গু হাসপাতালের দালালচক্রের ছয় সদস্য ও শ্যামলীর সেবিকা হাসপাতালের এক ভুয়া চিকিৎসক।

তিনি বলেন, এসব হাসপাতাল ঘিরে দালালচক্রের প্রায় ৫০০ সদস্য দালালি করে থাকে। এ চক্রের সদস্যদের অত্যাচার দিন দিন বেড়েই চলেছে। তারা হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স, অ্যাম্বুলেন্সসহ প্রত্যেকটি স্তরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আসছে। তারা বিভিন্ন বেশে সরকারি হাসপাতালের আশপাশে অবস্থান করে। কখনো হাসপাতালে নার্স আবার কখনো কর্মচারী পরিচয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তার স্বজনদের জানিয়ে দেয় এসব হাসপাতালে কোনো প্রকার চিকিৎসা হয় না, ডাক্তার থাকে না, নার্সরা রোগী ছুঁয়েও দেখে না। তারপরও কেউ ভর্তি হলে সে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এসব মিথ্যা তথ্য দিয়ে রোগীদের মনে আতঙ্ক তৈরি করে তাদের ভাগিয়ে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে নামসর্বস্বহীন বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে ‘হাতুড়ি ডাক্তার’ দিয়ে অপারেশন করে চিরতরে পঙ্গু করে দেয়।

মানিকগঞ্জের টেপড়া থেকে আসা সুমন চন্দ্র সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, কয়েক দিন আগে ঝড়ের সময় গাছের ডাল পড়ে তার ছোট বোনের হাত ভেঙে যায়। স্থানীয় ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যাই। হাসপাতালের একাধিক নার্স পরিচয় দেওয়া নারী জানান, এখানে ভর্তি করলে রোগী ভালো হবে না। উল্টো হাত কেটে ফেলে দেবে। এতে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যাবে। ভয় পেয়ে বোনকে নিয়ে বাড়ি চলে যাই।

র‌্যাব-২-এর একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, রোগীর হাত-পা কেটে ফেলে, পঙ্গু হয়ে যায় এমন সব মিথ্যা তথ্য ছড়ায়। সম্প্রতি তারা হাসপাতালে ভর্তি হলে করোনায় রোগী মারা যায় এমন বানোয়াট সংবাদ প্রচার করে তাদের আশপাশের হাসপাতালগুলোতে নিয়ে ভর্তি করায়। বিনিময়ে রোগীভেদে ৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দালালি নিয়ে থাকে। গতকাল র‌্যাবের অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ বসু শ্যামলীর সেবিকা হাসপাতালের পরিচালক ও ওটি ইনচার্জ ভুয়া ডাক্তার সাইফুল ইসলামকে (৩৮) এক বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা জরিমানা এবং নিম্নমানের সেবা প্রদানসহ নিয়মিত ডাক্তার না থাকায় হাসপাতালের মালিক এমএম শাখাওয়াত হোসেনকে ৪ লাখ টাকা এবং ম্যানেজার মহিবুল্লাহকে (৩০) ২ লাখ টাকাসহ মোট ৮ লাখ টাকা জরিমানা করেন। এছাড়া পঙ্গু হাসপাতালের দালালচক্রের সদস্য রেজাউল করিম (৩০), মানিক মিয়া (৩৮), বিল্লাল হোসেন (৫০), কল্পনা আক্তার (৪০), মর্জিনা বেগম (৩৫) ও আজিরন বেগমকে (৪২) ছয় মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

শিশু ও পঙ্গু হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, অনেক দিন ধরেই র‌্যাবের অভিযান চলছে। মাঝেমধ্যেই জেল-জরিমানার শিকার হচ্ছে দালালচক্রের সদস্যরা। তারপরও আইনের ফাঁক গলিয়ে জামিনে বের হয়ে নতুন কৌশলে একই পেশায় জড়িয়ে পড়ে। এসব হাসপাতালের কিছু চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর যোগসাজশে বিশালসংখ্যক বহিরাগত লোকজন বেশ কয়েক বছর ধরে দালালচক্রের প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে কাজ করে থাকে।

শেরে বাংলানগর থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এক পঙ্গু হাসপাতাল ঘিরেই দুই শতাধিক দালাল রয়েছে। এসব দালালকে হাসপাতালের ভেতর থেকেই ফোন করে জানানো হয় কখন কোন গুরুতর রোগী আসে। বিনিময়ে হাসপাতালের কর্মচারীরা কমিশন পায়। এছাড়া ভবঘুরের বেশে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেট ও এর আশপাশে সবসময় দালালদের সোর্স থাকে। একজন রোগী আসার সঙ্গে সঙ্গে খবর পেয়ে যায় দালালচক্রের সদস্যরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পঙ্গু হাসপাতাল এলাকার আশপাশে অন্তত অর্ধশতাধিক প্রাইভেট ক্লিনিক গড়ে উঠেছে। এসব প্রাইভেট ক্লিনিকের মালিকরাই দালালচক্রের সদস্যদের মাধ্যমে তাদের বাণিজ্য চালিয়ে থাকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত