বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দুটি প্রধান চালিকাশক্তির একটি রপ্তানি আয় এবং অন্যটি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। কিন্তু করোনা মহামারীর অভিঘাতে বৈশ্বিক অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি মন্দায় ডুবে যাওয়ার শঙ্কায় এই দুটি খাতই তীব্র চাপের মধ্যে আছে। চলমান মহামারীতে দেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাতের একটি হিসেবে এরই মধ্যে প্রবাসী আয় কমে যেতে শুরু করেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদেশে শ্রমবাজারের দুয়ার বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাও বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। আশা করা হয়েছিল, এবারের জাতীয় বাজেটে প্রবাসী শ্রম খাতের সুরক্ষায় জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। বিশেষত, বিদেশ থেকে কাজ হারিয়ে দেশে ফেরা শ্রমিকদের সহায়তায় উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ এবং বিদেশে ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার রক্ষায় পরিকল্পিত পদক্ষেপ আশা করেছিলেন এই খাত সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু বাজেটে এর প্রতিফলন দেখা যায়নি।
করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পরপর গত ২১ জানুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরে আসেন ৬ লাখ ২৪ হাজার ৭৪৩ জন প্রবাসী শ্রমিক। এর পরপরই আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আরও কয়েক লাখ প্রবাসী শ্রমিক বিভিন্ন দেশে আটকা পড়েছেন। যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই মহামারীর কারণে কাজ হারিয়েছেন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস এমন অভিবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের ফেরত আনার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে। অর্থাৎ বিমান চলাচল স্বাভাবিক হলেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরে আসবেন। এদিকে, মহামারী শুরুর আগে কিংবা মহামারীর সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে ছুটিতে আসা শ্রমিকদের একটা বড় অংশই আবার কর্মস্থলে ফিরে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছেন। যাদের অনেকেই হয়তো ইতিমধ্যেই কাজ হারিয়েছেন কিংবা কাজ হারিয়ে আর ফিরতে না পারার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক শ্রমবাজার সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। কিন্তু করোনা মহামারীর প্রভাবে বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ব্যাপক মূল্যপতন ঘটায় অর্থনৈতিক সংকট লাঘবে সৌদি আরব অনেক বড় বড় প্রকল্প স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। যে কারণে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী শ্রমিককে পর্যায়ক্রমে ফেরত পাঠাবে দেশটি। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়াবে ১২ লাখ। ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিতে থাকা এই শ্রমিকদের বড় একটি অংশই প্রবাসী বাংলাদেশি। রিয়াদভিত্তিক জাদওয়া ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির প্রক্ষেপণের ওপর ভিত্তি করে গত সোমবার সৌদি গেজেটের এক প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এদিকে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসও সম্প্রতি জানিয়েছে, মহামারীর অভিঘাতে চলমান অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সৌদি আরব থেকে ১০ লাখ বাংলাদেশি অভিবাসীকে দেশে ফিরে আসতে হতে পারে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে প্রায় ২১ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক বিভিন্ন পেশায় কর্মরত। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে যে ১ লাখ ২৯ হাজার বাংলাদেশি কাজের জন্য বিভিন্ন দেশে যান তার মধ্যে ৯৫ হাজার ৩৮৪ জনই গিয়েছেন সৌদি আরবে। কিন্তু একদিকে করোনা মহামারীর কারণে জ্বালানি তেলনির্ভর অর্থনীতিতে মন্দা আরেক দিকে সৌদি আরবের ২০৩০ ভিশন অনুযায়ী, পুরো সৌদির শ্রমবাজারে ৭০ শতাংশ সৌদি আরবের নাগরিককে নিয়ে আসার পরিকল্পনার কারণে দেশটিতে ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারও সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঠানো রেমিট্যান্সের ৭৩ শতাংশের বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্যের গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা ‘জিসিসি’ দেশগুলো থেকে। এই রেমিট্যান্স প্রবাহ সরাসরি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে প্রভাবিত করে এবং অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য একটি জীবনরেখা হিসেবে কাজ করে। সৌদি আরব এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলেও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ এবং ইউরোপ-আমেরিকার অভিবাসী শ্রমবাজারের অবস্থাও সংকটাপন্ন।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ মানুষ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশসহ দেড়শতাধিক দেশের শ্রমবাজারে অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। জিডিপিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান ১২ শতাংশ। খেয়াল করা দরকার, করোনা মহামারীতেও প্রবাসী শ্রমিকের অবদানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। কিন্তু প্রবাসী আয় যে কমছে সেটাও স্পষ্ট। চলতি অর্থবছরে ২১ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় আশা করা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ মাসে প্রবাসী আয় এসেছে ১৭ বিলিয়ন ডলার। এ অবস্থায় দেশে ফিরে আসা প্রবাসী শ্রমিকদের সহায়তায় বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার সরকারের। পাশাপাশি শ্রমবাজার সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে যোগ্য প্রতিনিধি নিয়োগ, ভবিষ্যৎ বৈদেশিক শ্রমবাজার নিয়ে গবেষণা জোরদারসহ অভিবাসী কর্মী হতে আগ্রহীদের নানা পেশায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। কেননা, উচ্চতর দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীরা স্বল্প দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের তুলনায় যেমন দেশে বেশি অর্থ পাঠাতে পারেন তেমনি প্রেরিত অর্থ বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রেও তারা সুবিবেচনার পরিচয় দেন।
