বাজির দর ৫০০: ১। বাজি যদি ধরতেই হয় কোন পক্ষে ধরবেন সে প্রশ্ন করা বোকামি। হেড অফিস খালি না হলে কেউ তো আর ১ এর পক্ষে জুয়া খেলবে না। বিস্ময় ও মজার ব্যাপার হলো, কোটি কোটি বাংলাদেশি সেদিনও ক্রিকেট দুনিয়ার সেরা আবেগি বুদ্ধু সেজে ১ এর ওপর বাজি ধরেছিল। জুয়ার বোর্ডে টাকা ফেলে নয়, মনের জোরে। হৃদয়ে প্রিয় বাংলাদেশের ছবি এঁকে। কারণ, সেদিনও এ দেশের প্রথম বৈশ্বিক ক্রিকেট সুপারস্টার মোহাম্মদ আশরাফুল লাল-সবুজের পতাকার নিচে ব্যাট হাতে মাঠে নামতেন।
এই ছোটখাটো গড়নের তাগড়া জোয়ান কী অস্বাভাবিক আর অসম্ভব স্বপ্নই না দেখতে শিখিয়েছিলেন ক্রিকেটপাগল দেশটাকে। মাতৃভূমির পক্ষে সব অবস্থায় বাজি ধরা চলে। কিন্তু খালি চোখে যেখানে সর্বস্বান্ত হওয়ার নিশ্চিত চিত্র দেখা যায় সেখানে একটু থমকে না গিয়ে উপায় কী?
কার্ডিফে ২০০৫’র ১৮ জুন বাজির দর ওই ১ ছিল ৫০০-এর বিপরীতে। অস্ট্রেলিয়া ৫০০। কোন অস্ট্রেলিয়া? বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন এবং সর্বজয়ী অস্ট্রেলিয়া। স্টিভ ওয়ার হাত থেকে পতাকা নিয়ে সেটিকে আরও উচ্চতায় তুলে ধরা রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু দিন শেষে বোকা বনে গিয়েছিল ১-কে স্বাভাবিক হিসেবে অবজ্ঞায় দূরে ছুড়ে ফেলে ৫০০-তে হাত রাখা মাথাগুলো। পন্টিংয়ের বোকা বোকা চেহারা, গিলক্রিস্ট, হেইডেন, মার্টিন, ক্লার্কদের বিস্ময়, হা হয়ে যাওয়া মাইক হাসি, ক্যাটিচদের বিহ্বলতা কিংবা কাসপ্রোভিচ, গিলেস্পি, ম্যাকগ্রা, হগদের অবিশ্বাসভরা চেহারা এখনো ক্রিকেটপ্রেমী মাত্র এই ম্যাচের কথা ভেবে উপভোগ করেন খুব। দিনটা ছিল সত্যিকারের উপভোগের। আশরাফুলের জাদুকরী ব্যাটিং মোহমুগ্ধ করে ক্রিকেট প-িতদেরও বলিয়ে নিয়েছে, ওটা ওয়ানডে ইতিহাসের সেরা ইনিংসগুলোর প্রথম দিকের একটা। কী ব্যাটিংটা না করেছিলেন ২১ বছরের টগবগে আশরাফুল।
প্রডিজি হিসেবে তার পথের শুরু। টেস্ট ইতিহাসের কনিষ্ঠতম সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে রেকর্ড। রাজসিক ব্যাটিং। ব্যাকরণের সবগুলো শটকে নির্ভীক হৃদয়ে যে কোনো পরাক্রমশালীর বিপক্ষে মাঠে ফুটিয়ে তুলতেন শিল্পীর তুলিতে। উপভোগের পেয়ালাকে উপচে দেওয়া ব্যাটিং ছিল তার। রবি শাস্ত্রি সেই সময়ে আশরাফুলকে বলতেন ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২১ বছর বয়সে বিশ্বের সেরা। শচিন টেন্ডুলকার তার ব্যাটিংয়ের টানে বাংলাদেশে এসে আশরাফুলের বাড়িতেও ঘুরে যান। পরে আইপিএলে তার মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সেও টেনে নিয়েছিলেন নিলামে।
২০০৫’র আশরাফুলের ব্যাট হয়ে উঠেছিল তরবারি। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে মহাকাব্যিক ১০০, পরের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঔদ্ধত্যপূর্ণ ৯৪, ঠিক পরেরটায় আবার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৫৮ তিনজাতির ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির উদ্বোধনী ম্যাচে ক্রিকেট বিশ্বকে মহাঝাঁকুনি দেওয়া আশরাফুল হয়তো তখন বিশ্বের যে কারও চেয়ে ছিলেন সেরা। আশরাফুল পারলে টাইম মেশিনে ফিরে যেতে চান সেই সময়টায়। আবার শুধরে নিতেন জীবনের ভুলগুলো।
এত কথা আসছে আজকের ১৮ জুন আশরাফুলের সেই দিন বলে। এই দিনেই কার্ডিফে আবহেলিত বাংলাদেশের ক্রিকেট বরপুত্র আশরাফুল অস্ট্রেলিয়াকে প্রায় একা হাতে হারিয়ে দিয়েছিলেন। ১০১ বলে ১১ বাউন্ডারিতে ঠিক ১০০ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। নিজের ৫০তম ওয়ানডেতে গিয়ে ১৭৭ ম্যাচের ক্যারিয়ারের ৩ সেঞ্চুরির প্রথমটি পেলেন। স্বর্গ থেকে টেনে নামালেন অজেয় অস্ট্রেলিয়াকে।
আগে ব্যাট করে ৫ উইকেটে ২৪৯ রান করেছিল অস্ট্রেলিয়া। জবাবে ৭২ রানে ৩ উইকেট হারানোর মধ্যেই আশরাফুলের ব্যাটে ফুলকি দেখতে পেয়েছে বাংলাদেশ। অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমনের সঙ্গে চতুর্থ উইকেটে ১৩০ রানের জুটি। ক্যাপ্টেন করেছিলেন ৪৭। ২২৭ রানের সময় আশরাফুলের উইকেট পড়লে আরেক প্রতিভা আফতাব আহমেদ অপরাজিত ২১ রানের ইনিংস খেলে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়টি এনে দেন। ৫ উইকেটের জয়। আশরাফুল ম্যাচসেরা।
বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে তলানির দলের কাছে হার বছরের পর বছর এক নম্বরে থাকা চ্যাম্পিয়নদের অহঙ্কারে প্রবল বেগে গিয়ে লেগেছিল হাতুড়ির আঘাত। ভেঙে চুরমার তারা। সিডনির ডেইলি টেলিগ্রাফ সেটিকে ‘আমাদের খেলার ইতিহাসের সবচেয়ে বিব্রতকর হার’ বলে আখ্যা দিয়েছিল। ক্রিকেট বিশ্ব বলেছিল, ‘গ্রেট আপসেট’।
সেই আশরাফুল। আর সেই ইনিংস। আজ ১৯ বছর পরও পেছনে ফিরে প্রত্যেকটা মুহূর্ত জীবন্ত দেখতে পান। ক্যারিয়ারের শুরু থেকে ছিলেন অধারাবাহিক। কিন্তু নিজের দিনে যে কাউকে খুন করে ফেলতে জানতেন।
