এমসিসিআইর বাজেট-পরবর্তী ওয়েবিনার

বাজেটের ব্যাংকঋণ নির্ভরতা বিনিয়োগ কমাবে

আপডেট : ১৮ জুন ২০২০, ০৭:১৫ এএম

প্রস্তাবিত বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে। গত কয়েক বছর যাবৎ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। এ অবস্থায় প্রস্তাবিত ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে আরও বাধাগ্রস্ত করবে।

গতকাল বুধবার আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) বাজেট-পরবর্তী ওয়েবিনারে এ মতপ্রকাশ করেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। অ্যামচেম সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদের সভাপতিত্বে ওয়েবিনারে অংশ নেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া ও অ্যামচেমের সাবেক সভাপতি আফতাব উল ইসলাম।

স্বাগত বক্তব্যে অ্যামচেম সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, তারল্য সংকটের এই মুহূর্তে প্রস্তাবিত বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বেশিরভাগ ঋণ নেওয়া যেতে পারে। যা বাজারে অর্থসহায়তা বাড়াতে সহায়তা করবে। তিনি আরও বলেন, ১০ শতাংশ কর দিয়ে অপ্রদর্শিত সম্পদ বা অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া অনৈতিক। এতে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হবেন। তবে পুঁজিবাজারকে উৎসাহিত করতে বা শিল্প বিনিয়োগ বা উৎপাদনশীল খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তা গ্রহণযোগ্য, সে ক্ষেত্রে অবশ্যই কর ১০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত।

আলোচনায় অংশ নিয়ে মির্জ্জা আজিজ বলেন, বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ, যা অবাস্তব ও অর্জন করা অসম্ভব। বিশ^ব্যাংক ও আইএমএফ বলছে প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশের কম হবে। তার মানে রাজস্ব আদায় কমবে। ঘাটতি মেটাতে সরকার ৮৫ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এর কতটুকু বেসরকারি ব্যাংক থেকে এবং কতটুকু কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া হবে তা বলা হয়নি। গত কয়েক বছর যাবৎ বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। এ অবস্থায় মাত্রাতিরিক্ত সরকারের ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করবে।

সঞ্চালকের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিশ^ব্যাংক ও আইএমএফের সুশাসনের সূচকে নিচের দিকে বাংলাদেশের অবস্থান। দুর্নীতি আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আছে। দুদক কাজ করলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত অ্যাকশন নিতে হবে, না হলে দুর্নীতি কমবে না। এজন্য বাংলাদেশের নিজস্ব অ্যাসেসমেন্ট করা এবং সে অনুযায়ী অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করা দরকার।

মির্জ্জা আজিজের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, প্রবৃদ্ধির আশাবাদ আছে। আমাদের রেমিট্যান্স আসছে, রিজার্ভ ভালো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ওপেন হয়ে গেছে। এসব বিবেচনায় নিয়ে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তারপরও ফিগার ইজ অ্যা ফিগার। এটা সামনের কথা। এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। তিনি আরও বলেন, ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক থেকে, সঞ্চয়পত্র থেকে ধার নেবে। ব্যাংক খাতে যথেষ্ট শক্তিশালী। তাছাড়া বিশ^ব্যাংক ও আইএমএফের কাছ থেকে টাকা চাইতে পারি। আমাদের অতীত রেকর্ড ভালো। বিদেশি উৎস থেকে ঋণ পেতে সমস্যা হবে না।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে অর্থনৈতিক অঞ্চল, করপোরেট কর হ্রাস, কর অবকাশসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারপরও বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবী আগের জায়গায় এখন নেই। দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে সেলসম্যানের মতো বিনিয়োগ আনতে কাজ করতে হবে। এটাতে সময় লাগবে। কারণ আমলাতন্ত্র একটু ধীরেই চলে। তারপরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অন্য সব দেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কর্মসংস্থান বাড়াতে বাজেটে কী উদ্যোগ আছে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, নতুন কর্মসংস্থান তো পড়ে, কভিডের কারণে যারা চাকরি হারিয়েছে আগে তাদের চিন্তা করা হচ্ছে। সরকার দুটি টার্গেট নিয়ে কাজ করছে। প্রথমত. করোনার কারণে যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে ঢুকে গেছে তাদের তৎক্ষণাৎ সাপোর্ট দেওয়া। এজন্য ৪০ লাখ পরিবারকে ১০ টাকা কেজিতে চাল ও আড়াই হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত. লকডাউনের পর সরকার ঝুঁকি নিয়ে সব উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এতে যারা দিন এনে দিন খায় তারা কাজে ফিরেছে।

অ্যামচেমের সাবেক সভাপতি আফতাব উল ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে এসএমই খাতের উন্নয়নে বেশকিছু সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু সরকারের এসব সুবিধা কাগজপত্রের পদ্ধতিগত জটিলতার প্রকৃত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা পাচ্ছে না। ব্যাংকগুলো এসএমইকে ঝুঁকিপূর্ণ এন্টারপ্রাইজ মনে করে ঋণ দেওয়া থেকে বিরত রয়েছে।

পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনুসর বলেন, নৌ ও রেলপথে পণ্য পরিবহন ও যাতায়াত খরচ কম হওয়ার পরও স্বাধীনতার পর সড়কই সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়ে আসছে। নদীগুলো ড্রেজিং করা গেলে যোগাযোগ বাড়ত।

ওয়েবিনারে আরও অংশ নেন ইউএসএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডেরিক ব্রাউন, ঢাকা চেম্বারের সভাপতি শামস মাহমুদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক সাবেক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ ও বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত