করোনার মধ্যেই সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা পাচ্ছেন এমপিরা

আপডেট : ২০ জুন ২০২০, ০৬:১৬ এএম

করোনা পরিস্থিতির কারণে সরকার উন্নয়ন কর্মকা- শিথিল করে মানুষের জীবন ও জীবিকার বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর মধ্যেই সংসদ সদস্যদের (এমপি) জন্য প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। নিজ নিজ সংসদীয় এলাকার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে রাস্তাঘাট, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে এ অর্থ ব্যয় করবেন তারা। সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে এ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতেও এ ধরনের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ টাকা মূলত এমপিদের তুষ্ট করার জন্য দেওয়া হয়; স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যয় হয় না। নতুন করে প্রকল্প শুরুর আগে পুরনো প্রকল্পগুলোর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রয়োজন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেরপুর-১ আসনের এমপি ও জাতীয় সংসদের হুইপ আতিউর রহমান আতিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত এক দশকে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছে। এরপরও আমার আসনে ৬০-৭০ ভাগ রাস্তা পাকা করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৩০-৪০ ভাগ রাস্তা, ছোট ছোট সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে বরাদ্দ জরুরি। কারণ সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। আমার আসনে ১৪টি ইউনিয়ন, জনগণের চাহিদা পূরণ করতে পারি না। এজন্য প্রতি বছর যে টাকা আসে তা অপ্রতুল, বরাদ্দ আরও বাড়ানো উচিত।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের টাকায় দুর্নীতি বা নয়-ছয় করার করার কোনো সুযোগ নেই। আমরা (এমপি) আগেই নোট দিই, সে অনুসারে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এমপি হিসেবে আমি জানিও না কে বা কারা টেন্ডার পেল। এটা বলতে পারি, আমার আসনে কোনো অনিয়ম হয় না। কাজের মান যেন নিশ্চিত হয়, সেজন্য অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেই।’

পরিকল্পনা কমিশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক এ প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে। এটি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের চলমান একটি প্রকল্পেরই তৃতীয় পর্যায়ের প্রকল্প। এতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ৬ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। চলতি বছর থেকে ২০২৪ সাল নাগাদ এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। প্রতি বছর ৫ কোটি করে চার বছরে মোট ২০ কোটি করে টাকা পাবেন প্রত্যেক এমপি। এ অর্থে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করবেন তারা।

কমিশন কর্মকর্তারা জানান, আগামীকাল রবিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভায় গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যোগ দেবেন ও সভাপতিত্ব করবেন। সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান অনলাইনে ব্রিফ করবেন।

উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাবনা বা ডিপিপি থেকে জানা গেছে, সবাই ২০ কোটি টাকা করে পেলেও সিটি করপোরেশন এলাকার ২০ এমপি এবং সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিরা এ বরাদ্দের বাইরে থাকবেন। এ হিসাবে ২৮০ এমপির জন্য ৬ হাজার ৪৭৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকার এ প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমপি বা জনপ্রতিনিধিদের প্রতি স্থানীয় ভোটারদের অনেক চাহিদা বা দাবি থাকে। বাস্তবতার খাতিরে এসব দাবির অনেক কিছুই পূরণ করতে হয়। না হলে এমপিদের মুখ থাকে না। এজন্য এ অর্থ দিয়ে ছোট ছোট সেতু, কালভার্ট ও রাস্তা নির্মাণ বা উন্নয়ন করা হয়। তিনি বলেন, করোনার সময় এ প্রকল্প নেওয়া হলেও এখনই বাস্তবায়ন হয়ে যাবে তা নয়। কিন্তু করোনার পরে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি আমাদের রাখতে হবে। এ কারণে প্রকল্পের পুরো টাকাই গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর প্রত্যেক এমপি নিজ নিজ আসনের অবকাঠামো উন্নয়নে ১৫ কোটি টাকা করে পেয়েছিলেন। সে সময় প্রকল্প ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৮৯২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এ প্রকল্প ২০১০ সালের মার্চে শুরু হয়ে ২০১৬ সালের জুনে শেষ হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে এ প্রকল্পে এমপিদের ২০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এ পর্যায়ে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৬ হাজার ৭৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন মাস। এ প্রকল্প শেষ না করেই তৃতীয় মেয়াদে এমপিদের ফের ২০ কোটি টাকা করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এ প্রকল্প নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি মূলত এমপিদের তুষ্ট করার প্রকল্প। টাকা ব্যয়ে তেমন স্বচ্ছতা থাকে না। ইচ্ছামতো ব্যয় করেন এমপিরা। ছোট ছোট প্রকল্প নিয়ে অর্থ ব্যয় করা হয় বিধায় এ বিষয়ে তেমন গুরুত্বও দেওয়া হয় না। ফলে টাকা জনগণের কোনো কাজে আসছে না; অপচয় হচ্ছে। আর স্থানীয় কিছু লোকজনের পকেট ভারী হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুরু থেকেই এ প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নয়নের নামে অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে। এখন নতুন করে এ প্রকল্প নেওয়ার আগে আগের প্রকল্পগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন দরকার। আগে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে কী উপকার হয়েছে, জনগণের কী কল্যাণ হয়েছে সেটা জানতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। নইলে দুর্নীতি বাড়াবে।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘এই সময়ে এ প্রকল্প সময় উপযোগী নয়। কারণ এখন উন্নয়নের চেয়ে মানুষের জীবন ও জীবিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উন্নয়নের নামে অরাজকতা চলছে, এটা তার বহিঃপ্রকাশ। আমাদের দুর্ভাগ্য। কারণ এসব কর্মকা-ের ফলে লুটেরা তৈরি হচ্ছে, অন্যায় হচ্ছে।’

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এ প্রকল্পের আওতায় এমপিরা সরাসরি টাকা পান না। এমপিরা শুধু তাদের নির্বাচনী আসনে পছন্দ মোতাবেক প্রকল্পের নাম দেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আরও জানান, তৃতীয় দফার এ প্রকল্পের আওতায় নতুন করে উপজেলা সড়ক নির্মাণ করা হবে ৩০৫ দশমিক ২১ কিলোমিটার। ইউনিয়ন সড়ক নির্মাণ করা হবে ৬৬০ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার। গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন হবে ৫ হাজার ৭৫ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার। গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ হবে ১ হাজার ৯০ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার। গ্রামীণ সড়কে ১০০ মিটারের কম দৈর্ঘ্যরে সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হবে ৭ হাজার ৯৯২ দশমিক ২২ মিটার।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) জাকির হোসেন আকন্দ দেশ রূপান্তরকে বলেন, দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পটি আগামী বছর জুনে শেষ হয়ে যাবে। এরপর এটির কাজ শুরু হবে। গুরুত্ব বিবেচনায় আগামী একনেকে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত