সীমান্ত সংকট

সর্বদলীয় বৈঠকে তোপের মুখে মোদি

আপডেট : ২০ জুন ২০২০, ০৬:২০ এএম

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মোট ১৮ বার চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। গত ছয় বছরে মোদি একাধিকবার চীন গেছেন, শি চিনপিং ভারতে এসেছেন। গুজরাটে সবরমতী নদীর ধারে দুই নেতার দোলনায় বসে আলোচনার ছবি ভাইরাল হয়েছিল, যাকে মোদির দোলনা-কূটনীতি বলে আখ্যাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু লাদাখ সীমান্ত নিয়ে চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে ভারতীয় সেনাদের মৃত্যুর ঘটনা ওই কূটনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে জয়শঙ্করকে বসান মোদি। প্রধানমন্ত্রীর আশা ছিল সংকটের সময় জয়শঙ্কর বেশ ভালো খেল দেখাবেন। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, ভারতের সংকটকালে জয়শঙ্করের টিকি পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। ভারত-চীন সীমান্ত সমস্যা ও সংঘর্ষের পর ভারতের কূটনীতি নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। বিরোধীরা তুলছেন। বিশেষজ্ঞরা তুলছেন। বিরোধীরা একে বলছেন নিষ্ক্রিয়তা। শুরুটা করেছিলেন সোনিয়া গান্ধী। ২০ জন সেনার মৃত্যুর পর তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, কেন এতজন ভারতীয় সেনাকে প্রাণ দিতে হলো? চীন ভারতের কতটা জমি দখল করে বসে আছে, প্রধানমন্ত্রী জানান। রাহুল গান্ধীর প্রশ্ন ছিল, প্রধানমন্ত্রী দুদিন পরে টুইট করলেন, তারপর কেন তাতে চীনের নাম পর্যন্ত নিলেন না। এটা ভারতীয় সেনার অপমান।

সীমান্তের লাদাখে ভারতীয় ও চীনা সেনাদের সংঘর্ষের ঘটনায় সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছেন মোদি। গতকাল শুক্রবার বিকেল ৫টায় এই বৈঠক শুরু হয়। ২০টি রাজনৈতিক দল ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠকে উপস্থিত ছিল। বৈঠকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ও বিজেপি সভাপতি জগৎ প্রকাশ নাড্ডা যোগ দেন। বৈঠক শুরুর পরই বিরোধীরা প্রশ্ন তোলেন, সরকার ঘুমিয়ে না থাকলে কি লাদাখের ঘটনা ঘটতে পারত? রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, সরকারের অসতর্কতার মূল্য জীবন দিয়ে চোকাতে হয়েছে সীমান্তরক্ষীদের।

বিতর্ক তৈরি হয়েছে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বৈঠকে আমন্ত্রণ না পাওয়াকে কেন্দ্র করে। এ ছাড়া আমন্ত্রণ পায়নি লালু প্রসাদের আরজেডি, আসাদউদ্দিন ওয়াইসির এআইএমআইএম-ও। দেশের সীমান্তে যখন বিপজ্জনক সংঘাতের পরিস্থিতি, তখন প্রধানমন্ত্রীর সর্বদল বৈঠকে এই দলগুলোকে কেন ডাকা হলো না? এখানেও কি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চাওয়া হলো? এমন প্রশ্ন তোলা শুরু হয়েছে ওই দলগুলোর তরফে। কিন্তু সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, যে মাপকাঠির ভিত্তিতে সর্বদল বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বিভিন্ন দলকে, আরজেডি, আপ বা এআইএমআইএম সেই মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হতে পারছে না।

বৈঠকে বিরোধী শিবিরের একের পর এক প্রশ্নবাণে যখন নরেন্দ্র মোদি জর্জরিত হচ্ছিলেন, তখনই নতুন করে নাটকীয়তার জন্ম দেয় চীন। ভারতের ১০ সীমান্তরক্ষীকে মুক্তি দেওয়া নিয়ে টালবাহানা শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে কিছু সময়ের জন্য বৈঠক স্থগিত রাখা হয়। পরে চীন ১০ ভারতীয় সেনাকে মুক্তি দেয়। ছাড়া পাওয়াদের মধ্যে একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল এবং তিনজন মেজর আছেন বলে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর বেশ কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু জানিয়েছে। গত বুধবার দুই পক্ষের আলোচনায় আটক ভারতীয় সেনাদের মুক্তির বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছিল; এরপরই বৃহস্পতিবার তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

চীনের সঙ্গে মোদির সখ্য প্রশ্নে বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে একটা সমঝোতা হয়েছিল। দুই দেশের সেনা পেছনে চলে যাবে। চীনের সেনা যদি কোথাও না পিছোয়, তা হলে তা সন্ধ্যার সময় দেখতে যাওয়ার কী দরকার ছিল? আলোচনা যখন চলছে, তখন এটা নিয়ে আলোচনা করা যেত। আরও চাপ দেওয়া যেত। আজকাল তো উপগ্রহের ছবিই সবকিছু দেখিয়ে দেয়। আগে যদি চীনা সেনারা ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ে, তা হলে তখনই কেন প্রতিবাদ করা হলো না? পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর বলেছেন, সেনারা বন্দুক নিয়ে গিয়েছিলেন, তা হলে আক্রান্ত হওয়ার পরও কেন গুলি চালানো হলো না? জয়শঙ্করই বলেছেন, চীনের সঙ্গে দুটি চুক্তি অনুযায়ী প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় কেউ গুলি চালায় না। নিঃসন্দেহে ভালো চুক্তি। তাতে বিরোধটা চরম জায়গায় পৌঁছায় না। তা হলে ওই উত্তেজনার মধ্যে সেনাদের এভাবে পাঠানোর কারণ কী?

গালওয়ানের ঘটনার পরে সেনা স্তরে আলোচনা হচ্ছে। সেটা দরকার। কিন্তু চীন প্রথমেই বার্তা দিয়ে দিয়েছে, ভারতই নাকি তাদের সীমান্তে ঢুকেছিল। তাই এই সংঘর্ষ হয়েছে। তার পাল্টা কূটনৈতিক বার্তা ভারতের তরফে দেওয়া হয়নি। বিশ্বের কাছে চীনের বার্তাই গেছে। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ব জনমত নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা থেকেও বিরত থেকেছে ভারত। তাদের  প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে খুবই সাবধানি মনে হয়েছে। মোদি তো প্রথম থেকে আলোচনার নীতি নিয়েই চলছিলেন। বিভিন্ন ফোরামে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল। কিছুদিনের মধ্যে আরআইসি অর্থাৎ রশিয়া, ইন্ডিয়া, চীনের ফোরামেও আলোচনা হওয়ার কথা। সেই আলোচনার আবহেই তো সমস্যা মেটার সবচেয়ে ভালো সম্ভাবনা। ডোকলাম সংকট সেভাবেই কেটেছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত