দুর্দশায় শিক্ষানবিস আইনজীবীরা

আপডেট : ২০ জুন ২০২০, ০৬:২২ এএম

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে উচ্চ ও অধস্তন আদালতে নিয়মিত বিচারিক কার্যক্রম প্রায় তিন মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে উপার্জন বন্ধ থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন আদালতের ৬০ হাজারেরও বেশি শিক্ষানবিস আইনজীবী। গত কয়েক বছর ধরে দেশে আইন বিষয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু আইনজীবী হিসেবে সনদ পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকা শিক্ষানবিস অনেক আইনজীবীর মধ্যেই ভর করছে হতাশা। এরই মধ্যে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে এসেছে করোনাভাইরাস সংকট। সহসাই এ পরিস্থিতি বদলের সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, করোনাকালীন সংকটে শিক্ষানবিস আইনজীবীদের অনেকেই বাসাভাড়া দিতে পারছেন না। অর্থাভাবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ রাজধানী ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। অনেকেই বাবা, ভাই কিংবা স্বজনদের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করছেন। আইনজীবী হওয়ার ‘স্বপ্নভঙ্গে’ ইতিমধ্যে কেউ কেউ অন্য পেশায় ঝুঁকেছেন কিংবা চেষ্টায় আছেন।

আইনে কমপক্ষে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর একজন শিক্ষার্থী বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) শেষে শিক্ষানবিস আইনজীবী হিসেবে কোনো সিনিয়রের (জ্যেষ্ঠ আইনজীবী) অধীনে ছয় মাসের প্রবেশনকালীন সময়ে মামলা ও আইনি বিষয় সম্পর্কে অবহিত হন। সিনিয়রকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি এ সময়ে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির পরীক্ষার প্রস্তুতিও নেন তিনি। কিন্তু বার কাউন্সিলের ‘অনিয়মিত’ পরীক্ষা এবং বড় একটা অংশের পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়াসহ নানা কারণে তাদের শিক্ষানবিসকাল দীর্ঘায়িত হয়। শিক্ষানবিস আইনজীবীর আয়-রোজগারের বিষয়ে কোনো নীতিমালা বা ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সিনিয়র আইনজীবী যে ধরনের আর্থিক সুবিধা দেন, সেটি নিয়েই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এটিও নির্ভর করে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বা ল চেম্বারের আন্তরিকতা ও মামলার আধিক্যের ওপর। শিক্ষানবিসদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই তারা আর্থিক বঞ্চনার মুখোমুখি হন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মামলার দৈনিক কার্যক্রমের ওপর তাদের উপার্জনের বিষয়টি নির্ভর করে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটিও বন্ধ।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল বিধি অনুযায়ী ‘অ্যাডভোকেট’ হিসেবে তালিকাভুক্তির (এনরোলমেন্ট) জন্য বছরে দুবার পরীক্ষা হবে। এজন্য প্রথমে প্রিলিমিনারি (এমসিকিউ) ও পর্যায়ক্রমে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় বসতে হয় শিক্ষার্থীদের। ঢাকাসহ বিভিন্ন বারে প্র্যাকটিসরত একাধিক শিক্ষানবিস আইনজীবী জানান, গত কয়েক বছর ধরে বছরে একবারও পরীক্ষা হচ্ছে না। ২০১৭ সালের ২১ জুলাই আইনজীবী তালিকাভুক্তির প্রথম ধাপের (প্রিলিমিনারি) পরীক্ষার পর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষ করে আরেকটি প্রিলিমিনারি পরীক্ষার (গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে) আয়োজন করতে বার কাউন্সিলের সময় লেগেছে আড়াই বছরেরও (৩১ মাস) বেশি। সবশেষ পরীক্ষায় নতুন-পুরনো মিলিয়ে ৫০ হাজারের মতো শিক্ষার্থী অংশ নিলেও বেশিরভাগই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। করোনাভাইরাসজনিত সংকটে লিখিত পরীক্ষা ও অনুত্তীর্ণদের ফের পরীক্ষার সময় নির্ধারণ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

ঢাকা জেলা ও মহানগর দায়রা আদালতের শিক্ষানবিস আইনজীবী এ কে মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একে তো বছরের পর বছর বার কাউন্সিলের পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা, এখন করোনা সংকটের কারণে আদালতের নিয়মিত বিচার কার্যক্রম বন্ধ। সব মিলিয়ে চরম দুর্দশায় আছেন শিক্ষানবিস আইনজীবীরা। আমরা যারা ভুক্তভোগী তারা বিভিন্নভাবে আমাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরেছি। কিন্তু এ বিষয়ে বার কাউন্সিলের কোনো উদ্যোগ নেই।’ একই আদালতের শিক্ষানবিস আইনজীবী রবিউল হোসাইন রবি বলেন, ‘আদালতের নিয়মিত বিচার কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিবাহিতরা আরও বেশি বিপাকে রয়েছেন। সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবে অনেকেই মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেন না। বার কাউন্সিলের অনিয়মিত পরীক্ষার কারণেও আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। সনদ থাকলে অন্তত ভার্চুয়াল আদালতে মামলা পরিচালনার সুযোগ পেতাম।’

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রিধারী শিক্ষানবিস এক আইনজীবী হতাশ কণ্ঠে বলেন, ‘এলএলবি পরীক্ষায় পাসের পর অনেকেই মনে করে আইনজীবী হয়ে গেছি। আয়-রোজগারের জন্য পরিবারের চাপ বাড়ে। বার কাউন্সিলের অনিয়মিত পরীক্ষা ও পরীক্ষার পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারিনি। কয়েক বছর আগে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিই। করোনা পরিস্থিতির কারণে এখন সেখানেও বেকায়দায় আছি। আইনি পেশা কোনো চাকরি নয়, কিন্তু আইন পাসের পরও পরীক্ষা নিয়ে কেন এত বিড়ম্বনা!’ আরেক শিক্ষানবিস আইনজীবী বলেন, ‘সনদ পরীক্ষা নিয়ে অপেক্ষা যেন কাটেই না। জীবনের তাগিদে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অল্প বেতনে চাকরি করলেও করোনার কারণে সংকটে আছি। বিকল্প হিসেবে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে কিছু করার চিন্তা করছি।’

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষানবিস আইনজীবীদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো স্বীকৃতি না থাকায় তাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। করোনার এই সংকটে সিনিয়র আইনজীবীদের সবাই যে ভালো আছেন তা কিন্তু নয়। তবে যেসব সিনিয়রের সামর্থ্য রয়েছে আমাদের অনুরোধ থাকবে এই দুর্যোগে তারা যেন জুনিয়রদের পাশে দাঁড়ান।’ তিনি আরও বলেন, ‘বছরে দুইবার বার কাউন্সিলের সনদ পরীক্ষা হওয়ার কথা। কিন্তু তিন বছরেও একটি পরীক্ষা শেষ হয় না। যে কারণে শিক্ষানবিস আইনজীবীদের সোনালি সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ ব্যর্থতা বার কাউন্সিলের।’

ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হোসেন আলী খান হাসান বলেন, ‘ঢাকা বারে হাজার হাজার শিক্ষানবিস আইনজীবী থাকলেও এই মুহূর্তে তাদের ব্যাপারে আমাদের কিছুই করার নেই। তাদের সবাই বার কাউন্সিলের সনদ পাবেন এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ নিয়ে যার যার সিনিয়রের দায়িত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি শিক্ষানবিসদের দায়িত্ব বেশি।’

এ প্রসঙ্গে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বার কাউন্সিলের সনদভুক্তদেরই কেবল আইনজীবী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইতিমধ্যে বার কাউন্সিল থেকে জেলার বারগুলোতে অসচ্ছল আইনজীবীদের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। শিক্ষানবিসরা যেহেতু এখনো আইনজীবী হননি তারা এর আওতাভুক্ত হবেন না। বার কাউন্সিল তখনই তাদের ব্যাপারে ভূমিকা নিতে পারবে যখন তারা সনদভুক্ত হবেন। যার যার সিনিয়ররা তাদের সহযোগিতা করবেন কি না, সেটি সিনিয়রদের মানবিকতা ও মানসিকতার ব্যাপার।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিগত প্রিলিমিনারি পরীক্ষার পর লিখিত পরীক্ষার জন্য তারিখ নির্ধারিত হয়েছিল। কিন্তু করোনার কারণে সেটি স্থগিত হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত