কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ থাকায় নির্দিষ্ট সময়ে পাঠ্যসূচি শেষ করা, পরীক্ষা নেওয়া, ফলাফল ঘোষণা ও নতুন ভর্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ধারণা করা অমূলক নয়, বড় ধরনের সেশনজট ও শিখন ঘাটতিতে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সেই পরিপ্রেক্ষিতে অনলাইন পাঠদান শুরু করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। সার্বিক অবস্থা বোঝার জন্য কিছু গবেষণাও হয়েছে ও হচ্ছে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন পরিচালিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন পাঠদানে আগ্রহী নয়। ওই জরিপে ১৯ হাজার শিক্ষার্থী ও সাত হাজারের বেশি শিক্ষকের মতামত নেওয়া হয়। বায়োটেড নামক আরেকটি বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৭ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে আগ্রহী নয়, ৮২ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন পাঠদানকে মুখোমুখি ক্লাসের মতো কার্যকর মনে করে না। ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর ক্লাস করার উপযোগী গ্যাজেট বা উপকরণ এবং ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই। ব্যানবেইস ও আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের কিছু গবেষণা বলছে বাংলাদেশে শতকরা আশি ভাগ পরিবারে মোবাইল ফোন এবং নয় ভাগের কাছে কম্পিউটার আছে; ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করছে ১৪.৫ শতাংশ। ইউজিসির সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বিশ^বিদ্যালয়ের ৮৬.৬২ ভাগ শিক্ষার্থীর স্মার্ট মোবাইল ফোন রয়েছে, যা অনলাইন শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা গ্যাজেটের শিক্ষামূলক অ্যাপসের সঙ্গে কতটুকু পরিচিত এবং এ বিষয়ে তাদের মনোভাব ও দক্ষতা কতটুকু তা জানতে হবে। আরেকটি গবেষণা বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ ভাগ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী। তবে অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে চালানো ওই গবেষণায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের অর্ধেকেরও বেশি অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ইন্টারনেট ডেটা কেনাকে প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মনে করে।
এসব গবেষণা থেকে সহজেই অনুমেয়, পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে না। একটি সুবিধাবঞ্চিত অংশকে ফেলে রেখে বাকিদের নিয়ে যেকোনো মাধ্যমেই এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ন্যায়সংগত ও একীভূত সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কারণ তা ডিজিটাল বিভেদকে আরও বাড়িয়ে দেবে, যা কখনো কাক্সিক্ষত নয়। কিন্তু অনুমান করা অসংগত হবে না যে, দীর্ঘদিন শ্রেণিকক্ষের বাইরে ও পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাহীন শিক্ষার্থীদের নানাবিধ মানসিক সংকট সৃষ্টি হচ্ছে; দুশ্চিন্তা-হতাশা ও আতঙ্ক প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সংকট তৈরি করছে। সৃজনশীল কিছুর সঙ্গে যুক্ত না থেকে অলসতার কারণে উদ্ভূত নৈরাশ্য যেমন তাদের বিকাশকে ব্যাহত করছে, তেমনি শিখন ঘাটতি তৈরি করছে। এমনকি আগে শেখা অনেক কিছুই হয়তো চর্চার অভাবে হারিয়েও যাচ্ছে।
এ রকম অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার পর শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষাকার্যক্রমে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকা সমীচীন হবে কি? এক দিন আমরা বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব, কিন্তু আমরা জানি না ভবিষ্যতে আরও কোনো সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে কি না। উন্নত বিশে^র অনেক দেশ যেখানে অনলাইন এবং ব্লেন্ডেড মোডে (মুখোমুখি ও অনলাইন ক্লাসের যৌক্তিক সমন্বয়) সফলতার সঙ্গে শিক্ষাকার্যক্রম চালাতে পারছে, সেখানে আমরা শুধু মুখোমুখি শিক্ষার ওপর সর্বাংশে নির্ভর করে থাকব সেটাও উন্নয়নের রোল মডেলের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
নতুন কিছু শুরু করতে গেলে নানামুখী বাধা আসে। সবচেয়ে বড় বাধা তৈরি করে পরিবর্তনের প্রতি মানুষের প্রতিরোধী মানসিকতা (যঁসধহ ৎবংরংঃধহপব)। এই সূত্রেই বলা যায়, মুখোমুখি পাঠদান কার্যক্রমের ওপর সর্বাংশে নির্ভরশীল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয় পক্ষের মধ্যেই কম-বেশি অনলাইন ক্লাসের প্রতি প্রতিরোধী মানসিকতা কাজ করছে। তাহলে কী করা যায়? এ মুহূর্তে আমরা অনলাইন ক্লাসের বিষয়টিকে কি আপদকালীন সমস্যার একটি সাধারণ সমাধান হিসেবে দেখছি? সেটি কি আসলে ঠিক হবে? বরং এখন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে টেকসই উপায়ে ব্লেন্ডেড মোডে রূপান্তর করতে কাজ শুরু করার কথা ভাবা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন প্রস্তাবিত অনলাইন এডুকেশন লার্নিং পলিসিতেও ভবিষ্যতের জন্য টেকসইভাবে পাঠদান কার্যক্রমে অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে সংযুক্ত রাখার পরিকল্পনা থাকা দরকার। সে ক্ষেত্রে আমার প্রথম প্রস্তাবনা হচ্ছে, আর্থ-সামাজিক বিষয় বিবেচনায় সব শিক্ষার্থীকে এ মুহূর্তে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা না গেলেও যতজনকে সম্ভব সঙ্গে নিয়ে অনলাইন ক্লাস শুরু করা। এতে করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনলাইনে পাঠ পরিচালনার সঙ্গে পরিচিতির মাধ্যমে যে অভিজ্ঞতা তৈরি হবে, সেটি পরে পূর্ণাঙ্গ অনলাইন বা ব্লেন্ডেড মোডে যাওয়ার ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সবাই, বিশেষত শিক্ষকরা নিজের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করতে পারার পাশাপাশি নিজের সক্ষমতা ও দক্ষতা সম্পর্কেও আত্মবিশ্বাসী হওয়ার সুযোগ পাবেন। তাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে পরিবর্তনের প্রতি যে প্রতিরোধ কাজ করছে, তা ভেঙে যাবে। যারা নেটওয়ার্কের বাইরে আছে, সেই শিক্ষার্থীদের কাছেও অনলাইন শিখন-শিক্ষণ সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে, ভবিষ্যতে তারাও আগ্রহী হবে।
দ্বিতীয় প্রস্তাবনা হলো, শিক্ষকদের অনলাইনভিত্তিক শিক্ষাকার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত করানো এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিশ^বিদ্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পক্ষ থেকে অনলাইন কোর্সের আয়োজন করা। এসব কোর্সে অনলাইন ক্লাসের প্রস্তুতি কেমন হবে, শিখন উপকরণ কীভাবে তৈরি করা যায়, ভালো ডিজিটাল রিডিং ম্যাটেরিয়াল জোগাড় করা ও সরবরাহ করার কৌশল এবং অন্যান্য কারিগরি দিক অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। শুধু মুখোমুখি ক্লাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ডিজিটাল ক্লাস পরিচালনার মতো এত বড় একটা রূপান্তরের দিকে যেতে চাইলে সামগ্রিকভাবে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার মানসিক স্বাস্থ্যের যে ধরনের অবনতি হয়েছে হতাশা, দুশ্চিন্তা আর শঙ্কা কাটানোর চেষ্টা না করে এই অবস্থায় হঠাৎ করে সিলেবাসের পড়ায় ঢোকা ঠিক হবে বলে মনে করি না। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হতাশা, দুশ্চিন্তা আর শঙ্কা কাটানোর প্রতি মনোযোগ দিতে পারেন, তাদের ভেতর থেকে দুর্যোগমুহূর্র্ত মোকাবিলার প্রস্তুতি ও প্রেষণা দিতে পারেন। তারপর ধীরে ধীরে পড়ায় আগ্রহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারেন। এসব কাজ করতে গিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের নতুন ধরনের গঠনমূলক কাজে সংযুক্তি বাড়বে যাতে উভয় পক্ষই অবসাদ কাটানোর সুযোগ পাবেন। তবে, পাঠ্যসূচি শেষ করা, বিশেষ করে পরীক্ষা নেওয়ার মতো কাজের দিকে যাওয়ার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি দরকার, খুব দ্রুত সেদিকে যাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর বিষয়ে তাড়াহুড়ো করে অনলাইনে গেলে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হবে। খুব তাড়াতাড়ি যাদের নেটওয়ার্কের আওতায় আনা যাচ্ছে না, পরীক্ষা নিতে গেলে তাদের সঙ্গে ডিজিটাল বিভেদ আরও বাড়বে। তবে সবাইকে নেটওয়ার্কের মধ্যে আনার যথাযথ পরিকল্পনা থাকতে হবে। সারা দেশে ইন্টারনেট সহজলভ্য করা, গতি প্রয়োজনীয় মাত্রায় বৃদ্ধি করার প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেসব শিক্ষামূলক সাইট ব্যবহার করবে, সেগুলো সব শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় সামনের দিকে কেন নেই, সেসব নিয়ে মাঝেমধ্যেই সমালোচনার ঝড় ওঠে। আপডেট ওয়েবসাইট ও অনলাইন পাঠদান কার্যক্রম না থাকা বিশ্ব র্যাংকিংয়ের সম্মুখসারিতে জায়গা না পাওয়ার অন্যতম কারণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রমে টেকসইভাবে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যোগ করা গেলে র্যাংকিংয়ে এগিয়ে আসার সম্ভাবনাও তৈরি হবে। তাই করোনাকালীন এই সময়টাকে যথোপযুক্ত উপায়ে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প দেখছি না।
লেখক : প্রভাষক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়
