সকালবেলা ঝলমলে রোদেলা আবহাওয়ায় অফিসের উদ্দেশে বের হলেন। কিন্তু ফেরার পথে বৃষ্টিতে কাকভেজা। বর্ষার এই সময়ে কখন বৃষ্টি হবে বোঝা মুশকিল। এই বৃষ্টি, এই আবার ভ্যাপসা গরম। একটু ভেবে কাপড় বাছাই করলে ঝামেলা এড়ানো সম্ভব।
নকশাকারদের কথা
বর্ষার পোশাক নিয়ে ফ্যাশন হাউজ অঞ্জনসের স্বত্বাধিকারী শাহিন আহম্মেদ বলেন, বৃষ্টি হলেও, অনেক সময় গুমোট গরম পড়ছে। কারণ বাতাসের আর্দ্রতা বেশি। এমন আবহাওয়ার জন্য পাতলা সুতি পোশাক আরামদায়ক। তবে এ সময় প্রিন্টের ফেব্রিকসের পোশাকও পরা যেতে পারে। কারণ হঠাৎ বৃষ্টিতে যদি কিছুটা ভিজেও যায় কিংবা কাদার দাগও লাগে, তবে বোঝা যাবে না। সুতি কাপড়ে ঘামও কম হবে এবং আরাম বোধ করবেন। এ ছাড়া যাদের সিনথেটিক কাপড়ে সমস্যা হয় না, তারা হালকা সিল্ক, শিফন, জর্জেটের পোশাক পরতে পারেন। এতে কাপড় ভিজে গেলেও বোঝা যাবে না। আবার তাড়াতাড়ি শুকিয়েও যাবে। ঠা-া লাগার আশঙ্কা থাকবে না। আর যে ধরনের কাপড়ই পরা হোক না কেন, এ সময় একটু ঢিলেঢালা পোশাক পরা ভালো। এতে বৃষ্টিতে ভিজলেও কাপড় গায়ের সঙ্গে লেগে দৃষ্টিকটু লাগবে না।
ফ্যাশন হাউজ বিবিয়ানার স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার লিপি খন্দকার বলেন, যারা শাড়ি পরে থাকেন, তাদের জন্য এই মৌসুমে পাতলা সিল্ক, জর্জেট এবং মসলিনের শাড়ি ভালো। আর যারা সালোয়ার-কামিজ পরেন, তারা ঢিলেঢালা সুতি বা সিনথেটিক কাপড়ের কামিজ, কুর্তা পরতে পারেন। বর্ষার সময় একটু শর্ট টপস, ফতুয়া বা কুর্তা পরলে বেশি ভালো লাগবে। জিন্সের সঙ্গে রঙিন টি-শার্টও পরতে পারেন।
বর্ষা মানেই নীল আর উজ্জ্বল রঙের সমাহার। তবে এ সময় যেকোনো উজ্জ্বল রং পরতে পারেন। এ প্রসঙ্গে মুমু মারিয়ার ডিজাইনার মারিয়া মুমু বলেন, ‘বর্ষাকালে দারুণ সব উজ্জ্বল রঙের ফুল ফুটতে দেখা যায়। তাই বর্ষায় শুধু নীল নয়, পরা যেতে পারে যেকোনো উজ্জ্বল রঙের পোশাক। যেমন ম্যাজেন্টা, বেগুনি, গাঢ় সবুজ বা কলাপাতা সবুজ, লাল, হলুদ এই রংগুলো দারুণ লাগবে।
বর্ষায় গাঢ় রঙের পোশাক পরলে পোশাকের নকশা যেন ভারী না হয়। এ প্রসঙ্গে হুরের ডিজাইনার সৌমিন আফরিন বলেন, ‘ভারী নকশার পোশাকের বদলে হালকা নকশার পোশাক বাইরে পরার জন্য ভালো। এ ছাড়া পোশাকের রংও দেখে নিতে হবে। অনেক সময় পোশাক বৃষ্টিতে ভিজে রং উঠে যায়। বেশি ঝুলের ঘের দেওয়াও পোশাক বাদ দিতে হবে। কারণ পোশাকের কোনো অংশ ভিজলেও সহজে শুকাবে না।
ঘরে-বাইরে
যেকোনো আবহাওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত হলো সুতি। বর্ষাকালে মেঘলা আকাশে গুমোট গরমে সুতির পোশাক পরলে যেমন গরম লাগে না, হাওয়া চলাচল করার কারণে সুতির পোশাক খুবই আরামদায়ক। তাই ঘরে বা বাইরে সুতির পোশাকই আদর্শ। সুতির পোশাক অফিসে পরার জন্যও বেশ ভালো। এ সময় সুতির হ্যান্ডলুমের সালোয়ার-কামিজ বাইরে পরার জন্য বেছে নিতে পারেন। আর ঘরে পরতে পারেন সুতির কামিজ, ম্যাক্সি, টপ, টি-শার্ট ও পালাজ্জো। যারা বাইরে বেরোনোর সময় সুতি পরতে চান না, তারা শিফন বা নাইলন এসব দিনে পরার জন্য বেছে নিতে পারেন। ভিজে গেলে এসব কাপড় সবচেয়ে তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়। শিফন টপ, স্কার্ট, শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ সবকিছুই পরতে পারেন। যেহেতু বর্ষার পরপরই গরমও থাকে, তাই সিøভলেস, অফ সোলডার পোশাক পরা যেতে পারে। তবে বর্ষার সময় বাইরে পরার জন্য মেক্সি ড্রেস না পারাই ভালো। বাইরের কাদাপানি লেগে পোশাক নষ্ট হয়ে যেতে পারে। যারা পোশাক নিয়ে ঝামেলা পোহাতে চান না, তাদের জন্য ডেনিমের পোশাক হবে আদর্শ। বৃষ্টির সময় ডেনিম অনেক বেশি সুবিধাজনক। গুটিয়ে যেমন নেওয়া যায়, কাদার দাগও বিশেষ বোঝা যায় না। ডেনিম টাফ ম্যাটেরিয়াল হওয়ার কারণে সহজে নষ্টও হয় না। আবার বর্ষার স্যাঁতসেঁতে বোরিং আবহাওয়ায় রং যোগ করে নানা ধরনের সিল্ক। ক্রেপ সিল্ক, আর্ট সিল্ক, সেমি-তসর সিল্ক বা কটন মিক্সড সিল্ক পরতে পারেন। এসব ব্লেন্ডেড ম্যাটেরিয়ালগুলো খুবই আরামদায়ক। শাড়ি, কুর্তি, টপ, সালোয়ার-কামিজ পাওয়া যায় এসব কাপড়ের ওপর। সিল্কের কাপড় বাতাসে তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়। ভিজলেও বোঝা যায় না খুব একটা। এ ছাড়া বর্ষার সব থেকে আরামদায়ক কাপড় হলো মলমল। সুতির থেকেও নরম ও হালকা হয় মলমল। কটন কাপড়ের সঙ্গে মলমল কাপড়ের কম্বিনেশনে তৈরি কামিজ, কুর্তা, টপ, কাফতান এমনকি জাম্প সুটও পরতে পারেন।
পোশাকের রং
বর্ষা মানেই সবুজ প্রকৃতি। আকাশ-জমিন সব মিলে কলাপাতা, নীল, আকাশি আর ধূসর রঙের প্রকৃতি। তাই এ সময় এসব রঙের পোশাক বেশি ভালো লাগে। তাই হয়তো মোটিফের চেয়ে ডিজাইনাররা বর্ষার পোশাকে রঙের দিকেই বেশি মনোযোগ দেন। এ সময় ফোটে নানা ফুল। সেসব উজ্জ্বল রঙের ফুল পোশাকে প্রাধান্য পায়। বিশেষ করে নীল, সবুজ, লাল, কমলা, হলুদের নানা শেডের পোশাক দেখা যায় ফ্যাশন হাউজের আয়োজনে।
বর্ষার সাজসজ্জা
বর্ষায় ভারী সাজগোজ একদমই চলবে না। আর প্রসাধনী হওয়া চাই ওয়াটারপ্রুফ। ফাউন্ডেশনের বেজ হিসেবে হালকা হলদে ধরনের কমপ্যাক্ট পাউডার বা ফাউন্ডেশন বেছে নিতে পারেন। এতে স্বাভাবিক ভাবটা থাকবে। পোশাকের সঙ্গে মেকআপে মিল রেখে হালকা বাদামি, কফি রং বা নীলচে আইশ্যাডো লাগিয়ে নিলে অনেক ভালো দেখাবে। চোখের সাজে ওয়াটারপ্রুফ মাসকারা ও পেন্সিল আইলাইনার ব্যবহার করুন। ঠোঁটের সাজে ম্যাট বা পাউডার, ময়েশ্চারসমৃদ্ধ গোলাপি, কোরাল, ব্রোঞ্জ বা বিভিন্ন রঙের হালকা লিপস্টিক বেছে নিতে পারেন। বাইরে বের হওয়ার সময় চুল পনিটেইল খোঁপা বা পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে আটকে রাখুন। বৃষ্টির পানিতে থাকা ক্লোরিন চুলের জন্য ক্ষতিকর।
সতর্কতা
ভেজা কাপড় পরে বেশিক্ষণ থাকবেন না। ভেজা পোশাক ধুয়ে ফেলুন। নয়তো সেই ভেজা কাপড়ে ছত্রাকের আবরণ পড়তে পারে। ঠা-া লাগার আশঙ্কাও থাকে। বর্ষায় কাপড় ভালোভাবে শুকায় না বলে দুর্গন্ধ হতে পারে। তাই রোদে শুকিয়ে নিন। রোদ পাওয়া না গেলে বাতাসে শুকাবেন ভালো করে।
বাইরে যাওয়ার সময় ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ, রেইন কোট, ছাতা সঙ্গে রাখুন। জুতোর বিষয়ে থাকতে হবে সবচেয়ে সচেতন। হাই হিল এড়িয়ে চলুন। পা ঢাকা জুতা পরলে বৃষ্টির সময় রাস্তার নোংরা পানি লেগে ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। পেছনে বেল্ট আছে এমন জুতা পায়ে দিন। আবার খুব ফ্ল্যাট বা হিল জুতা বর্ষার সময় এড়িয়ে চলুন।
