বিতর্কিত কর্মকান্ডে পাপুল এনাম ও দুর্জয়

আপডেট : ২২ জুন ২০২০, ০৫:৫৭ এএম

লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল মানব পাচারের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেপ্তার হয়ে দেশে-বিদেশে সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন। কাগজে-কলমে স্বতন্ত্র হলেও আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়ে নির্বাচিত হওয়ায় তার এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায় এখন ক্ষমতাসীন দলটির ওপরই বর্তাচ্ছে। এদিকে করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে রাজশাহী-৪ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হকের বিরুদ্ধ নারী কেলেঙ্কারির এবং মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য নাইমুর রহমান দুর্জয়ের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতাসীন দলের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এই তিন এমপির কীর্তিতে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তিন এমপিকে ঘিরে যে সমালোচনা চলছে তা নিয়ে বিব্রত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নাইমুর রহমান দুর্জয়ের মোবাইলে ফোন দেওয়া হলে ও প্রান্ত থেকে ‘হ্যালো হ্যালো’ বলতে বলতে লাইন কেটে যায়। দ্বিতীয় দফায় ফোন দেওয়া হলে ধরেন তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আব্বাস। তিনি বলেন, ‘এমপি সাহেব একটা মিটিংয়ে আছেন।’ আর ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হকের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠলে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে অভিযুক্ত এমপিদের ব্যাপারে দল নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেবে। জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো এমপি বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ঘটালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিশ্চয়ই দল নেবে।  আওয়ামী লীগ ক্ষমতার অপব্যবহার সহ্য করে না। আওয়ামী লীগের রাজনীতিই হলো জনগণের সেবা করা।

আওয়ামী লীগের জেলা-উপজেলা নেতারা বলছেন, পাপুল মানব পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে শুধু দেশেই নয় বিদেশেও সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন। স্বতন্ত্র এমপি হলেও বিশ্ব মিডিয়ায় ঝড় তোলা এই ঘটনায় আওয়ামী লীগকেই দায়ী করা হচ্ছে। কারণ নির্বাচনে কেন্দ্র থেকে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সদস্য ড. সেলিম মাহমুদ (বর্তমানে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক) স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে পাপুলের পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাপুল বিতর্কের পর লক্ষ্মীপুর জেলার নেতারা এর দায় কেন্দ্রকেই দিতে চাইছেন। তারা বলছেন, আইনপ্রণেতা হিসেবে পাপুলের অর্থ ও মানবপাচারের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কথা স্বীকার করেছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও।

এদিকে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, শুধু টাকার বিনিময়ে একজন অপরাধী, মাফিয়াকে সাংসদ বানিয়ে বাংলাদেশের সংসদের ভাবমূর্তি আজ কোথায়? তারা বলছেন, এই জঘন্য অপরাধীর স্ত্রী সেলিনা ইসলাম সংরক্ষিত কোটায় সংসদ সদস্য। গত ৭/৮ বছরে দেশ থেকে অসংখ্য নারী-পুরুষ বিভিন্ন দেশে পাচার করে একজন আইনপ্রণেতা হিসেবে গুরুতর অপরাধ করেছেন তিনি।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সারা দেশ। মানিকগঞ্জও এর বাইরে নয়। এলাকার মানুষজন যখন এই ভাইরাস নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় দিন অতিবাহিত করছেন তখনো সাংসদ দুর্জয়ের এলাকায় চলছে নানা অনিয়ম। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, লুটপাট, দখলবাজি, চাকরি দেওয়ার নামে টাকার লেনদেন ও চাঁদাবাজি থেমে নেই। তার সিন্ডিকেটের ঘনিষ্ঠ লোকজন এ অন্যায় কাজগুলো করে যাচ্ছেন। ক্ষমতার দাপটে এলাকার মানুষের মুখ খোলার কোনো উপায় নেই। এর বাইরে পাপিয়াকাণ্ডেও দুর্জয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছিল, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। স্থানীয়রা আরও জানান, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জেলার সর্বত্র চলছে তার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। এই সাংসদের নির্বাচনী এলাকার অসংখ্য যুবক চাকরির আশায় সর্বস্ব খুইয়েছেন। হেন কোনো অপরাধ নেই তার এলাকায় চলছে না।

রাজশাহীর এমপি এনামুল হকের বিরুদ্ধে সম্প্রতি নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, একজন সাংসদের চারিত্রিক পদস্খলন দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করেছে চরমভাবে। এই নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। ওই অভিযোগ সংক্রান্ত ‘অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি’, উভয়ের আপত্তিকর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই নারী সাংসদের বিরুদ্ধে মামলাও করেছেন। নারীঘটিত এই কেলেঙ্কারির কথা গণমাধ্যমে স্বীকারও করেছেন এনামুল। নৈতিক ও চারিত্রিক পদস্খলনের অভিযোগ ছাড়াও এই সাংসদের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, এলাকায় বিএনপি-জামায়াত ও জঙ্গি পুনর্বাসনের মতো ভয়াবহ অভিযোগ রয়েছে। তবে ক্ষমতার দাপটে প্রকাশ্যে কেউ তার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেন না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত