করোনাভাইরাসের কারণে ঘরোয়া ফুটবল মৌসুম বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে এক মাস আগে। প্রাণঘাতী এই ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের বর্তমান সংকট কাটিয়ে ঘরোয়া ফুটবল কবে মাঠে ফিরবে সে এক প্রশ্ন বটে। তবে স্থগিত থাকা বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপের যৌথ বাছাইয়ের সূচি এরই মধ্যে পেয়ে গেছেন ফুটবলাররা। সে অনুযায়ী অক্টোবরেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফেরা হবে জামাল ভূঁইয়া, তপু বর্মনদের। তবে এর আগেই ঘরোয়া ফুটবল মাঠে ফেরানোর জোর দাবি উঠছে অনেক ফুটবলারের পক্ষ থেকে।
ঘরোয়া ফুটবল, লিগ বন্ধ থাকা মানে ফুটবলারদের রুটি-রুজির পথ বন্ধ। ২০১৯-২০ ফুটবল মৌসুম অর্ধেক শেষ না হতেই স্থগিত হয়ে যাওয়ায় বিপাকে ফুটবলাররা। এ অবস্থায় নতুন মৌসুম শুরু হলে ফুটবলারদের আয়ের পথটা তৈরি হয়। এ ছাড়া বিশ্বকাপ বাছাইয়ে নিজেদের বাকি চার ম্যাচে ভালো ফল পেতে ঘরোয়া ফুটবল বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মত ফুটবলারদের। তাই মামুনুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম রানাদের দাবি দ্রুতই মাঠে ফুটবল গড়ানোর।
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মামুনুল ইসলাম অবশ্য এখানে ‘দাবি’ কথাটা ব্যবহার করতে নারাজ। তার মতে এটা ফুটবলারদের পক্ষ থেকে ‘অনুরোধ’।
দেশ রূপান্তরকে মামুনুল বলেন, ‘দেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী আমরা আসলে অনুরোধ করছি। দাবি এক জিনিস, আর অনুরোধ এক জিনিস। ফুটবল যেন মাঠে থাকে, লিগটা যেন শুরু হয়, আমরা যেন মাঠে থাকতে পারি…। দেশের ফুটবল এবং সামনে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের ম্যাচও আছে। লিগ শুরু হলে আমাদের সবার জন্যই ভালো।’
বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশ নিজের বাকি চার ম্যাচের তিনটিই খেলবে ঘরের মাঠে। যে ম্যাচগুলো থেকে পয়েন্ট আদায় করতে চায় এখন পর্যন্ত চার ম্যাচে ১ পয়েন্ট পাওয়া বাংলাদেশ।
মামুনুল এ ক্ষেত্রে ঘরোয়া ফুটবলের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা যদি অ্যাকটিভ থাকি, তবে হোমের তিনটা ম্যাচের অন্তত একটা বা দুইটাতে ভালো রেজাল্ট সম্ভব। যেমন আফগানিস্তান এবং ভারতের বিপক্ষে যদি আমরা জয় পাই, তবে গ্রুপ পর্যায়ে আমরা ভালো অবস্থানে থাকব। তাই আমাদের দাবি না, অনুরোধ থাকবে ফুটবল ফেডারেশনের লিগ কমিটির চেয়ারম্যানের প্রতি। সালাউদ্দিন ভাই (বাফুফে সভাপতি কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন) এবং সামাল ভাইয়ের (বাফুফের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও পেশাদার লিগ কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম মুর্শেদী) কাছে এটাই আমাদের অনুরোধ থাকবে।’
দেশে করোনা প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে মার্চেই সব ধরনের খেলা স্থগিত করা হয়। এখনো কোনো খেলাই মাঠে গড়ানো বা অনুশীলন শুরু হয়নি। খেলোয়াড়রা ব্যক্তিগতভাবে অনুশীলন করে যাচ্ছেন। বিশ্বকাপ বাছাই সামনে রেখে আগস্টে জাতীয় দলের ক্যাম্প করার পরিকল্পনা এরই মধ্যে জানিয়েছে বাফুফে। তবে ঘরোয়া ফুটবল মৌসুম বাতিল হয়ে যাওয়ায় এবং নতুন মৌসুম নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় ফুটবলাররা কিছুটা শঙ্কিতই। ভুগছেন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে।
গত সপ্তাহে জাতীয় দলের পাঁচ ফুটবলার বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করেন। সেখানেও তারা নতুন মৌসুমের সূচি যেন দ্রুত দেওয়া হয় সেই অনুরোধ রাখেন। এ ছাড়া নানা আলোচনার মধ্যে এসেছে স্থগিত হয়ে যাওয়া মৌসুমে ক্লাবের সঙ্গে দেশি ফুটবলারদের চুক্তির বিষয়ও।
যে পাঁচ ফুটবলার ১৬ জুন বাফুফে সভাপতির সঙ্গে দেখা করেন তারা হলেন, মামুনুল ইসলাম, সোহেল রানা, তপু বর্মণ, বিশ্বনাথ ঘোষ ও মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ পারভেজ। ফুটবলাররা আরো একবার অবশ্য সভাপতির সঙ্গে বসতে চান। বাফুফে সভাপতির কাছ থেকে সে আশ্বাসও পেয়েছেন তারা।
সেই অনুযায়ী দ্রুতই সব ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব যেন থাকে, সেটি নিশ্চিত করে আরো বেশি সংখ্যক ফুটবলার বসতে চান এবং সভাপতির কাছে নিজেদের চাওয়াগুলো পেশ করতে চান। মামুনুল বললেন, ‘ক্লাবের ওপর বা ফেডারেশন কারো যেন চাপ না হয় সেভাবেই যেন সুন্দর একটা সিদ্ধান্ত হয়। এখন আসলে করোনাভাইরাসের ক্রুশিয়াল মোমেন্ট চলছে। দেখি এই মাসটা কি হয়। আমাদের খেলোয়াড়রা সবাই ঢাকায় এলে একসঙ্গে যাব।’
ইনজুরি কাটিয়ে জাতীয় দলে ফেরার লড়াইয়ে থাকা শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রের তরুণ মিডফিল্ডার আব্দুল্লাহ বলেন, ‘মাঠে খেলা থাকলে আমাদের ফিটনেস ভালো থাকবে। সামনে জাতীয় দলের খেলাও আছে। এখন যদি লিগ শুরু না হয়, খেলোয়াড়রা বসে বসে থাকলে জাতীয় দলের ফল খারাপ হবে। সেই হিসেবে খেলাটা মাঠে থাকাই ভালো।’
জাতীয় দলের গোলরক্ষক আশরাফুল ইসলাম রানার কণ্ঠেও দ্রুত নতুন মৌসুমের দাবি। তবে করোনার বর্তমান সংকটের কথাও বলছেন তিনি। দ্রুতই এই সংকট কাটিয়ে ফুটবল যেন মাঠে ফেরে সেই প্রত্যাশা তার।
দেশ রূপান্তারকে রানা বলেন, ‘দেখুন, আমারা ফুটবলাররা কিন্তু চার মাস হলো ঘরে বসে আছি। আমাদের সিজন একটা বাতিল করে দেওয়া হলো। আমরা তো অবশ্যই চাইব মাঠে ফেরার জন্য। পরিস্থিতিও অবশ্য বুঝতে হবে। করোনা ভাইরাসের যে চিত্র বাংলাদেশে, এটা কিন্তু স্বাভাবিক না। দিন দিন এটা বাড়ছে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হয় সেটাও দেখার ব্যাপার। আমাদের অবশ্যই চাওয়া থাকবে আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরে যেন আমরা নতুন সিজনের ডিক্লারেশন পাই বা শুরু করতে পারি।’
খেলোয়াড়দের বর্তমান সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলছেন, ‘খেলোয়াড়রা সবাই আসলে এখন বেকার। সবাই অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে আছে।’
তবে খেলোয়াড়দের চাওয়া বা দাবি প্রসঙ্গে জাতীয় দলের সাবেক ও বর্তমান শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক বলছেন, ‘এই মুহূর্তে পরিস্থিতি আসলে পারমিট করে না। সরকার খেলাধুলায় অনুমতি দেবে বলেও মনে হয় না। যেভাবে করোনা সংক্রমণ বেড়ে চলেছে, যদি এটা কমতে থাকতো তাহলে হয়তো সরকারের পজিটিভ দৃষ্টি থাকতে পারতো।’
‘তাই আমরা যতই আবদার করি, যতই অসুবিধায় থাকি, এটা আসলে সামগ্রিক একটা ব্যাপার। তবে গ্রাফটা (করোনা সংক্রমণ) যদি নিচের দিকে যায়, তখন হয়তো সরকার ভাববে। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ফুটবল ফেডারেশন পজিটিভ চিন্তাভাবনাই করবে। সবাইকে তো আর ঘরবন্দী করে রাখবে না। খেলাধুলা এমন একটা জিনিস এখানে প্রতিনিয়ত প্র্যাকটিস দরকার, বসে থাকার সুযোগ নেই।’
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকা ফুটবলারদের জন্য ফেডারেশনের করণীয় দেখছেন মানিক। দেশের অভিজ্ঞ এই কোচ বলছেন, ‘বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন যেটা করতে পারে, খেলোয়াড়দের আশ্বস্ত করতে পারে ক্লাবগুলোর সঙ্গে বসে। খেলোয়াড়রা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত বেশি না হয়। কর্মকর্তা, খেলোয়াড় সবারই একটা ছাড় দেওয়ার ব্যাপার থাকবে। উভয়ে যদি ছাড় দেয়, তাহলে ফেডারেশন উদ্যোগ গ্রহণ করে এ ব্যাপার সমাধান করতে পারে বলে আমার মনে হয়। দৃষ্টিভঙ্গিটা সেদিকেই যাওয়া উচিত।’
তিনি যোগ করেন, ‘এই যে খেলোয়াড়রা দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগছে, এই জিনিসটা থেকে ফেডারেশন তাদের পরিত্রাণ দিতে পারে। সেটা তাদের কিছু কথা, কিছু আশ্বাসে হতে পারে। যা থেকে শান্তি-প্রশান্তি পেতে পারে খেলোয়াড়রা। কারণ খেলার সাথে আর্থিক বিষয়টা সম্পর্কিত। এটা অবশ্যই সমন্বয় হিসেবে আমি মনে করি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কাজ করা উচিত, ভবিষ্যতের জন্য।’
আরো পড়ুন:
