টাকা না তুললে নিবন্ধনকারীরা অগ্রাধিকার পাবেন

আপডেট : ২৪ জুন ২০২০, ০৫:৪২ এএম

সৌদি সরকারের সীমিত আকারে হজের সিদ্ধান্তে হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশে। বিশ্বব্যাপী মহামারী হিসেবে দেখা দেওয়া করোনাভাইরাসের ঝুঁকির মধ্যেও হজে যাওয়ার জন্য টাকা জমা দিয়েছিলেন ৬১ হাজার নিবন্ধনকারী। সরকার জমাকৃত টাকা তুলে নেওয়ার সুযোগ দিলেও তারা এ টাকা ব্যাংকে রেখেই আগামী বছর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হজে যেতে চাইছেন।

গত সোমবার সীমিত আকারে হজ করার সিদ্ধান্ত নেয় সৌদি সরকার। এই হজে শুধু সৌদি আরবে বসবাসরতরাই অংশ নিতে পারবেন। বিভিন্ন দেশের যেসব মুসলমান দেশটিতে বাস করছেন তারাও সীমিতভাবে হজে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। সৌদি সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মতো বাংলাদেশ থেকে গিয়ে কেউ হজ করতে পারবেন না।

ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (হজ) এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরী গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিবন্ধনকারীরা হজে যাওয়ার জন্য যে টাকা জমা দিয়েছেন তা ব্যাংকে রাখা আছে। সরকারের আদেশ ছাড়া কোনো হজ এজেন্সি এ টাকা তুলতে পারবে না। হজে যাওয়ার জন্য যারা টাকা জমা দিয়েছিলেন তারা ইচ্ছা করলে যেকোনো সময় এ টাকা তুলতে পারবেন। কীভাবে তারা এ টাকা তুলতে পারবেন তা নির্ধারণ করতে আমরা আগামীকাল (আজ) বুধবার একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা ডেকেছি। সেখানেই সব সিদ্ধান্ত হবে। তবে যারা জমাকৃত টাকা তুলবেন না তারা আগামী বছর অগ্রাধিকারভাবে হজ করার সুযোগ পাবেন।’

বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ১৯১ জনের হজে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত মার্চ মাসে টাকা জমা দেওয়ার সময় করোনাভাইরাস মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এর ঢেউ লাগে সৌদি আরবেও। দেশটিতে এ ভাইরাসে কয়েকশ মানুষ প্রাণ হারানোর কারণে কারফিউ জারি করা হয়। মসজিদে নামাজ পড়া সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। দেশটি মার্চ মাসে ওমরা ভিসা স্থগিত করে। সৌদি আরব অপেক্ষায় ছিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে হজ আয়োজনের। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় দেশটি সীমিত আকারে হজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ৩০ জুলাই হজ হওয়ার কথা। প্রতি বছর হজ করতে প্রায় ২৫ লাখ মুসলমান সৌদি আরবে সমবেত হন। 

বাংলাদেশ থেকে নিবন্ধনকারী বেসরকারি হজযাত্রীরা ১ লাখ ৮২ হাজার ৭৪২ করে টাকা জমা দিয়েছিলেন। এরমধ্যে প্রাক নিবন্ধনের সময় জমা দিয়েছিলেন ৩০ হাজার ৭৫২ টাকা। অবশিষ্ট টাকা দিয়েছিলেন নিবন্ধনের সময়। এ টাকা জমা নেওয়ার সময় হজযাত্রীদের তেমন কোনো সাড়া ছিল না। প্রয়াত ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আবদুল্লাহ জানিয়েছিলেন, এ টাকা কোনোভাবেই বেহাত হবে না। হজে যেতে না পারলে এ টাকা ফিরিয়ে দেওয়া হবে। টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব সরকার নেবে। বারবার এ ধরনের নিশ্চয়তার পর সশ্লিষ্টরা ব্যাংকে টাকা জমা দেন।

গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার মোক্তারপুরের একজন হজ নিবন্ধনকারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হজে যাওয়ার নিয়ত করেছি। এ বছর পারিনি, তো কী হয়েছে। আগামী বছর যাব। আমরা যে টাকা জমা দিয়েছি তা ওঠাব না। আমাদের যেন অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। আমি আমার পৈতৃক জমি বেচে হজের টাকা জমা দিয়েছি। হজে যেতে না পারাটা আমার জন্য অনেক কষ্টের। একটাই আশা একবার হজ করে যেন এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারি।’

সৌদি আরব সীমিত আকারে হজের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বড় ধরনের সংকটে পড়েছে বাংলাদেশের হজ এজেন্সিগুলো এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। সৌদি সরকারের এ সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে হজ এজেন্সিগুলো। হজ ভিসা থেকে শুরু করে মক্কা-মদিনায় বাড়িভাড়া, গাড়িভাড়া, হজযাত্রীদের খাওয়াসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাণিজ্যিক মুনাফা রয়েছে। হজ সীমিত করার সিদ্ধান্তে তারা এই আয় থেকে বঞ্চিত হবে। হজ এজেন্সিগুলোর সংগঠন হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) জানিয়েছে, দেশে ১ হাজার ২৩৮টি হজ এজেন্সি রয়েছে। এগুলোতে প্রায় ২০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছে। এছাড়া এ পেশার সঙ্গে পরোক্ষভাবে বাংলাদেশে ও সৌদি আরবে আরও প্রায় এক লাখ লোক সংশ্লিষ্ট। প্রতি হজ মৌসুমে দেশে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। এ বছর এই অঙ্ক শূন্যের কোটায় পড়ে আছে। এখন অনেক হজ এজেন্সি ও টিকিট বিক্রি করা ট্রাভেল এজেন্সিকে প্রতিষ্ঠানে তালা দিতে হবে। কারণ এজেন্সিগুলোকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, দেশে-বিদেশে অফিস ভাড়াসহ মাসে ৫০ কোটি টাকা খরচ করতে হয়। করোনাভাইরাসের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরকারের কাছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সুদমুক্ত প্রণোদনা চেয়ে গত ৯ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলন করে হাব।

হাব সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইন তসলিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সীমিত আকারে হজ করার সিদ্ধান্ত আমাদের কাছে বিভীষিকার মতো। এতে ছোট-বড় সব হজ এজেন্সিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অনেক এজেন্সির টিকে থাকাটাই কষ্টকর হয়ে যাবে। ওমরা বন্ধ হওয়ার পর থেকেই অনেক এজেন্সির কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাভিশ্বাস অবস্থা। এখন এই সংকট কীভাবে আমরা সামাল দেব বুঝতে পারছি না। আমরা সরকারের কাছে আর্থিক প্রণোদনা চেয়েছি। আশা করি সরকার আমাদের অস্তিত্বের সংকট বুঝতে পারবে।’

হজ সীমিতকরণের ঘোষণায় সবচেয়ে মারাত্মক আঘাতটি আসবে করোনাভাইরাসের কারণে আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধে ধুঁকতে থাকা রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে। গত তিন মাস ধরে কোনো রকমে চলতে থাকা বিমান ইতিমধ্যে সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে এক হাজার কোটি টাকা। যেখানে নতুন পরিচালনা পরিষদ গঠনের পর লাভের পথে ফিরেছিল বিমান। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর-পূর্ব নিট লাভ করেছে ৪২৩ কোটি টাকা। লাভের এ ধারা অব্যাহত থাকার কথা ছিল। কিন্তু বিমানের সব পরিকল্পনা ‘কাগুজে’ হয়ে গেছে বৈশ্বিক করোনাভাইরাসের জন্য। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সৌদিয়া এয়ারওয়েজ যৌথভাবে বাংলাদেশের সব হজযাত্রী বহন করে। এবারের হজযাত্রীর ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ৬৮ হাজার ৫৯৫ জনকে বহন করত বিমান। প্রতি টিকিট ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফলে শুধু হজযাত্রী বহন করে ৯৪৬ কোটি ৬১ লাখ ১০ হাজার টাকা আয় হতো বিমানের। হজ ফ্লাইট পরিচালনা না করার কারণে পুরো ৯৪৬ কোটি টাকার আয় হারাচ্ছে সংস্থাটি।

হজযাত্রীদের সৌদি পাঠাতে না পেরে ক্ষতির মুখে পড়তে হবে টিকিট বিক্রির ট্রাভেল এজেন্সিগুলোকেও। প্রতিটি এজেন্সির টিকেটপ্রতি ৭ শতাংশ হারে কমিশন পাওয়ার কথা। হজ সীমিত হওয়ার কারণে তারাও এই কমিশন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) সূত্রে জানা গেছে, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে কয়েক মাস ধরে দেশে ফ্লাইট চলাচলে নিষেধাজ্ঞার কারণে বন্ধ ছিল প্রায় সব ট্রাভেল এজেন্সি। ফলে গত তিন মাস ধরে কোনো আয় নেই তাদের। হজের মৌসুমের অপেক্ষায় ছিল তারা। দেশে ৬০০ থেকে ৬৫০টি এজেন্সি সক্রিয়ভাবে হজযাত্রী বহন করে। প্রতিটি এজেন্সি থেকে কমপক্ষে ১০০ থেকে ৩০০ হজযাত্রীর টিকিট কাটা হতো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত