করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ঢাকার এলাকাভিত্তিক লকডাউনে অধিক আক্রান্ত এলাকার ম্যাপিং ও বাস্তবায়নের কৌশলপত্র হস্তান্তর হয়েছে। এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুরোধ পেলেই লকডাউনের জন্য নির্বাচিত এলাকায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে আদেশ জারি করবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
তবে শুরুতেই ব্যাপক আকারে রাজধানীতে লকডাউন হচ্ছে না। রাজাবাজারের মতো ছোট কয়েকটি এলাকা ধরে যেকোনো সময় লকডাউনের ঘোষণা আসতে পারে। এ লক্ষ্যে আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের লকডাউন বাস্তবায়ন কমিটির সভা ডাকা হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়। গতকাল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সমন্বয় সেল গঠন করে আদেশ জারি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ঢাকায় লকডাউনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। ধারণা করা হচ্ছে, ওয়ারীর বিষয়ে আজ সিদ্ধান্ত আসতে পারে। ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা বলেছেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওয়ারী এলাকায় শনি বা রবিবার থেকে লকডাউন ঘোষণা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ম্যাপিং করে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছে পাঠানো হয়েছে। এদিকে জনস্বাস্থ্যবিদ ও ঢাকায় পর্যবেক্ষণকারী চীনের বিশেষজ্ঞ দল ঢাকায় ব্যাপক আকারে লকডাউনের সুপারিশ করেছে। আবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মনে করে ব্যাপক আকারে লকডাউন ছাড়া অধিক সংক্রমিত এলাকা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। গত সোমবার চীনা বিশেষজ্ঞ দলটি ঢাকা ত্যাগ করার আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ঢাকাকে দ্রুত লকডাউনের আওতায় আনার সুপারিশ করেছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, মাঝখানে রাজধানী লকডাউনের ক্ষেত্রে কর্র্তৃপক্ষ আরও বেশি শিথিল ছিল। চীনা বিশেষজ্ঞ দলের সুপারিশ এবং সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা চান না ঢাকায় লকডাউন হোক।
করোনাভাইরাস প্রতিরোধে গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি বিস্মিত কেন ঢাকায় এখনো পর্যন্ত লকডাউন ঘোষণা করা হয়নি। সবার আগে এখানে লকডাউন করা উচিত ছিল। ব্যবসায়ী বা কোনো পক্ষের কথা শুনে সরকারের উচিত হবে না রাজধানীকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া। গতকাল প্রধানমন্ত্রীর এটুআই প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ঢাকায় এলাকাভিত্তিক লকডাউনের জন্য এলাকাভিত্তিক আক্রান্তের হারসহ এ সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত এবং করণীয় সম্পর্কে যাবতীয় বিষয় ঠিক করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি লকডাউন কার্যকরে একটি কৌশলপত্র তৈরি করে তা ‘কভিড-১৯ প্রতিরোধে জাতীয় কমিটি’র কাছে পাঠানো হয়েছে।
এখন স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষ আক্রান্তের মাত্রা ও বাস্তবতার নিরিখে আনুষঙ্গিক বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে নির্দেশনা চেয়ে আবেদন পাঠাবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি), সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ জনপ্রতিনিধিরা আবেদন পর্যালোচনা করে সিভিল সার্জনকে সংশ্লিষ্ট এলাকায় লকডাউন ঘোষণার পরামর্শ দেবেন। জোনিং ঘোষণা একটি চলমান প্রক্রিয়া উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, এজন্য কোনো সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ বলা যাবে না।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, ঢাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ অফিসসহ অনেক শিল্পকারখানা রয়েছে। এজন্য আগে এলাকাভিত্তিক লকডাউনের জন্য ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে হবে। তবে ঢাকায় একসঙ্গে বড় এলাকা লকডাউন না করে ছোট ছোট করে একটি এলাকাকে ভাগ ভাগ করে লকডাউন করা হবে। বড় এলাকা আসলে লকডাউন করার প্রয়োজন নেই। একটি এলাকার সবাই তো আর আক্রান্ত হবে না। একটি এলাকার যেখানে বেশি আক্রান্ত সেই জায়গাটার সব ধরনের মুভমেন্ট (চলাচল) বন্ধ করতে হবে। তাতে এখনো যারা আক্রান্ত হয়নি তাদের রক্ষা করা যাবে। প্রশাসনিক বিষয় হওয়ায় রেড জোনের তালিকা ও ছুটি ঘোষণার আদেশ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দিচ্ছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রেড জোনের তালিকা দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রশাসনের কাছে ছুটি ঘোষণার অনুরোধ জানালেই প্রজ্ঞাপন জারি করবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
এদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে স্থানীয় সরকার বিভাগের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের জন্য সমন্বয় সেল গঠন করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জহিরুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে ১৫ সদস্যের এ সেল গঠন করা হয়।
যুগ্ম সচিব মুস্তাকিম বিল্লাহ ফারুকীকে ময়মনসিংহ বিভাগ (ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনসহ), যুগ্ম সচিব মলয় চৌধুরীকে খুলনা বিভাগ (খুলনা সিটি করপোরেশনসহ), যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ খায়রুল ইসলামকে বরিশাল বিভাগ (বরিশাল সিটি করপোরেশনসহ), যুগ্ম সচিব স্মৃতি কর্মকারকে ঢাকা বিভাগ (ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ছাড়া), যুগ্ম সচিব শায়লা ফারজানাকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মোখলেছুর রহমান সরকারকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও এলজিইডি, যুগ্ম সচিব মো. এরশাদুল হককে রংপুর বিভাগ (রংপুর সিটি করপোরেশনসহ), যুগ্ম সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরীকে চট্টগ্রাম বিভাগ (চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন ছাড়া), উপসচিব নুমেরী জামানকে সিলেট বিভাগ (সিলেট সিটি করপোরেশনসহ), উপসচিব জুলিয়া মঈনকে রাজশাহী বিভাগ (রাজশাহী সিটি করপোরেশনসহ), উপসচিব মোহাম্মদ তানভীর আজম ছিদ্দিকীকে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন, উপসচিব মোহাম্মদ ফারুক হোসেনকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও উপসচিব ইফতেখার আহমেদ চৌধুরীকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব (সিটি করপোরেশন-১ শাখা) কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
আদেশে বলা হয়, গঠিত কমিটি করোনা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন ও জাতীয় কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন দপ্তর বা সংস্থা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অর্পিত সব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের বিষয়টি তদারকি ও সমন্বয় করবে।
এছাড়া সিটি করপোরেশন এলাকায় ‘রেড জোন’ এলাকার জনপ্রতিনিধি, ইমাম, এনজিও প্রতিনিধি, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বসহ প্রয়োজনীয়সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবীকে সম্পৃক্ত করে সিটি করপোরেশনগুলো যেসব নাগরিকসেবা দেবে তা তদারকি ও মনিটরিং করবে এই সেল। লকডাউন চলাকালে সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য সংস্থাগুলোর কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের প্রণীত খসড়া এসপিও স্থানীয় সরকার বিভাগের গঠিত সেল চূড়ান্ত করবে।
করোনা মোকাবিলার বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের দপ্তর বা সংস্থার কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কাজের সমন্বয়ও করবে সেল। প্রসঙ্গত, চলমান করোনাভাইরাসে আক্রান্তের হার বিবেচনায় রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোন চিহ্নিত করে ঢাকার ৪৫টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাকে লকডাউনের সুপারিশ করেছিল টেকনিক্যাল কমিটি। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৮টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৭টি এলাকা রয়েছে।
জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে রেড জোনের সুপারিশ করা এলাকার মধ্যে আছে যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মুগদা, গেন্ডারিয়া, ধানমন্ডি, জিগাতলা, লালবাগ, আজিমপুর, বাসাবো, শান্তিনগর, পল্টন, কলাবাগান, রমনা, সূত্রাপুর, মালিবাগ, কোতোয়ালি, টিকাটুলী, মিটফোর্ড, শাহজাহানপুর, মতিঝিল, ওয়ারী, খিলগাঁও, পরীবাগ, কদমতলী, সিদ্ধেশ্বরী, লক্ষ্মীবাজার, এলিফ্যান্ট রোড ও সেগুনবাগিচা।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটির এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ বসুন্ধরা, বাড্ডা, ক্যান্টনমেন্ট, মহাখালী, তেজগাঁও, রামপুরা, আফতাবনগর, মগবাজার, এয়ারপোর্ট, বনশ্রী, রায়েরবাজার, রাজাবাজার, মোহাম্মদপুর, কল্যাণপুর, উত্তরা, গুলশান, মিরপুর। এগুলোকে রেড জোন হিসেবে ঘোষণার সুপারিশ করেছে টেকনিক্যাল কমিটি। গত ২১ জুন মধ্যরাতে ১০ জেলার ২৭টি এলাকা ও পরদিন ২২ জুন পাঁচ জেলার ১২ এলাকাকে রেড জোন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে সেখানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
