সারা দেশে সক্রিয় ৭ ডজন চক্র

আপডেট : ২৫ জুন ২০২০, ০৫:৫১ এএম

রুহুল আমিন। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। মালয়েশিয়া থেকে ফিরেছেন ছয় মাস আগে। এক মাস থেকে ফের মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে যেতে পারেননি। সম্প্রতি বিমানের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর পর তিনি আশকোনার একটি ক্লিনিকে করোনার পরীক্ষা করান। ফল আসে নেগেটিভ। সনদ পেতে ক্লিনিক কর্র্তৃপক্ষকে তিনি ১৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। চলতি মাসে একটি ফ্লাইটে করে কুয়ালালামপুর যান তিনি। কিন্তু সেখানে তার করোনার সনদ জাল প্রমাণিত হয়। ওই দেশে পরীক্ষায় তার করোনা পজিটিভ আসে। পরে তাকে ১৪ দিনের আইসোলেশনে রাখা হয়। রুহুলের এক স্বজন জানান, জাল সনদের কারণে তার সঙ্গে আরও পাঁচজন মালয়েশিয়ায় ধরা পড়েন। রুহুলের মতো অনেকে ওইসব প্রতারকের খপ্পরে পড়ছেন। তারা বিদেশ গিয়ে আটক হচ্ছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, করোনাভাইরাসের মহামারী পুঁজি করে একশ্রেণির প্রতারক ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে করোনার ভুয়া পরীক্ষা ও সনদের কারবার শুরু করেছে। আর প্রতিটি সনদ দিয়ে ১০-১৫ হাজার টাকাও হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারকরা। বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের প্যাডে দেওয়া হচ্ছে নেগেটিভ রিপোর্টের ভুয়া সনদ। হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মচারী ও ডাক্তারদের সম্পৃক্ততায় এসব অপকর্ম করছে জালিয়াতচক্র। এ চক্রের বেশি টার্গেট বিদেশফেরতরা। আবার অনেক শিক্ষিত লোকজনও তাদের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এমন প্রতারণা বাড়ায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো মাঠে নামে। ইতিমধ্যে সারা দেশে সাত ডজন প্রতারক গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে। একেকটি গ্রুপে সদস্যসংখ্যা সাত-আটজন করে। গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে কেউ কেউ নামিদামি হাসপাতালে যোগাযোগ করে রোগী ভাগিয়ে নিচ্ছে। ওইসব গ্রুপে কিছু নামিদামি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের চিকিৎসকদের নামও মিলেছে। প্রতারকচক্রের পুরো বায়োডাটা সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযানের প্রস্তুতি নিয়েছে পুলিশ ও র‌্যাব। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন প্রতারককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণ পদ রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনা মহামারীতেও প্রতারণা থেমে নেই কিছু চক্রের। করোনা পরীক্ষা নিয়েও তারা প্রতারণা করছে। ওইসব চক্রের সদস্যদের ধরতে অভিযান চালানো হচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাওয়া যাচ্ছে নানা তথ্য। নির্ধারিত হাসপাতাল বা ক্লিনিক ছাড়া অন্য কোথাও করোনার পরীক্ষা না করাতে ও সতর্ক থাকার অনুরোধ করেছেন তিনি।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, গত মাসে জাপানের নাগরিকদের নিয়ে বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার পর একটি ফ্লাইটে চারজনের করোনা রিপোর্ট পজিটিভ আসে। তবে তাদের কাছে নেগেটিভ সনদ ছিল। যেটি বাংলাদেশ থেকে নেওয়া। একইভাবে বিশেষ ফ্লাইটে দক্ষিণ কোরিয়ায় ফিরে যাওয়া তাদের ১২ নাগরিকের করোনা ধরা পড়েছিল। তারা সবাই বাংলাদেশ থেকে করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়ে গেছেন। গত ৩ জুন বিমানের একটি ফ্লাইট ঢাকা থেকে মালয়েশিয়া যায়। সেখানে যাওয়ার পরপরই ওই ফ্লাইটে যাওয়া পাঁচজনের করোনা ধরা পড়ে। তারা নেগেটিভ সনদ নিয়ে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশ থেকে যারা ওই ফ্লাইটে গিয়েছেন তাদের মধ্যে সেকেন্ড হোম হিসেবে মালয়েশিয়ার নাগরিকত্ব নেওয়া কয়েকজন রয়েছেন। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিমানযাত্রীদের করোনামুক্ত হেলথ সার্টিফিকেট নিতে হচ্ছে। প্রতারকদের জন্য দেশের বদনাম হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, সরকারি হাসপাতালগুলো করোনা পরীক্ষা করতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে লোকজনকে। আর এ সুযোগে প্রতারকচক্র ঢাকাসহ সারা দেশে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেকেরই বিদেশযাত্রা কিংবা কারও চাকরি বাঁচাতে বা অন্য কারণে করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট প্রয়োজন। আবার অফিসে যোগ দিতে চান না অথবা ভ্রমণে যাবেন কিংবা সরকারি ছুটি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার আশা করছেনÑ এমন ব্যক্তিরা চাচ্ছেন করোনা পজিটিভ রিপোর্ট। এ সুযোগ নিচ্ছে প্রতারকচক্র।

প্রতারণা ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীর মুগদা, ঢাকা মেডিকেল, মিটফোর্ড হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি হাসপাতালের বহিঃবিভাগের আশপাশে কাজ করছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তারা রোগীবেশে হাসপাতালগুলোতে গিয়ে দালালচক্র ও পেছনে থাকা হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করছেন। সম্প্রতি একটি চক্রের চার সদস্য ফজল হক, শরিফ হোসেন, জামশেদ ও লিয়াকত আলী র‌্যাবের জালে আটকা পড়ে। তাদের কাছ থেকে করোনা পরীক্ষার ভুয়া সনদ, দুটি কম্পিউটার, দুটি প্রিন্টার ও দুটি স্ক্যানার মেশিন উদ্ধার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

এ প্রসঙ্গে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম জানান, আটক হওয়া প্রতারকচক্রের সদস্যদের কাছ থেকে নানা তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতারকদের ধরতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

র‌্যাবের অন্য এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতারকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। ওই তালিকায় কিছু হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কতিপয় চিকিৎসকের নাম রয়েছে। কিছুদিন আগে চার প্রতারককে গ্রেপ্তার করার পর তারা জানিয়েছিল, সারা দেশেই তাদের লোকজন আছে। বিশেষ করে গ্রামের লোকজন ও বিদেশফেরতদের টার্গেট করা হয় বেশি। কিছু চিকিৎসক তাদের সহায়তা করছে। তারা মুগদা হাসপাতাল থেকে দেওয়া করোনা রোগীর রিপোর্টের কপি সংগ্রহ করে তা স্ক্যান করে সেখানে নাম বসিয়ে বিক্রি করে আসছিল। যাদের নেগেটিভ সনদ দরকার তাদের নেগেটিভ বা যাদের পজিটিভ সনদ দরকার তাদের তাই দিচ্ছিল টাকার বিনিময়ে। জালিয়াতচক্রটি দেড় শতাধিক মানুষের কাছ থেকে ১০-১৫ হাজার করে টাকা নিয়ে ভুয়া সনদ দিয়েছে। আরও শতাধিক লোককে ভুয়া সনদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৫ লাখের বেশির টাকা হাতিয়েছে চক্রটি।

পাবনার পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, করোনার পরীক্ষা নিয়ে যাতে কেউ প্রতারণা করতে না পারে সেজন্য জেলার হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একই কথা বলেছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার নুরুল ইসলাম ও কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার হারুন-উর-রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতারকরা বাসায় গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার ফল জানিয়ে দেয়। বাসায় গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করার পর তা আর পরীক্ষা করা হয় না। তাদের নেই কোনো ল্যাব। কম্পিউটারে ফল লিখে ই-মেইলে তা রোগীর কাছে পাঠিয়ে দেয়। একটি চক্র এভাবেই ৩৭ জনের কভিড-১৯ পরীক্ষার প্রতিবেদন জানিয়েছে। নমুনা সংগ্রহের সময় উপসর্গ দেখে একটা ধারণা থেকে ফল তৈরি করে তারা। তিনি বলেন, একই অভিযোগে আশকোনা থেকে বুকিং বিডি ও হেলথ কেয়ার নামে দুই প্রতিষ্ঠানের মালিক হুমায়ন কবীর, তানজিনা পাটোয়ারী, আরিফুল চৌধুরীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের তথ্যর ভিত্তিতে গুলশান-২-এর কনফিডেন্স টাওয়ারের ১১, ১৪ ও ১৫ তলায় অভিযান চালানো হয়। তিনি আরও বলেন, এ চক্রটি আগে জোবেদা খাতুন সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নামের প্রতিষ্ঠানে বুথের মাধ্যমে করোনার নমুনা সংগ্রহের চাকরি করত। এ প্রতিষ্ঠানটি আইইডিসিআর কর্র্তৃক করোনা পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত। গত ১২ এপ্রিল তারা এ প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরি ছেড়ে দেয়। পরে তারা অনলাইনে ওই প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা ব্যবহার করে বুকিং বিডি ও হেলথ কেয়ার নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে নিজস্ব ল্যাবে করোনা পরীক্ষা করে সনদ দেয়। তাদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে কয়েকজন ভুক্তভোগী পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। গতকাল তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত