নারীশিক্ষার বিস্তার ঘটিয়ে সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন। আজ থেকে একশ দশ বছর আগে এ লক্ষ্যেই ভাগলপুরে সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। বাংলায় নারী জাগরণ ও নারী অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত রোকেয়ার সে সংগ্রাম যে বৃথা যায়নি সে কথা আমাদের সবারই জানা। শত বছরের ব্যবধানে শত বাধাবিপত্তি পেরিয়ে আজ রোকেয়ার মাতৃভূমি বাংলাদেশে নারীশিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। পরিসংখ্যান বলছে বাংলাদেশে এখন সার্বিকভাবে শিক্ষায় পুরুষের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণ বেশি। প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫০ দশমিক ৫৪ শতাংশই এখন নারী। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের মতোই উচ্চমাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষায়ও ছাত্রীর অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। দেশে শিক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নারীর অগ্রগতির অনেক পরিসংখ্যান রয়েছে। কিন্তু শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে অগ্রগতি সত্ত্বেও সমাজে যে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়নি; নারীর ক্ষমতায়ন ঘটেনি সেটা খোলা চোখেই দেখা যায়। বিশেষত, ঘরে-বাইরে নারীর ওপর নিত্যদিনের নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার পরিসংখ্যানে আঁতকে উঠতে হয়। সংগত কারণেই প্রশ্ন জাগে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে নারীর অগ্রগতির সত্ত্বেও দেশে নারী নির্যাতন নিয়তই বাড়ছে কেন? সমস্যাটা কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা যেতে পারে রোকেয়ার শতবর্ষ পর জন্ম নেওয়া এই প্রজন্মের একজন সুমাইয়ার জীবন সংগ্রামে। সুমাইয়া বেগম নামে ২৫ বছর বয়সী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মেধাবী ছাত্রীকে গত সোমবার নাটোরে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা পিটিয়ে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত বছর সুমাইয়ার বিয়ে হয় নাটোর শহরের হরিশপুর বাগানবাড়ি এলাকার প্রকৌশলী মোস্তাক হোসেনের সঙ্গে। সুমাইয়ার মা জানান, বিয়ের পর থেকেই শ্বশুরবাড়ির লোকজন সুমাইয়ার পড়ালেখা করা এবং পড়ালেখা শেষে চাকরি করার ইচ্ছা মেনে নিতে পারছিল না। এ কারণেই সুমাইয়াকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে প্রচার করে তারা। ছয় মাস আগেও তাকে ঘরে আটকে রেখে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। সোমবার সুমাইয়ার শ্বশুরের কাছ থেকে টেলিফোনে মেয়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে নাটোরে যান তার মা। কিন্তু নাটোর সদর হাসপাতালে গিয়ে আর মেয়েকে জীবিত পাননি তিনি। নাটোরের পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, সুমাইয়ার মায়ের করা হত্যা মামলায় তার ননদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তার স্বামী ও শ্বশুরসহ বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
নামের অন্তমিল থাকলেও রোকেয়া আর সুমাইয়ার জীবন সংগ্রামে তফাৎ অনেক। রোকেয়ার বাবা রক্ষণশীল মুসলিম হিসেবে সেকালে মেয়ের লেখাপড়ার বিষয়ে উৎসাহী ছিলেন না। কিন্তু বাড়িতে দুই ভাই এবং বিয়ের পর স্বামীর কাছ থেকে লেখাপড়ায় উৎসাহ ও দারুণ সহযোগিতা পেয়েছিলেন রোকেয়া। একালের সুমাইয়ার বাবা সিদ্দিকুর রহমান যশোরী ছিলেন একজন ইসলামি বক্তা। বাবার অনুপ্রেরণাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন সুমাইয়া। ভর্তির তিন বছরের মাথায় বাবার পছন্দেই ২০১৯ সালে মোস্তাককে বিয়ে করেন। পড়ালেখার খরচ বাবা সিদ্দিকুরই দিতেন। তাই বিয়ের পর পড়ালেখা বন্ধ করতে হয়নি সুমাইয়াকে। প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে ঢাকায় থেকেই বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সুমাইয়া। কিন্তু গত সেপ্টেম্বরে বাবা সিদ্দিকুর মারা গেলে আর্থিক সংকটে পড়েন সুমাইয়া। শ্বশুরবাড়ি থেকে চাকরির জন্য পড়াশোনা না করে সংসারী হওয়ার নির্দেশ আসে। নির্দেশ পালনে বাধ্য করতে চলে অমানবিক নির্যাতন। আর এভাবেই জীবন প্রদীপ নিভে যায় সুমাইয়ার।
সুমাইয়ার এই নির্মম মৃত্যু দেখিয়ে দিচ্ছে, একালেও সমাজের একটা বড় অংশ লেখাপড়া করে নারীর শিক্ষিত হওয়া মেনে নিলেও বিয়ের পর চাকরি করে স্বাবলম্বী হওয়া মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। দেশে নারীর কর্মসংস্থান বিষয়ে গবেষণা ও পরিসংখ্যানেও এই বাস্তবতার প্রতিফলনই দেখা যায়। বাংলাদেশে নারীর কর্মসংস্থান বিষয়ে ২০১৯ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানে নারীর অংশগ্রহণ ২৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে, পুরুষের তুলনায় কর্মসংস্থানে নারীর অবস্থান এখনো অর্ধেক। এই অর্জনের পরেও নারীরা বৈষম্যের শিকার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত। স্বাধীনভাবে কর্মসংস্থানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাংলাদেশের নারীরা এখনো পিছিয়ে রয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয় বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করা সুমাইয়ার মতো মেধাবী তরুণীকেও যখন স্বাধীনভাবে চাকরি করার সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া হয় না তখন সমাজের বড় অংশের বাস্তবতা সহজেই অনুমেয়। তাই শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে নারীর অগ্রগতির পরিসংখ্যান যতই বাড়–ক নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি না পাল্টালে যে রোকেয়ার সংগ্রাম পূর্ণতা পাবে না সুমাইয়ার মৃত্যুই তার বড় দৃষ্টান্ত।
