১৯৭৮ সালের এই দিনে অর্থাৎ ২৫ জুন প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনা। ঘরের মাঠে সেই ফাইনাল শুরু হয় বিতর্ক দিয়ে। স্বাগতিকরা মাঠে এসেছিল নির্ধারিত সময়ের ৫ মিনিট পর। এসেই নেদারল্যান্ডসের রেনে ফন ডি কেরখফের হাতের ব্যান্ডেজ নিয়ে রেফারির কাছে প্রতিবাদ জানায়। আগের কয়েকটি ম্যাচে ব্যান্ডেজ নিয়েই খেলেছিলেন কেরখফ। প্রশ্ন ওঠেনি। ফাইনালে ইতালির রেফারি সের্গিও গোনেলা বাধ্য করেন তাকে বাইরে যেতে। নিরুপায় ডাচ উইঙ্গার ব্যান্ডেজের ওপর আরও একটি ব্যান্ডেজ জড়িয়ে আবার মাঠে ফেরেন। এই ঘটনা নিয়ে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ড্যানিয়েল প্যাসারেলা বলেছিলেন, ‘এক ইঞ্চি জমিও ছাড়ার প্রশ্নই ছিল না। আমার মনে হয়েছিল, ব্যান্ডেজ থেকে আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। অধিনায়ক হিসেবে আমাকে প্রতিবাদ জানাতেই হতো। জানিয়েও ছিলাম।’
কোনো এক দলের জন্য রেফারির অন্ধ পক্ষপাতিত্বের সেরা উদাহরণ আটাত্তরের বিশ্বকাপ ফাইনাল। প্রায় পঞ্চাশটা ফাউল হয়েছিল। সবই নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে। অবশ্য বিশ্বকাপের শুরু থেকেই রেফারিরা আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন করার মিশন নিয়ে নেমেছিল। বুয়েন্স আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচে স্বাগতিকরা ২-১ গোলে হাঙ্গেরিকে হারায়। রেফারির পক্ষপাতিত্ব দেখে হাঙ্গেরির কোচ লাইওস বারোতি বলেছিলেন, ‘সবই তখন আর্জেন্টিনার দিকে, এমনকি বাতাসও! আর বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সাফল্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা। ৭০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে বিশ্বকাপের আয়োজন করেছিল মিলিটারি জান্তা, নিজেদের অপকর্ম ঢেকে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি তুলে ধরার একমাত্র উদ্দেশ্য নিয়ে।’
তাদের উদ্দেশ্য সফলও হয়েছিল। আর্জেন্টিনার প্রখ্যাত নাট্যকার রিকার্দো হালাক লিখেছিলেন, ‘মিলিটারি জান্তা বিশ্বকাপের মঞ্চকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। একই সঙ্গে বিশ্বকাপটাও পেতে চেয়েছিল। হয়তো অনেক আর্জেন্টাইন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর শাসকের মতো উদযাপন করেনি, তবে কম-বেশি সবাই আমরা জিততে চেয়েছিলাম। নেচে-গেয়ে উৎসব না করে বিশ্বকাপ বয়কট করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। জানতাম, সামরিক শাসন এক দিন শেষ হবে। বিশ্বকাপ রয়ে যাবে। এটা ভেবেই আমরা নেচে-গেয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা উদযাপন করেছিলাম।’
ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে প্রথমার্ধের ৩৮ মিনিটে গোল করে এগিয়ে দেন মারিও কেম্পেস। দ্বিতীয়ার্ধে নেদারল্যান্ডস ভালো খেলছিল। নানিঙ্গা ৮২ মিনিটে সমতা ফেরান। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে কেম্পেস আর বের্তোনির গোলে ৩-১-এ বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। সামরিক শাসক জর্জ রাফায়েল ভিদেলার হাত থেকে শিরোপা নেন প্যাসারেলা। এই বিশ্বকাপেই মিশেল প্লাতিনি আর কার্ল হেইঞ্জ রুমেনিগের আবির্ভাব। ব্রাজিলের জার্সিতে প্রথমবার দেখা গিয়েছিল জিকোকেও। ১৭ বছরের কিশোর প্রতিভা ডিয়েগো ম্যারাডোনার আবির্ভাবও হতে পারত সেই টুর্নামেন্টেই। প্রবল চাপ সত্ত্বেও তাকে দলে নেননি কোচ লুইস সিজার মেনোত্তি। আত্মজীবনীতে ম্যারাডোনা পরে লিখেছেন, ‘যখন জানতে পারি চূড়ান্ত দলে নেওয়া হয়নি, খুব কেঁদেছিলাম। মেনোত্তিকে কখনো ক্ষমা করতে পারব না, করবও না। ওকে ঘৃণা করি না। ক্ষমা করতে না-পারা আর ঘৃণা করা এক নয়। কীভাবে আমাকে গাইড করেছিলেন এল ফ্লাকো (মেনোত্তি) পরের বছরগুলোয়, সেসব কথা কী করে ভুলি?’
’৭৮ বিশ্বকাপে সব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও খেলেননি ইয়োহান ক্রুইফ। এর পেছনেও হাত ছিল আর্জেন্টিনার মিলিটারি জান্তার। ডাচ কিংবদন্তিকে অপহরণের ভয় দেখানো হয়েছিল। ঘটনা আগের বছরের। ‘বার্সেলোনায় ফ্ল্যাটে আমাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল, আমার স্ত্রীকেও, আমাদের বাচ্চাদের সামনেই। মাথায় তাক করে রাখা ছিল রাইফেল। কোনোমতে পালিয়েছিলাম। ঘটনাগুলো জীবন সম্পর্কে আমার ধারণা বদলে দেয়। ফুটবল খেলার ইচ্ছেই মরে গিয়েছিল। আর বিশ্বকাপেও খেলতে যায়নি’ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন টোটাল ফুটবলের রূপকার। ডাচরা এখনো মনে করেন ক্রুইফ খেললে ’৭৮ বিশ্বকাপ তারাই জিতত। হাভানা চুরুট মুখে নিয়ে মেনোত্তি বলতে পারতেন না ‘ওইসব টোটাল ফুটবল বিটলসের মতো, ফ্যাশন, আসবে আর যাবে, কখনো স্থায়ী হবে না। আসল ফুটবল হলো তীব্র গতিতে আক্রমণ, আর বলের দখল নেওয়ার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা।’
বলা বাহুল্য, মেনোত্তির আর্জেন্টিনা কিন্তু গতিময় আক্রমণ আর বল দখলের সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সফল হয়ে বিশ্বকাপ জেতেনি। জিতেছিল একনায়ক ভিদেলার অদৃশ্য হাতের কারসাজিতে। গৃহযুদ্ধবিধ্বস্ত আর্জেন্টিনায় ১৯৭৬ সালে ক্ষমতায় বসেন ভিদেলা। প্রায় ১৬ হাজারেরও বেশি লোক ‘ব্যাখ্যাতীতভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়’। ইতিহাসবিদরা এই ঘটনাকে ‘নাৎসিদের থেকেও খারাপ কাজ’ বলেছিলেন। এই নৃশংসতা থেকে আর্জেন্টিনার মানুষের দৃষ্টি সরাতে যেকোনো প্রকারে বিশ্বকাপ সফল করতে চেয়েছিলেন ভিদেলা। অনৈতিকভাবে জিততেও চেয়েছিলেন। তাই মেনোত্তি-প্যাসারেলা জুটির সাফল্যকে মহান করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
