করোনাভাইরাসের প্রভাবে চরম বেকায়দায় পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। লম্বা সময় ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা থাকায় নিজের সঞ্চয় ও পুঁজি ভেঙে চলতে হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী এখন দেউলিয়ার পথে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনার প্রভাব মোকাবিলায় এসব উদ্যোক্তার জন্য ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণও তারা কেউ পাননি। করোনার বিস্তার ঠেকাতে এক মাসের বেশি সময় সাধারণ ছুটির পর সীমিত আকারে ব্যবসা-বাণিজ্য খুললেও লাভ হয়নি। ক্রেতা নেই, লেনদেনও কম। কিন্তু অফিস-কারখানা ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, পারিবারিক খরচ সবই আগের মতো দিতে হচ্ছে। ফলে আয় না থাকায় বাধ্য হয়েই সঞ্চয় বা পুঁজিতে হাত দিতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেপারকাপ শিল্পের অন্যতম উদ্যোক্তা ও কেপিসি ইন্ডাস্ট্র্রিজের চেয়ারম্যান কাজী সাজেদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সীমিত আকারে সবকিছু খুললেও আমরা মূলত ব্যবসায় ফিরতে পারিনি। কিন্তু বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বা পানির বিল, অফিস-কারখানার ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, পারিবারিক খরচসহ যেসব ফিক্সট কস্ট আছে, সবই দিতে হচ্ছে। কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাবের পর আয় হচ্ছে না, হলেও একেবারে সীমিত। ফলে বাধ্য হয়েই সঞ্চয় ভেঙে চলতে হচ্ছে । তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বেশির ভাগেরই সঞ্চয় তেমন থাকে না। পুঁজির পরিমাণও থাকে সামান্য। ফলে ওই পুঁজি ভেঙেই চলতে হচ্ছে। ব্যাপক সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। দুর্বিষহ অবস্থায় রয়েছি আমরা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজের একটি পয়সাও কোনো এসএমই উদ্যোক্তা পেয়েছেন বলে শুনিনি। বড় উদ্যোক্তারা পেতে পারেন। আমরা পাইনি, কবে পাব তা-ও জানি না।
ওয়ার্ল্ড এসএমই ফোরামের তথ্য অনুসারে, দেশে ৭০ লাখ ৮১ হাজার শিল্পের মধ্যে ৬০ লাখ ৮০ হাজার কুটিরশিল্প, ক্ষুদ্রশিল্প ১ লাখ ১০ হাজার, ছোট শিল্প ৮ লাখ ৫০ হাজার, মাঝারি শিল্প ৭১ হাজার ও ৫২ হাজার বৃহৎ শিল্প রয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পঞ্চম স্থানে থাকা বাংলাদেশ এসএমই শিল্পসংখ্যায় বিশে^ সপ্তম স্থানে রয়েছে। দেশে এসএমই খাতে কর্মসংস্থানের পরিমাণ ৭৩ লাখ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক উদ্যোক্তা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কারিগর বা শ্রমিকদের বেতন কমবেশি দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু পুঁজিতে টান ধরলে সেটি কত দিন চালিয়ে যেতে পারবেন তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। ফলে এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ৭৩ লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এখন প্রণোদনা প্যাজেকের টাকা দ্রুত পেলে হয়তো কোনোভাবে নিজেদের ব্যবসা চালিয়ে নিতে বা টিকে থাকতে পারবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বিভিন্ন সেক্টরে থাকা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নতুন উদ্যোক্তারা। ব্যাংক মালিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে তাদের সহায়তা করা হবে বলে আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এখনো আমরা দৃশ্যমান ফলপ্রসূ কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করছি না। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়গুলো এখনো কোনো হেল্প ডেস্ক চালু করেনি এবং শাখাগুলোকেও কোনো পরিষ্কার নির্দেশনা দেয়নি।
তিনি বলেন, এই অসহযোগিতার বিষয়টি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা দেওয়ার পরও আশানুরূপ কাজ হচ্ছে না। আমার মনে হয় ব্যাংকগুলো এ বিষয়টি নিয়ে এগিয়ে আসবে এবং খুব তাড়াতাড়ি এর সমাধান হবে।
বর্তমানে কোনো ধরনের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য খরচ করতেই হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এর মধ্যে পাইকারি, খুচরা, হোটেল রেস্টুরেন্ট ও পরিবহন খাত কোনোটার অবস্থাই ভালো নয়। সবাই বেকায়দায় রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি ও বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি এসএমই খাতের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা একটি ফান্ড চাই, যা থেকে শুধু শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হবে। কারণ এসএমই বাঁচলে দেশের অর্থনীতি বাঁচবে। জিডিপিতে ক্ষুদ্র, পাইকারি, খুচরা, হোটেল রেস্টুরেন্ট ও পরিবহন খাত মিলে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ২৫ শতাংশের মতো।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, ১৫ জনের কম কর্মচারী থাকা পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৩ লাখ ৭২ হাজার, যা দেশের মোট প্রতিষ্ঠানের ৩৯ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠানে ৯৭ লাখ কর্মী কাজ করেন থাকেন।
এর আগে শিল্প সচিব আবদুল হালিম বলেন, বর্তমানে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ২৫ শতাংশ। ২০৪১ সালের মধ্যে তা ২৮ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ওই সময় জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান হবে ৪০ শতাংশ।
