সবার কমেছে বেড়েছে বাংলাদেশের

আপডেট : ২৭ জুন ২০২০, ০৬:২১ এএম

অপ্রদর্শিত বা কালোটাকা রাখার জন্য নিরাপদ দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে থাকা সুইজারল্যান্ডে ২০১৯ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের আমানত বাড়লেও দক্ষিণ এশীয়দের সঞ্চয়ের পরিমাণ কমছে। তবে গত চার বছরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর কমলেও বাংলাদেশিদের সঞ্চয় এ সময়ে বেড়েছে। গত বৃহস্পতিবার সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এমন তথ্য মিলেছে।

২৫ জুন প্রকাশিত সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও প্রবাসী নাগরিকদের সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে ২০১৯ সালে মোট আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬০ কোটি ৩০ লাখ ফ্র্যাংক, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা (প্রতি ফ্র্যাংক ৮৯ টাকা হিসাবে)। আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে যা ছিল ৬১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্র্যাংক। এ হিসাবে আগের বছরের তুলনায় ২০১৯ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের সঞ্চয় কমেছে ১৩০ কোটি টাকা। তবে ২০১৫ সালের পর থেকে ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর আমানত কমলেও বাংলাদেশের বেড়েছে। এ সময়ে বাংলাদেশিদের সুইস ব্যাংকে আমানত বেড়েছে সাড়ে ৯ শতাংশ।

তবে কোনো বাংলাদেশি যদি তার নাগরিকত্ব গোপন রেখে টাকা জমা করে থাকেন, তার তথ্য এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ ছাড়া স্বর্ণালংকার, শিল্পকর্ম ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র সুইস ব্যাংকে জমা রাখা হলে সেগুলোর আর্থিক মূল্য হিসাব করে আমানতে যোগ করা হয় না।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৫ সালের পর থেকে সুইস ব্যাংকগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নাগরিকদের আমানত কমতে শুরু করে। তবে ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশিদের আমানত সেই হারে কমেনি। ২০১৮ সালে কমলেও গত চার বছরের হিসাবে বেড়েছে। বর্তমানে সুইস ব্যাংকে আমানত রাখায় ভারতীয়দের পরই বাংলাদেশিদের অবস্থান।

২০১৫ সালে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে ভারতীয়দের সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল ১২০ কোটি ৬৭ লাখ ফ্র্যাংক, যা ২০১৯ সালে ৮৯ কোটি ২০ লাখ ফ্র্যাংকে নেমে এসেছে। এ সময়ে ভারতীয়দের সঞ্চয় কমেছে ২৬ শতাংশ। তবে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সুইস ব্যাংকে রাখা আমানত সবচেয়ে বেশি কমেছে পাকিস্তানিদের। সুইস ব্যাংকগুলো থেকে চার বছরে ৭৫ শতাংশের বেশি আমানত তুলে নিয়েছে পাকিস্তানিরা। সুইস ব্যাংকে ২০১৫ সালে পাকিস্তানিদের সঞ্চয় ছিল ১৪৭ কোটি ৭১ লাখ ফ্র্যাংক, যা ২০১৯ সালে ৩৫ কোটি ৯৬ হাজার ফ্র্যাংকে নেমে এসেছে। এ সময়ে বাংলাদেশিদের আমানত ৫৫ কোটি ৮ লাখ থেকে ৬০ কোটি ৩০ লাখ ফ্র্যাংকে উন্নীত হয়েছে।

বিভিন্ন সুইস ব্যাংকে ২০১৫ সালে শ্রীলঙ্কানদের ছিল ৭ কোটি ৭৬ লাখ ফ্র্যাংক, যা ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কানদের ৩৬ কোটি ৬৩ লাখ ফ্র্যাংকে উন্নীত হয়। তবে ২০১৯ সালে ৪ কোটি ফ্র্যাংকে নেমে এসেছে। ২০১৯ সালে মিয়ানমারের নাগরিকেদের সুইস ব্যাংকে জমা হয় ৪৭ লাখ ৬০ হাজার ফ্র্যাংক। আর এ অঞ্চলে সবচেয়ে কম সঞ্চয় রয়েছে ভুটানের নাগরিকদের। ২০১৯ সালে ভুটানিদের ছিল ১৩ লাখ ফ্র্যাংক।

২০১৫ সালে সুইস ব্যাংকে নেপালিদের জমা ছিল ৩১ কোটি ৪৪ লাখ ফ্র্যাংক, যা ২০১৯ সালে ১৭ কোটি ১৮ লাখ ফ্র্যাংকে নেমে এসেছে। ২০১৯ সালে মালদ্বীপের নাগরিকদের সঞ্চয় নেমে এসেছে ৪০ লাখ ২৩ হাজার ফ্র্যাংকে, যা এর আগের বছরও ছিল ১৫ কোটি ৩১ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৯ সালে আফগানদের সঞ্চয় ৪ কোটি ৫২ লাখ ফ্র্যাংক।

প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৯ সালে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের আমানত বাড়লেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আমানত কমেছে। আলোচ্য বছরে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি ফ্র্যাংক। আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি ফ্র্যাংক। এ হিসাবে এক বছরে আমানত বেড়েছে ৩ হাজার কোটি ফ্র্যাংক। ২০১৭ সালে ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি ফ্র্যাংক।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশ থেকে প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়, তার খুব কম পরিমাণই সুইস ব্যাংকে জমা হয়। চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, ২০০৬-২০১৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের প্রায় সমান।

একক বছর হিসেবে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ১৫১ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। দেশীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪টি প্রক্রিয়ায় এই অর্থ পাচার হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশি পণ্যের আমদানিমূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রফপ্তানিমূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডি ও অন্য মাধ্যমে বিদেশে লেনদেন এবং ভিওআইপি ব্যবসা। এ ছাড়া টাকা পাচারে বিশ্বের শীর্ষ ৩০ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের নাম।

সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশই কোনো না-কোনোভাবেই পাচার হচ্ছে। টাকা পাচারের তথ্য এসেছে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি ইউএনডিপির প্রতিবেদন এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইসিআইজে প্রকাশিত পানামা ও প্যারাডাইস পেপারসে।

সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডার মতো দেশেও বাংলাদেশিরা অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ নানা পদ্ধতিতে পাচার করছেন। পাচারকৃত টাকায় কানাডায় ‘বেগম পল্লী’ গড়ে তোলা হয়েছে। বিদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ান সরকারের সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী। এ ছাড়া ব্রিটেন, হংকং, সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকেও বাংলাদেশিদের টাকা রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিদেশে অর্থ নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের ২০১৭ সালে ছিল ৪৮ কোটি ১৩ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৬ সালে ৬৬ কোটি ১৯ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৫ সালে ৫৫ কোটি ৮ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৪ সালে যা ছিল ৫০ কোটি ৬০ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৩ সালে ৩৭ কোটি ২০ লাখ ফ্র্যাংক, স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। ২০১২ সালে ছিল ২২ কোটি ৯০ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১১ সালে ছিল ১৫ কোটি ২০ লাখ ফ্র্যাংক। আর ২০০০ সালে ছিল ৫ কোটি ১৮ লাখ ফ্রাংক।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের টাকা পাচারের অন্যতম কেম্যান আইল্যান্ডের সুইস ব্যাংকে ২০১৯ সালে জমা রয়েছে ৩ হাজার ৫৪৯ কোটি ফ্র্যাংক। মার্শাল আইল্যান্ডের আমানত রয়েছে ৩৪২ কোটি ৮৫ লাখ ফ্র্যাংক।

সুইস ব্যাংকে আমানত রাখার দিক থেকে এ বছর প্রথম অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য। ২০১৯ সালে দেশটির আমানতের পরিমাণ ৩৭ হাজার ৬৬০ কোটি ফ্র্যাংক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৫ হাজার ৯০৮ কোটি, সিঙ্গাপুর ৩ হাজার ৭৩০ কোটি, চীন ১ হাজার ৫০৫ কোটি, রাশিয়া ১ হাজার ৩৮৬ কোটি, সৌদি আরব ৯৭৮ কোটি, থাইল্যান্ড ৪৫০ কোটি, তাইওয়ান ১ হাজার ২২ কোটি, জাপান ২ হাজার ৭২১ কোটি, তুরস্ক ৬৬৯ কোটি, ভিয়েতনাম ৭৫ কোটি, কম্বোডিয়া ২ কোটি ও মালয়েশিয়ার রয়েছে ২৩১ কোটি ফ্র্যাংক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত