দেশের অন্তত ৬টি জেলায় বন্যায় কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বেড়ে বিভিন্ন পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করায় প্লাবিত হয়েছে কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, গাইবান্ধা, সুনামগঞ্জ, লালমনিরহাট ও জামালপুরের নিম্নাঞ্চল। গতকাল শনিবার সকালের চেয়ে বিকেলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আরও এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে বাঁধ ও নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। বন্যাদুর্গতদের বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও থাকার জায়গার সংকট দেখা দিয়েছে। তবে বেশিরভাগ এলাকায় দুর্গতরা জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বরাদ্দ বা সহায়তা পাননি বলে জানা গেছে।
আমাদের কুড়িগ্রামের ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদ ও ধরলা নদীর পানি বেড়ে অস্বাভাবিক উচ্চতা দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় প্লাবিত হয়েছে আরও এলাকা। ৯টি উপজেলার মধ্যে কমবেশি সবক’টি উপজেলা বন্যার পানি ঢুকছে। ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কমপক্ষে ৫০ হাজার মানুষ। সেই সঙ্গে দেখা দিয়েছে তীব্র নদীভাঙন। এসব এলাকায় সংকট দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও গৃহনির্মাণ সামগ্রীর। জেলা প্রশাসন থেকে নগদ অর্থ ও চাল বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেগুলো এখন পর্যন্ত কোথাও বিলি করা হয়নি।
আমাদের নীলফামারী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় গতকাল বেলা ৩টায় তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে জেলার ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশা চাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী ও গয়াবাড়ি ইউনিয়নের নদী বেষ্টিত প্রায় ১৫ চরাঞ্চলে পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গত দুই দিনে ঝুনাগাছ চাপনী ইউনিয়নের ২২ পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
আমাদের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বন্যায় সুনামগঞ্জ জেলার ছয় উপজেলার মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে করে এই উপজেলার ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সহিবুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একইভাবে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে গত তিন দিন ধরে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় ৯০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পানি বেড়েই চলেছে। এমন চলতে থাকলে বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
আমাদের লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্লাবিত হওয়ায় জেলার ৫টি উপজেলার ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানির তোড়ে গত দুদিনে সদর উপজেলার অন্তত ২৩টি বসতভিটা নদীগর্ভে গেছে। অনেক এলাকার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটালেও এখন পর্যন্ত জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রশাসন খোঁজ নেয়নি বলে জানা গেছে। জেলা প্রশাসক আবু জাফর জানান, এখন পর্যন্ত জেলার ৩টি উপজেলা থেকে ৭ হাজার লোক পানিবন্দি হয়েছেন বলে উপজেলা প্রশাসন থেকে তালিকা করা হয়েছে। তাদের খাদ্য ও নগদ সহায়তা করা হবে।
আমাদের গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ব্রহ্মপুত্র নদের পানিতে প্লাবিত হয়েছে জেলার সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল। এতে ডুবে গেছে ফসলি জমি ও পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার মানুষ। গত বছরের বন্যায় ভাঙা বাঁধ মেরামত না করায় নদের পানি ঢুকে ২টি গ্রামের সহস্রাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ডুবে গেছে গাইবান্ধা-বালাসীঘাট সড়কও। বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনও শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় বিশুদ্ধ পানি, খাদ্যসহ বিভিন্ন সংকটে পড়েছে মানুষ।
আমাদের জামালপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে জামালপুরে বন্যা দেখা দিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি বেড়ে বাহাদুরাবাদঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় করোনার মধ্যে কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনো সরকারি সহায়তা মেলেনি।
