মেহেরপুরের গাংনীতে বামুন্দী-মটমুড়া, কাজিপুর-নওদাপাড়া ও সহড়াতলা-পলাশীপাড়া সড়ক তিনটি সংস্কারের ১২ ঘণ্টা পরই কার্পেটিংয়ের পিচ উঠে যাচ্ছে মানুষের হাত-পায়ের নখের খোঁচায়। অতি নি¤œমানের সামগ্রী দিয়ে কার্পেটিংয়ের কারণে নতুন রাস্তার এই বেহাল অবস্থা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলীর সঙ্গে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ঠিকাদার জহিরুল ইসলাম কনস্ট্রাকশন ফার্ম রাস্তার কার্পেটিংয়ের কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। তারা রাস্তা নির্মাণের দুর্নীতিতে জড়িত সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর বিচার চেয়ে আন্দোলনে নেমেছেন।
জানা যায়, রাস্তা নির্মাণ শেষ না হতেই কার্পেটিংয়ের পিচ উঠে যেতে থাকলে গত শনিবার এলাকাবাসী হাত দিয়ে, পা দিয়ে খুঁচিয়ে নতুন রাস্তার পিচ-পাথরের মিশ্রণের স্তর তুলে ফেলে। ফেইসবুকে কোটি টাকার রাস্তার এই চিত্রের বেহাল দশার বেশ কিছু ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হলে গতকাল রবিবার মেহেরপুর-২ গাংনী আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সাহিদুজ্জামান খোকন ওই তিনটি রাস্তা পরিদর্শনে যান। এ সময় সাংসদের সামনে এলাকাবাসী বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। পরিদর্শনকালে সাংসদের সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) মেহেরপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান ও গাংনী উপজেলা প্রকৌশলী গোলাপ আলী শেখ। সাংসদের সামনেই বিক্ষুব্ধ লোকজন নির্বাহী প্রকৌশলী ও গাংনী উপজেলা প্রকৌশলীকে মারতে উদ্যত হলে সাংসদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ সময় ওই দুই প্রকৌশলী রাস্তার নির্মাণকাজ বন্ধসহ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার এবং দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিলে শান্ত হয় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
মেহেরপুর এলজিইডি কার্যালয়ের তথ্যমতে, প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে রাস্তা তিনটির কার্পেটিংয়ের কাজ শুরু হয়। মেহেরপুরের জহুরুল ইসলাম কনস্ট্রাকশন ও স্থানীয় ঠিকাদার মোকলেছ হোসেন এই নির্মাণকাজের দায়িত্ব পান। এর মধ্যে জহুরুল ইসলাম কনস্ট্রাকশন ৬ কোটি টাকায় দুটি সড়কের কাজ করছে। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ভবন নির্মাণকাজের ঠিকাদার ছিল এই জহিরুল ইসলাম কনস্ট্রাকশন ফার্ম। ভবনটির ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষের কিছুক্ষণ পরই তা ধসে পড়ে। ওই ঘটনা তদন্তে ঢালাইকাজে নিম্নমানের রড ও অন্য নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের প্রমাণ মেলে। সেই কারণে ২ বছরের জন্য গণপূর্ত বিভাগের কালো তালিকাভুক্ত হয়ে আছে এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঠিকাদার জহিরুল ইসলাম কনস্ট্রাকশন ফার্ম এবং এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে রাস্তার কার্পেটিংয়ের কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে। তাই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ করেও নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে রাস্তা নির্মাণের কাজ তারা বন্ধ করতে পারেননি। এলাকাবাসী বলছে, রাস্তা পরিষ্কার না করে এবং না শুকিয়ে ভেজা কর্দমাক্ত পুরনো রাস্তায় পাথর বিছিয়ে তার ওপর পিচ ঢেলে রোলার চালানো হয়। যে কারণে কয়েক ঘণ্টা পরই নতুন রাস্তার কার্পেটিংয়ের স্তর ফুলেফেঁপে ওঠে। তা দেখে এলাকার বিক্ষুব্ধ অনেক মানুষ হাত-পায়ের নখ দিয়ে খুঁচিয়ে রাস্তা থেকে পিচের স্তর তুলে ফেলে বিক্ষোভ শুরু করে।
ঠিকাদারের সঙ্গে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে এলজিইডির গাংনী উপজেলা প্রকৌশলী গোলাপ আলী শেখ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আমি কোনো আর্থিক সুবিধা নেইনি। রাস্তা পরিষ্কার না করে তার ওপর পিচের কাজ করার কারণে সেই পিচ খসে উঠে পড়ছে। এ ছাড়া রাস্তার পাশে মাটির যে কাজ করার কথা ছিল, সেটা যথাযথভাবে হয়নি। সার্বক্ষণিক দেখভাল করতে না যাওয়ার সুযোগে ঠিকাদারের লোকজন এই অনিয়ম করেছে।’
অন্যদিকে এলজিইডির মেহেরপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েকটি রাস্তার কাজ নিম্নমানের হয়েছে তা সত্য। বিষয়টি নজরে এসেছে। এ কারণে ঠিকাদার ও উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া রাস্তার যে সমস্যাগুলো আছে সেগুলো সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো বিল দেওয়া হবে না।’
সংসদ সদস্য সাহিদুজ্জামান খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সড়কে পিচের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। রাস্তার পাশে মাটিও দেওয়া হয়নি। এ কারণে অল্পদিনেই রাস্তাটি নষ্ট হয়ে যাবে। তাই কাজ বন্ধ করার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী ও গাংনী উপজেলা প্রকৌশলীকে বলেছি। ঠিকাদাররা সরকারি টাকা লুটপাট করে খেয়ে ফেলছে, এটা দুঃখজনক। সরকারি উন্নয়নকাজে কোনোভাবেই অনিয়ম হতে দেওয়া যাবে না। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে। তাই রাস্তার কাজ বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব জনগণের। জনগণ সচেতন বলেই প্রতিবাদ হয়েছে এবং সেটা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সবার দৃষ্টিতে পড়েছে।’
