রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বেচ্ছা অবসরে পাঠিয়ে পিপিপির (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব) মাধ্যমে কারখানা পরিচালনার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন খুলনার নয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের শ্রমিকরা। গতকাল সোমবার সকাল ৯টা থেকে দুই ঘণ্টা পাটকলগুলোর ফটকে সন্তানদের নিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীরা এ কর্মসূচি পালন করেন। শ্রমিকদের স্বেচ্ছা অবসরে পাঠানোর সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে গত ২৬ জুন বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল রক্ষা সিবিএ-নন সিবিএ সংগ্রাম পরিষদ আন্দোলন কর্মসূচির ডাক দেয়।
সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের অভিযোগ, রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের অবশিষ্ট ২৫টি পাটকল আদমজী জুটমিলের কায়দায় বন্ধ করে শ্রমিকদের কর্মের অবসান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই ধরনের সিদ্ধান্ত অন্যায্য ও অযৌক্তিক। লোকসানের ধুয়া তুলে পাটশিল্প ধ্বংসের চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এটা মাথাব্যথার কারণে মাথা কেটে দেওয়ার শামিল।
প্রথম দিনের কর্মসূচি শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত প্লাটিনাম জুটমিলের শ্রমিক নেতা খলিলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রমিকরা সকাল ৯টা থেকে মিল গেটে অবস্থান কর্মসূচি পালন শুরু করে। বেলা ১১টায় কর্মসূচি শেষ হয়। আগামীকাল মঙ্গলবার দুপুর ২টা থেকে ১ জুলাই বুধবার দুপুর ২টা পর্যন্ত মিল গেটে ফের অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা রয়েছে। এরপরও সরকার মিল বন্ধের সিদ্ধান্ত না বদলালে বুধবার দুপুর ২টা থেকে মিল গেটে আমরা আমরণ অনশন শুরু করব।’
বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল রক্ষা সিবিএ-নন সিবিএ সংগ্রাম পরিষদ আহ্বায়ক সরদার আব্দুল হামিদ বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন অনুসারে ব্যক্তিমালিকানা পাটকল মালিকদের ষড়যন্ত্রে আমলাদের চক্রান্তে ২৫ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দেশের ২৫টি পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। পাটকলগুলো আধুনিকায়ন ও নতুন মেশিন স্থাপন করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পরিবর্তে মিল বন্ধের হঠকারী সিদ্ধান্ত শ্রমিক-কর্মচারীরা মেনে নেবেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘পাটকলের সঙ্গে প্রায় তিন কোটি মানুষের রুটিরুজি জড়িত। পাটকল বন্ধ করলে তাদের পরিবার নিয়ে পথে বসতে হবে। দেশে পাটপণ্যের চাহিদা ব্যাপক থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন বৃদ্ধির পরিবর্তে উৎপাদন নিম্নমুখী করে রেখে মিলগুলোকে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে চিহ্নিত করে সরকারের মাথায় বোঝা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।’
তবে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) খুলনা আঞ্চলিক কর্মকর্তা মো. বনিজ উদ্দিন মিঞা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিলগুলো বন্ধ করা হবে না। মিলগুলোকে আধুনিকায়ন করে কীভাবে লাভ করা যায় সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তার আগে শ্রমিকদের সব পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে। যখন মিল চালু হবে তখন তারা আবার কাজ করতে পারবে।’
পিপিপির ভিত্তিতে চালু হবে খুলনার ৭ সাত পাটকল : রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে কর্মরত শ্রমিকদের স্বেচ্ছায় অবসরের (গোল্ডেন হ্যান্ডশেক) মাধ্যমে শতভাগ পাওনা পরিশোধ করে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে মিলগুলো চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। গতকাল দুপুরে সার্কিট হাউজে খুলনা জেলা প্রশাসন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। খুলনার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেনের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) মেয়র তালকদার আব্দুল খালেক।
তিনি বলেন, ‘সরকার এ পর্যন্ত পাটকলগুলোতে ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে মিলগুলো আধুনিকায়ন করেই চালু করা হবে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে মিলগুলো বন্ধ হবে না, আবার শ্রমিক বেকারও হবে না। কারণ পরবর্তী সময়ে এসব মিলে এ অঞ্চলের শ্রমিকদেরই কর্মসংস্থান অব্যাহত থাকবে।’
আর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বলেন, ‘শ্রম আইন অনুযায়ী দুই মাস আগে অর্থাৎ ৩০ জুন সরকারের পক্ষ থেকে নোটিস দিয়ে বিস্তারিত জানানো হবে। ইতিমধ্যে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সভায় এ ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের সব বকেয়া পাওনা ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ৪০ শতাংশ এবং বাকি ৬০ শতাংশ পাওনা টাকা পরবর্তী দুটি অর্থবছরে ৩০ শতাংশ করে পরিশোধ করা হবে। এছাড়া ২০১৪ সাল থেকে অবসরে যাওয়া শ্রমিকদের পাওনা এককালীন পরিশোধ করা হবে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিটি শ্রমিক প্রায় সাড়ে ১২ লাখ থেকে ৫৪ লাখ পর্যন্ত টাকা পাবেন। মিলগুলো পরবর্তী সময়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে চালু হলে এসব মিলে কর্মরত দক্ষ শ্রমিকরাই নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন।’
