ছাঁটাই হওয়া পোশাকশ্রমিকদের আশার গুড়ে বালি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পক্ষ থেকে চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের তিন মাস ধরে ৩ হাজার করে টাকা দেওয়ার প্রণোদনা প্রক্রিয়া ঝুলে গেছে। তৈরি পোশাক বা রপ্তানি খাতে ইইউর পক্ষ থেকে এই প্রণোদনা দেওয়া হলে ব্যাপকহারে ছাঁটাই বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে সরকার। বিষয়টি ইইউকে চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে পোশাকশ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এখন রপ্তানি খাতের শ্রমিকদের জন্য আবারও এ ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হলে অন্যান্য শ্রম খাতে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বিকল্প হিসেবে ইইউর প্রণোদনার অর্থে একটি ‘স্থায়ী শ্রমিক কল্যাণ ফান্ড’ গঠনেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ইআরডির প্রস্তাবে ইইউ সম্মতি দিলে এ বিষয়ে নীতিমালা তৈরি করা হবে বলে ইআরডি সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে ইআরডির ইইউ উইংয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত সচিব ড. গৌরাঙ্গ চন্দ্র মোহন্ত দেশ রূপান্তরকে বলেন, কভিড-১৯ মহামারী সম্পর্কিত সংকট মোকাবিলার জন্য অনুদানের প্রস্তাব করেছে। এই অনুদানের মাধ্যমে ইইউ রপ্তানিমুখী শিল্প বিশেষত তৈরি পোশাক খাতে চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের অর্থ প্রদান করতে চায়। কিন্তু সরকার চায় একটি ‘কল্যাণ তহবিল’ তৈরি করতে। কারণ কর্মহীন শ্রমিকদের এভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলে শিল্প খাতেও অস্থিরতার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে একটি চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। ইইউর সম্মতি পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সম্প্রতি ইআরডিকে এক চিঠিতে ইইউ জানায়, তারা বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের ১০ লাখ কর্মহীন শ্রমিককে মাসে ৩ হাজার টাকা করে তিন মাস মজুরি দেবে। এ ক্ষেত্রে ১১ কোটি ৩০ লাখ ইউরো বরাদ্দ দিতে চিঠিতে বলেছে ইইউ। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৬ কোটি টাকা (প্রতি ইউরো ৯৭ টাকা হিসাবে)।
বিষয়টি নিয়ে ইআরডির আবেকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইইউ আমাদের প্রস্তাবে রাজি হলে একটি নীতিমালা করা হবে। এটি শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে এই প্রক্রিয়ায় রাখা হতে পারে। এই কল্যাণ ফান্ড শুধু কভিট-১৯ নয়, পরবর্তী সময়ে যেকোনো দুর্যোগ এলে যেন শ্রমিকদের জন্য কাজ করা যায়। তাদের পাশে দাঁড়ানো যায়Ñ এই উদ্দেশ্যে করা হবে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় আরমান তালুকদার নামে একজন চাকরিচ্যুত পোশাকশ্রমিকের সঙ্গে। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, যখন জানতে পারলাম যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তিন মাস ধরে দেশের ১০ লাখ শ্রমিককে বেতন দেবে, আশায় বুক বেঁধেছিলাম। নেতাদের কাছে এ কথা শুনেছি মার্চ মাসের শেষের দিকে। অথচ ঘোষণার পরে ইতিমধ্যে তিন মাস কেটে গেছে। এখনো উদ্যোগে তেমন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা নেই। হবেও বলে মনে হচ্ছে না।
বিষয়টি নিয়ে নিজেরে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা, রপ্তানিকারীকারক ও এ-সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, তাতে একটি নীতিমালা তৈরির সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বিলম্ব হবে। আর শ্রমিকদের জন্য এটি অনিশ্চিত করে দেবে।
এ বিষয়ে ইইউ বাংলাদেশ মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, ইআরডির পাঠানো চিঠির বিষয়ে ইইউ পর্যালোচনা করছে। এখনো এ বিষয়ে কী হবে তা বলার মতো সময় হয়নি।
এ বিষয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের (আইবিসি) সাধারণ সম্পাদক চায়না রহমান বলেন, আরএমজি খাতে বিশ^ব্যাপী ক্রেতাদের ওয়ার্ক অর্ডার বাতিলের ফলে শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়ে। এ সময় শ্রমিকদের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ, উত্তেজনার কারণে আমরা ইইউকে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার জন্য আর্থিক সহায়তার জন্য চিঠি দিয়েছিলাম। গত মার্চ মাসের শেষে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনুদান নিয়ে আসে, তবে ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেনি।
ইইউর অনুদানের ইসু্যুতে কাজ করা বিলম্ব হলে বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, এটি একটি পাইলট প্রকল্প এবং আরও বেশি প্রয়োজন হলে এটি বাড়ানো যেতে পারে। তবে অপ্রত্যাশিত বিলম্ব সরকারের পক্ষে ভালো নয়।
সম্মিলিত পোশাক শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, দুই মাস ধরে চাকরি না হওয়ায় শ্রমিকরা জীবন যাপনের জন্য নগদ অর্থের ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে। সহায়তা পেলে তাদের জীবন যাপন সহজ হতো। এটি একটি প্রক্রিয়াগত জটিলতার, যা দ্রুত নিরসন প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
উল্লেখ, গত ২০ মে ইইউর বাংলাদেশ মিশনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইইউ কভিড-১৯ মহামারী মোকাবিলায় সহায়তা হিসেবে বাংলাদেশকে ৩৩ কোটি ৪০ লাখ ইউরো সমপরিমাণ সহায়তা দেবে। এর মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে ব্যয় হবে ২৬ কোটি ৩০ লাখ ইউরো আর ১১ কোটি ৩০ লাখ ইউরো ব্যয় হবে পোশাক শ্রমিকদের জন্য। এই ১১ কোটি ৩০ লাখ ইউরোর মধ্যে ২ কোটি ইউরো জার্মান সরকারের অনুদানও যুক্ত রয়েছে।
ইআরডি সূত্রে জানা যায়, জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশল (এনএসএসএস) কর্মসূচিতে ১৩ কোটি ইউরো সমপরিমাণ অর্থ অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইইউ। গত এপ্রিলে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এখন পোশাকশ্রমিকদের ১১ কোটি ৩০ লাখ ইউরো দেওয়ার প্রস্তাব করেছে ইইউ। এনএসএসএসের জন্য স্বাক্ষরিত তহবিল থেকে এ তহবিল আসবে।
