করোনা পরীক্ষায় কিটের সংকট কাটেনি। কিটের সরবরাহ বাড়াতে না পেরে এবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশের ল্যাবরেটরিগুলোকে সমপরিমাণ রি-এজেন্ট ব্যবহার করে দ্বিগুণ নমুনা পরীক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে। এর ফলে আগে যে পরিমাণ রি-এজেন্ট ব্যবহার করে একটি নমুনা পরীক্ষা করা হতো, এখন সমপরিমাণ রি-এজেন্ট ব্যবহার করে দুটি নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
ঢাকার সাভারের প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) তাদের ল্যাবে একটি কিটে দুটি নমুনা পরীক্ষার এই সমীক্ষা পরিচালনা করে। তাতে ইতিবাচক ফল আসায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে গত ১৭ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে প্রস্তাব করা হয় এই পদ্ধতিতে পরীক্ষার। পরে ২০ জুন থেকে বিভিন্ন ল্যাবরেটরিকে এভাবে পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী বর্তমানে করোনা পরীক্ষা করছে যে ৬৯টি ল্যাবরেটরি, তার মধ্যে ৫০টির মতো ল্যাব এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা করছে বলে জানান বিএলআরআই কর্র্তৃপক্ষ।
এ ব্যাপারে বিএলআরআইর ল্যাবরেটরি ইনচার্জ ও প্রতিষ্ঠানের করোনা টেস্টিংয়ের ফোকাল পারসন ডা. এম এ সামাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা নতুনত্ব কিছু নয়, ইনোভেশন। একজনের নমুনা পরীক্ষার জন্য আগে যে পরিমাণ রি-এজেন্ট ব্যবহার হতো, এখন সেই একই পরিমাণ রি-এজেন্ট দিয়ে দুজনের নমুনা পরীক্ষা করা যাবে। রেজাল্ট একই রকম থাকবে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকারের ল্যাবগুলোর মধ্যে ৫০-এর বেশি ল্যাবরেটরিতে এভাবে পরীক্ষা হচ্ছে। অর্থাৎ যেসব ল্যাব চীনের সানসিউর কিট ব্যবহার করছে, তারা এভাবে পরীক্ষা করছে। আর যেসব ল্যাব অন্য কিট ব্যবহার করছে তারা আগের মতোই পরীক্ষা করছে।
তবে এই পদ্ধতিতে নমুনা পরীক্ষার শতভাগ ফল নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সরকারের বিভিন্ন ল্যাবরেটরির ভাইরোলজি ও মাইক্রোবায়োলজি বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ববিদরা। এসব বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ১০০ পরীক্ষায় ৯০টার মতো সঠিক ফল আসছে। তবে এসব বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দক্ষ লোকবল ও বিশেষজ্ঞ না থাকলে, অর্ধেক রি-এজেন্ট ব্যবহার করে পরীক্ষার ফল সঠিক না-ও আসতে পারে; বিশেষ করে রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ল্যাবের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, করোনার নমুনা নিয়ে এই মুহূর্তে পরীক্ষামূলক কোনো কিছু করার সময় নয়। আমরা যারা সার্ভিস দিচ্ছি, তাদের এটা মনে রাখতে হবে। এখন আন্তর্জাতিক প্রটোকলের ওপরই ঠিক থাকতে হবে।
এসব ল্যাবপ্রধান এমনও জানান, তারা এখনো আন্তর্জাতিক প্রটোকল ব্যবহার করে আগের মতোই পরীক্ষা করছেন। তাদের ফল নিয়ে কোনো সংশয় নেই;
বিশেষ করে এই নতুন পদ্ধতি পরীক্ষা চালুর ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করোনা পরীক্ষা ও ল্যাবরেটরির মান দেখা ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটিকে কিছুই জানায়নি। এ ব্যাপারে কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, খোঁজ নিয়ে দেখলাম, চট্টগ্রামে এভাবে পরীক্ষা করছে। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আমাদের কিছুই জানায়নি। আমরা জানিই না। এভাবে তো হয় না। আমি কমিটির সভাপতিকে বলব, এ ব্যাপারে একটা মিটিং করতে। কারণ কী হচ্ছে এসব, সেটা তো আমাদের জানতে হবে। এটা একটা অনিয়ম।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, তারা যে এভাবে পরীক্ষা করতে বলল, সেটা ঠিক ফল আসে কি না, সেটা কতটুকু যাচাই-বাছাই করেছে, দেখতে হবে। একটা যদি টেস্ট পজিটিভটা নেগেটিভ ও নেগেটিভটা পজিটিভ আসে, এটাই একটা বিরাট ব্যাপার। এখন যদি কিট সংকটের কারণে পরীক্ষা কমে যায়, ভুল পরীক্ষা হয়, সেটা খুব খারাপ হবে। আমরা বলেছি কমপক্ষে ২০ হাজার পরীক্ষা করতে। সেটা এখনো পারল না। এতে সংক্রমণ বাড়বে।
এদিকে, বিএলআরআই যদিও বলছে, প্রায় ৫০টির মতো ল্যাব অর্ধেক রি-এজেন্ট ব্যবহার করে নমুনা পরীক্ষা করছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর ৩৬টি ল্যাবের কোনোটিতেই এভাবে পরীক্ষা হচ্ছে না। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশন ও ঢাকা শিশু হাসপাতাল, আইসিডিডিআর’বি, আইইডিসিআরসহ সব ল্যাবই আগের মতোই ভুল ভল্যুয়ম রি-এজেন্ট ব্যবহার করেই পরীক্ষা করা হচ্ছে।
এসব ল্যাবপ্রধান অন্য ল্যাবরেটরিতে নতুন পদ্ধতিতে পরীক্ষা করার সুপারিশ করলেও নিজেরা কেন করছেন নাÑ জানতে চাইলে তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিটের যে সংকট তাতে পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাবে। তার চেয়ে কিছুটা কম ফল পেলেও পরীক্ষা চালু থাক।
অন্যদিকে, কিটের অভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে নমুনা কম সংগ্রহের তথ্য পাওয়া গেছে। ব্র্যাকসহ ঢাকার বাইরে নমুনা সংগ্রহ করছে, এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে কিট স্বল্পতার কারণে আগের চেয়ে নমুনা সংগ্রহ কমিয়ে দিতে বলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে। ফলে আগের তুলনায় এখন গড়ে ৩০ শতাংশ নমুনা কম সংগ্রহ হচ্ছে। নমুনা কম সংগ্রহ হওয়ায় ঢাকার ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতেও কম নমুনা আসছে বলে জানা গেছে।
কেমন এই পরীক্ষা : বিভিন্ন ল্যাবের ভাইরোলজিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট ও রোগতত্ত্ববিদরা বলেছেন, পরীক্ষার গোটা রি-অ্যাকশন ভল্যুয়মকে অর্ধেক করে ফেলেছে। পরীক্ষার প্রটোকল পরিবর্তন করেছে। এই পদ্ধতিতে আনুপাতিক হারে সবই কমানো হয়েছে। শুধু যে রি-এজেন্ট অর্ধেক দেওয়া হচ্ছে, তা নয়; আগে ১০ মাইক্রোলিটার নমুনা দিত, এখন ৫ মাইক্রোলিটার নমুনা দেওয়া হচ্ছে। নমুনা সংগ্রহ করা হয় দুই মিলিলিটার। পরীক্ষার জন্য লাগে ৫-১০ মাইক্রোলিটার। আগে ছিল ১০ মাইক্রোলিটার নমুনা ও ৩০ মাইক্রোলিটার রি-এজেন্ট; এখন দুটোই অর্ধেকে নামিয়ে এনে পরীক্ষা করতে বলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এক বিশেষজ্ঞ বলেন, ভাইরাস যদি থাকে তা হলে ১০ মাইক্রোলিটার লাগে না, ১ মাইক্রোলিটারেই শনাক্ত করা যায়। কমার্শিয়ালি ভল্যুয়ম বেশি দেওয়া হয় যাতে স্ট্যান্ডার্ড হয়। যেকোনো টেস্টেই সাধারণত অর্ধেক ভল্যুয়ম ব্যবহার করেই পরীক্ষা করে।
ফলে তারতম্যের আশঙ্কা আছে : এই পদ্ধতিতে ফলাফলের তারতম্যের আশঙ্কা অবশ্যই আছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আগে যেখানে ১০০০ পজিটিভ পাওয়া যেত, এখন সেখানে ৯০০ পজিটিভ আসবে। তার মানে ১ শতাংশ হেরফের হবে। কারণ রি-এজেন্ট কমানোর সঙ্গে সঙ্গে নমুনাও কমে যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সুলতানা শাহানা বানু দেশ রূপান্তরকে বলেন, যখন রি-এজেন্ট কম থাকে, তখন বিশ্বের অনেক দেশেই অর্ধেক প্রটোকলে পরীক্ষা করা হয়। আমরা দুভাবেই পরীক্ষা করে দেখেছি, একই রেজাল্ট আসে। তা ছাড়া এখন কিটের অভাব।
তবে এই পদ্ধতিতে ফল সঠিক আসবে কি না, সেটা নির্ভর করবে ল্যাবগুলোর লোকবলের দক্ষতার ওপর উল্লেখ করে এই ভাইরোলজিস্ট বলেন, সব ল্যাবরেটরিতে এক্সপার্টরা ঠিকমতো কাজ করছেন কি না, তারা কতটুকু এক্সপার্ট, সেটার ওপর নির্ভর করে। এটা ল্যাবরেটরির মানের ওপর নির্ভর করবে। অবশ্যই এ জন্য ল্যাবরেটরিতে যারা কাজ করছেন, তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রামের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসের (বিআইটিআইডি) করোনা ল্যাবপ্রধান ডা. শাকিল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন রি-অ্যাকশন ভল্যুয়ম কমিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে। তাতে প্রায় দ্বিগুণ নমুনা পরীক্ষা করা যাচ্ছে। আগে একটা বক্সে ২৪টা কিট থাকত, সেটা দিয়ে ২২টা পরীক্ষা করা যেত। এখন সেটা দিয়ে প্রায় ৪০টার মতো পরীক্ষা করা যাবে। আমরা তিন দিন বিভিন্ন ধরনের নমুনা পরীক্ষা করে দেখেছি রেজাল্ট একই অসে। ৯০-৯৫ শতাংশ সঠিক রেজাল্ট আসে। সে জন্য আমরা এটা করছি। এতে কিটের সাশ্রয় হবে। যদি কিট নিয়মিত সরবরাহ করা হতো, তাহলে আর এভাবে করা লাগত না। এখন এমনভাবে কিট দেয় তিন-চার দিনেই শেষ হয়ে যায়। পরে লোক পাঠাতে হয়। বিশেষভাবে আনতে হয়। গাড়ি নেই। টাকাও নেই। সব মিলিয়ে সবাই ঝামেলার মধ্যেই ছিলাম। সেখান থেকে একটা উত্তরণ হলো। যা-ই পাই দীর্ঘসময় টেস্ট করা যাবে।
এই ল্যাবপ্রধান বলেন, ৩ হাজার কিট দিয়েছে। এটাই সর্বোচ্চ এখানকার জন্য। এর আগে ১ হাজার ২০০-১ হাজার ৫০০ করে কিট পেতাম। চার দিন করা যেত। তারপর ঢাকায় যেতে হতো। অনেক টাকা খরচ। গাড়ি রিজার্ভ করে পাঠানো। খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। এখন যে কিট পেয়েছি, সেটা আগের মতো করলে ১০ দিন চলত, এখন ১৫-১৮ দিন চলবে।
নমুনা সংগ্রহ কম হচ্ছে : নমুনা সংগ্রহ এবং পরীক্ষার সঙ্গে জড়িতদের অনেকে জানিয়েছেন, এখন নমুনা সংগ্রহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং একেবারে প্রয়োজন ছাড়া পরীক্ষা করা হচ্ছে না। সংক্রমণের উচ্চহারের মুখে ৩০ হাজার নমুনা পরীক্ষার টার্গেটের কথা বলা হলেও এখন ১৬ বা ১৭ হাজারের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ থাকছে।
নমুনার অভাবে গতকাল তিন হাজার রিপোর্ট দিতে পারেনি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি। তার আগের দিন ৩ হাজার ২২২টি রিপোর্ট দিয়েছে। গতকাল দিয়েছে ২ হাজার ৬৯২টি। গত মঙ্গলবার যা সংগ্রহ হয়েছে সবই পরীক্ষা শেষ। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে নমুনা কম আসছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে ৫৪টি বুথে নমুনা সংগ্রহ করছে। তাদেরও নমুনা সংগ্রহ কমেছে বলে জানিয়েছেন এসব বুথ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্র্যাকের কর্মকর্তা মোর্শেদা চৌধুরী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিট সংকটের কারণে নমুনা সংগ্রহ কমেছিল। সেটা একটু বেড়েছে। আগে প্রতি বুথে ৩০টি করে নমুনা সংগ্রহ করা হতো। কিছুদিন আগে সেটা ১৫তে নেমে এসেছিল। এখন আবার ২০টি করে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
