প্রবাসী আয় ও রিজার্ভে আবারও রেকর্ড

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২০, ০৬:৪৬ এএম

বিশ্বজুড়ে মহামারী করোনাভাইরাসের প্রভাবে অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও দেশে প্রবাসী আয়ে রেকর্ড তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থান নিয়ে সংকটের মধ্যে সদ্য শেষ হওয়া জুন মাসে প্রবাসীরা দেশে ১৮৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মাসে এর আগে কখনই এত বেশি রেমিট্যান্স আসেনি। এ সময়ে রপ্তানির পাশাপাশি আমদানি দায় পরিশোধের চাপও কমেছে। এ কারণে প্রবাসী আয়ে নির্ভর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়ছে। গতকাল নতুন মাইলফলক স্পর্শ করে দেশের  বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ এখন মিসর, নাইজেরিয়া, চিলি ও বুলগেরিয়ার কাতারে চলে এসেছে। রিজার্ভ আর ১ বিলিয়ন ডলার বাড়লেই বাংলাদেশ এসব দেশকে অতিক্রম করতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জুন মাসে ১৮৩ কোটি ২৬ লাখ ডলারের রেকর্ড রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৬ কোটি ৮৩ লাখ ডলার বেশি। গত বছর জুনে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৩৬ কোটি ৪২ লাখ ডলার। একক মাস হিসেবে প্রবাসী আয়ে এটি রেকর্ড। এর আগে এক মাসে ১৭৪ কোটি ৮০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের জুন মাসে রোজার ঈদকে সামনে রেখে। এর মধ্য দিয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট ১ হাজার ৮২০ কোটি ৪৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। দেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ১ লাখ ৫৪ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসেবে)।

মূলত গত অর্থবছরে প্রবাসী আয়ের ওপর ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা ঘোষণার পর থেকেই বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে থাকে। তবে করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী লকডাউনের মার্চ ও এপ্রিল মাসে রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমে যায়। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ঈদের মাস মে থেকে রেমিট্যান্স আবারও বাড়তে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় সদ্য শেষ হওয়া জুন মাসে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে দেশে।

এদিকে করোনার কারণে আমদানি-রপ্তানি ব্যাপক হারে কমে গেছে। তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় দেশের পোশাকশিল্প সংকটের মধ্যে পড়েছে। তবে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানি দায় পরিশোধ কমায় দেশের রিজার্ভ গত দুই মাস ধরেই বাড়ছে। শুধু প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর ভর করে গতকাল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। এক মাসের মধ্যেই রিজার্ভ ৩৩ থেকে ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেল। রেমিট্যান্সের বিদ্যমান ধারা অব্যাহত থাকলে এ মাসের মধ্যেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এর আগে করোনা মহামারীর মধ্যেই গত ৩ জুন প্রথমবারের মতো দেশের রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করে। এরপর মাস পার হওয়ার আগেই রিজার্ভে যুক্ত হলো আরও ২ বিলিয়ন ডলার। গত ২৩ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলার স্পর্শ করে।

বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বিশে^ বাংলাদেশের অবস্থান ৫২তম। ৩৬ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ নিয়ে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে মিসর। এর সামান্য ওপরে রয়েছে নাইজেরিয়া, চিলি ও বুলগেরিয়া। এভাবে রিজার্ভ বাড়তে থাকলে হয়তো আগামী কয়েক মাসে এসব দেশকে অতিক্রম করতে পারবে বাংলাদেশ। বিশে^ সবচেয়ে বেশি মার্কিন ডলারের রিজার্ভ রয়েছে চীনের হাতে। চলতি বছরের মে পর্যন্ত চীনের হাতে ৩ হাজার ১০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রিজার্ভ রয়েছে। ১ হাজার ৩৭৮ ডলার রিজার্ভ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জাপান। আর ৫০৭ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ নিয়ে ভারত রয়েছে পঞ্চম অবস্থানে।

আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রার মজুদ থাকতে হয়। বাংলাদেশের কাছে এখন যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ আছে তা দিয়ে অন্তত আট মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।

প্রবাসী আয় ছাড়াও করোনা সংকট, উন্নয়ন ও বাজেট সহায়তায় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি থেকেও প্রচুর ঋণ আসছে। এসব কারণেই রিজার্ভে একের পর এক রেকর্ড হচ্ছে।

প্রথমবারের মতো রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছিল ২০১৭ সালের ২২ জুন। এরপর থেকে রিজার্ভ ৩২ থেকে ৩৩ বিলিয়ন ডলারে ওঠানামা করছিল। তবে করোনাভাইরাসের সময়ে ডলারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় একের পর এক রেকর্ড হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, আগস্ট মাসের পর থেকে আমদানি দায় পরিশোধে তাগাদা বাড়বে। তবে বেসরকারি পর্যায়ে বৈদেশিক মুদ্রার ঋণের দায় ও এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) দায় শোধ করলে এ রিজার্ভ আবারও কমে যাবে বলছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, ইরান, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ এই ৯টি দেশ বর্তমানে আকুর সদস্য। এ দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ যেসব পণ্য আমদানি করে তার বিল দুই মাস পরপর আকুর মাধ্যমে পরিশোধ করে থাকে। জুলাই মাসেই আকুর মাধ্যমে এশিয়ার ৯টি দেশের আমদানি-রপ্তানি সমন্বয় করা হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হবে প্রায় ৭০ কোটি ডলার। এ দায় পরিশোধের পরও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়নের ওপরেই থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত