টঙ্গী-ভৈরব বাজার সেকশন ডাবল লাইন নির্মাণে অনিয়ম

কাজ শেষ হতেই অকেজো হয়ে পড়ছে অবকাঠামো

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২০, ০৭:৪৫ এএম

সিগন্যালিংসহ টঙ্গী-ভৈরব বাজার সেকশন ডাবল লাইন নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম  হয়েছে। ফলে প্রকল্পের কাজ শেষ হতে না হতেই নির্মিত অবকাঠামো অকেজো হতে শুরু করেছে। ৫ বছরের প্রকল্প শেষ হয়েছে ১২ বছরে। ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ২০০ শতাংশের বেশি। প্রকল্প সংশোধন হয়েছে ৩ বার, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বদল হয়েছে ৯ বার। এসব অনিয়ম তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে খোদ প্রকল্প তদারকি সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। প্রকল্প নিয়ে সংস্থাটির করা এক নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আইএমইডি বলছে, নির্মিত রেললাইনের এমব্যাংকমেন্ট বা রক্ষাবাঁধ নির্মাণে অনিয়ম হয়েছে। ইতিমধ্যে কিছু কিছু জায়গায় বাঁধের সোল্ডার দু’দিকেই ভেঙে গেছে, বাঁধের প্রশস্ততাও কম। রেলওয়ে ট্র্যাক টিকে থাকে পাথর বা ব্যালাস্টের ওপর। রেললাইনে পাথর কম দেওয়া হয়েছে, এতে কিছু স্থানে ব্যালাস্ট (লাইনের পাথর) নিচু হয়ে গেছে। এছাড়া প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ চলাকালে ৪টি মেজর ব্রিজ মাটি ভরাটের কারণে ব্লক হয়ে গেছে। এ জন্য পানি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। নির্মিত বেশিরভাগ ব্রিজের রং উঠে জং ধরে নষ্ট হচ্ছে। 

আইএমইডি প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, রেললাইনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে না। রক্ষণাবেক্ষণ করলেও মান খুব খারাপ। প্রকল্প এলাকায় অননুমোদিত লেভেল ক্রসিংয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। দুটি স্টেশন জনবলের অভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্টেশনে নারীদের জন্য পৃথক টয়লেট ও বিশ্রামাগার করার পরিকল্পনা থাকলেও তা হয়নি। এছাড়া স্টেশনগুলোতে যাত্রীদের টিকিট তল্লাশির অবস্থা নাজুক। সিগন্যালিং রুমে বসানো এসিও অকেজো হয়ে গেছে।

আইএমইডির সচিব আবুল মনসুর মো, ফয়েজউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্পের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। অডিট আপত্তিও নিষ্পন্ন হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুসারে অনেক কাজ হয়নি বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে লাইন রক্ষাবাঁধে অনিয়ম অন্যতম। এছাড়া প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রক্ষণাবেক্ষণ অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। এজন্য বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্রিজগুলো সচল করা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থায় গতি আনা এবং জনবল সংকট নিরসন প্রয়োজন। এসব পরামর্শ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

আইএমইডি বলছে, প্রকল্পের মূল রেললাইন রক্ষাবাঁধের ওপর নির্মিত। এর রক্ষণাবেক্ষণ বা পুনর্বাসন রেললাইন নির্মাণকাজে অন্তর্ভুক্ত ছিল। আইএমইডির পরিদর্শক দল মোট ১১টি স্থানে রক্ষাবাঁধের ক্রেস্টের প্রশস্ততা পরিমাপ করে। এতে পরীক্ষিত স্থানগুলোতে প্রশস্ততা ৫ মিটার থেকে ৫ দশমিক ৯০ মিটার পাওয়া যায়। এর মানে নকশা অনুসারে এগুলো কম পাওয়া গেছে। এছাড়া কিছু স্থানে রক্ষাবাঁধের সোল্ডার দুই দিক থেকে ভেঙে গেছে। এগুলোর মেরামত প্রয়োজন।

আইএমইডি বলছে, রেললাইনের ট্র্যাক বসানো হয় পাথরের ওপর। এটি রেল চলাচলকে নিরাপদ করে। কিন্তু আলোচ্য রেললাইনে পাথর যেহারে দেওয়ার কথা ছিল, তা দেওয়া হয়নি। রেললাইনের বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষায় ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন অনুসারে পাথর কম পাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মেইন লাইন ও সোল্ডারের কোশন ব্যালাস্ট পরীক্ষা করা হয়। এতে মেইন লাইনে গড়ে ৪৯ দশমিক ৫ মিলিমিটার পাথর ফেলা হয়েছে, যা ডিজাইনের চেয়ে ২৫ শতাংশ কম। সোল্ডারে ফেলা হয়েছে ৫৯ দশমিক ৯ মিলিমিটার, যা ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ কম। এছাড়া ব্যালাস্ট ওয়াল দেওয়া হয়নি। ফলে অনেক ঘনবসতি স্থানে পাথরের অপচয় হচ্ছে। 

প্রতিবেদনে বিষয়টি তদন্তের সুপারিশ করে বলা হয়েছে, ব্যালাস্ট কম পাওয়ার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অনিয়ম। বিষয়টি তদন্তপূর্বক সমাধান করা প্রয়োজন। এটা রেলের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। রেল মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন ও পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান ও অতিরিক্ত সচিব প্রণব কুমার ঘোষ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি ও সচিব  (রেল বিভাগ) মাত্র জয়েন করেছি। এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। কারণ বলার আগে জানতে হবে। তবে উন্নয়ন কর্মকা- শেষ হওয়ার পর রক্ষণারেক্ষণে আরও মনোযোগ বাড়াতে হবে। এটা শুধু রেল নয়, সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এর বিকল্প নেই। 

তবে বিষয়টি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন বিশ^ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু মান নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। রাস্তা নির্মাণ হলে টিকছে না, বৃষ্টির পানিতে ভেসে যাচ্ছে সেতু বা ব্রিজ। টেকসই উন্নয়নে এগুলো বড় বাধা। কারণ প্রকল্প ব্যয় ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরও অনিয়ম হলে রাষ্ট্রের সম্পদের বড় অপচয় হচ্ছে বোঝা যায়। এগুলো ঠেকাতে হবে, মনিটরিং বাড়াতে হবে। 

টঙ্গী-ভৈরব বাজার সেকশনটি ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহ (ভায়া ভৈরব বাজার) ও ঢাকা-নোয়াখালী সেকশনে ট্রেন পরিচালনার জন্য একমাত্র কমন লাইন। এসব সেকশন বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেকশন। টঙ্গী-ভৈরব বাজার সিঙ্গেল লাইন বিদ্যমান থাকায় ট্রেন পরিচালনার ক্ষেত্রে উক্ত সেকশনটি এক লাইনের ছিল। ফলে অতিরিক্ত যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন পরিচালনা সম্ভব ছিল না। এ প্রেক্ষিতে উক্ত সেকশনে ডাবল লাইন ট্র্যাক নির্মাণ করার উদ্যোগ নেয় সরকার।

প্রকল্পটি ২০০৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের জুনÑ ১২ বছর মেয়াদে বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রকল্প সমাপ্তির মেয়াদ দুই দফায় মোট ৭ বছর বা ৮৪ মাস বাড়ানো হয়েছে। সার্বিকভাবে যা ২৪০ শতাংশ বেশি বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ৭২৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, পরে দুবার সংশোধন করে ব্যয়ের অঙ্ক দাঁড়ায় ২ হাজার ১৭৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এতে মূল ডিপিপির তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ১ হাজার ৪৫১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বা ২০০ দশমিক ১৯  শতাংশ। যদিও প্রকল্পের মাঝপথে  বাস্তব কাজের পরিধি কমানো হয়েছিল। সব মিলিয়ে প্রকল্পের আওতায় ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ১৭৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ডিপিপি অনুসারে কাজও শতভাগ শেষ হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় টঙ্গী থেকে ভৈরব বাজার পর্যন্ত ডাবল লাইন ট্র্যাক নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪ কিলোমিটার এমজি লাইন এবং ২২ কিলোমিটার লুপ ও সাইডিং লাইনে এমব্যাংকমেন্ট ও রেল ট্র্যাক নির্মাণ, ৪টি মেজর সেতুসহ মোট ৭১টি ব্রিজ বা কালভার্ট নির্মাণ, ২৪ কিলেমিটার সফট গ্রাউন্ড ট্রিটমেন্ট, ১১টি স্টেশনের স্টেশন ও ইয়ার্ড আধুনিকীকরণ, কম্পিউটার বেইজড সিগন্যালিং সিস্টেম স্থাপনসহ আনুষঙ্গিক কাজ শেষ হয়েছে।

প্রকল্পে নতুন জনবল নিয়োগ করার প্রয়োজন হয়নি। রেলওয়ে দপ্তর, জনবল ও যানবাহন বিদ্যমান ছিল। প্রকল্পটি শিক্ষার প্রসার, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রাখছে। তবে লোকাল ট্রেনের বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে যাত্রী সংখ্যার তুলনায় অপ্রতুল ট্রেন ও বগি, প্ল্যাটফর্ম ও যাত্রীছাউনির খাটো দৈর্ঘ্য ইত্যাদি সমস্যা বিদ্যমান। এজন্য বন্ধ থাকা দুটি স্টেশন পুনরায় চালু, ট্রেনের সংখ্যা ও বগির সংখ্যা বাড়ানো, নারীদের জন্য স্টেশনগুলোতে সুবিধা বৃদ্ধি, অননুমোদিত লেভেল ক্রসিংয়ের নিরাপত্তা বাড়ানো এবং  নৈমিত্তিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন বলে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত