পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে নির্যাতিত হচ্ছেন সাংবাদিকরা। দেশে সাংবাদিক নির্যাতনের পরিসংখ্যান দেখলে আঁতকে উঠতে হয়। কিন্তু সাংবাদিক নির্যাতনের বিচার হয় না। ভয়-ভীতি, হুমকি-ধামকি, মামলা-মোকদ্দমা, মারাত্মক শারীরিক নির্যাতনে জখম থেকে শুরু করে গুম কিংবা খুন নির্যাতনের এমন কোনো ধরন নেই যার শিকার হচ্ছেন না সাংবাদিকরা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর কিংবা মফস্বল সর্বত্রই চলছে এই নির্যাতন। স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা বা সদস্য সবার বিরুদ্ধেই বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। লোকচক্ষুর অন্তরালে তুলে নিয়ে নির্যাতন থেকে শুরু করে প্রকাশ্য দিবালোকে জনসমক্ষে মারধরের শিকার হচ্ছেন, নির্যাতিত হচ্ছেন সাংবাদিকরা। কিন্তু দেশে একের পর এক সাংবাদিক হত্যা আর নির্যাতন-নিপীড়নের বিচার নেই। হত্যা ও নির্যাতনের অগুনতি মামলা বছরের পর বছর ঝুলে আছে, বিচারের কোনো অগ্রগতি নেই। বিচার না করায় দেশে এখন সাংবাদিক নির্যাতন নিত্যকার বিষয় হয়ে উঠেছে।
যে কোনো স্থানীয় বা জাতীয় দুর্যোগে সাংবাদিকরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। এমন ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় কাজ করা সত্ত্বেও সাংবাদিকদের জন্য কোনো ধরনের ঝুঁকিভাতা পর্যন্ত নেই। কিন্তু পেশাগত দায়িত্বপালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। দেশে করোনা মহামারী বিস্তারের শুরু থেকেই চিকিৎসক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়ে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন সাংবাদিকরা। অথচ দেখা গেল মহামারীর জাতীয় দুর্যোগের সময়েই দেশে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) গত সপ্তাহে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাস জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে যথাক্রমে ১৭, ১৮ ও ১৫ জন করে মোট ৫০ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আর মহামারী শুরুর পরের তিন মাস এপ্রিল, মে ও জুনে যথাক্রমে ৩৬, ৪০ ও ৩০ জন করে মোট ১০৬ জন সাংবাদিক নির্যাতিত হয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রতিদিনই এসব নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশিত হলেও দেশে এর কোনো প্রতিকার নেই।
শনিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘এবার সাংবাদিকের ওপর চড়াও হাসপাতালের আনসার’ শিরোনামের প্রতিবেদনে রাজধানীতে আবারও সাংবাদিক নির্যাতনের সচিত্র খবর প্রকাশ করা হয়। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে ক্যানসার আক্রান্ত এক রোগীর স্বজনকে মারধরের ছবি তুলতে গেলে বাংলাদেশ প্রতিদিনের ফটোসাংবাদিক জয়িতা রায়কে মারধর করতে উদ্যত হন তারা। এসব ঘটনার ছবি তুলতে গিয়ে তাদের রোষানলে পড়েন দেশ রূপান্তরের ফটোসাংবাদিক রুবেল রশীদ। এ সময় তাদের হামলায় তার ক্যামেরার ফিল্টার ভেঙে যায়। স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, করোনা পরীক্ষা করার জন্য সেদিন ৪০ জনকে টিকিট দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ৩৪ জনের পরীক্ষা করেই আনসার সদস্যরা বলেন ৪০ জনের পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। তখন বাকি রোগী ও তাদের স্বজনরা প্রতিবাদ করতে থাকেন। এ সময় ৩৬ নম্বর সিরিয়ালে থাকা শাওন হোসেন নামে এক শিক্ষার্থী এর প্রতিবাদ করলে চারজন আনসার সদস্য তাকে হাসপাতালের ভেতরে নিয়ে লাঠি ও ব্যাট দিয়ে পেটায়। এ সময় তিনজন পুলিশ এসে শাওনের নাম-ঠিকানা লিখে রেখে সাংবাদিকদের কিছু না জানানোর জন্য হুমকি দেয়। এই ঘটনার সময় সাংবাদিকদের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং নারী সাংবাদিককে চড় মারার চেষ্টা করে আনসার সদস্যরা।
এটা খুবই দুঃখজনক যে, একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদ মাধ্যম এবং সাংবাদিকতার খুবই দুর্দিন চলছে। একদিকে করোনা মহামারীর কবলে পড়ে সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রবল আর্থিক সংকটে পতিত হয়েছে, আরেকদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ নানা নিবর্তনমূলক ব্যবস্থার শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকরা। আর এমন জলে কুমির ডাঙায় বাঘের পরিস্থিতিতেও অবাধে চলছে সাংবাদিক নির্যাতন। এক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং উদাসীনতার পাশাপাশি সাংবাদিক সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক বিভক্তি এবং সাংবাদিকদের পক্ষে লড়াই করার মতো কোনো সহায়ক প্রতিষ্ঠান না থাকাটাও একটা বড় সংকট। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক প্রতিবেদন অনুসারে কেবল ২০১৯ সালেই শারীরিক নির্যাতন, হামলা, মামলা, হুমকি ও হয়রানিসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ১৪২ সাংবাদিক। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কমপক্ষে ৬২টি মামলা হয়েছে, যেখানে আসামি করা হয়েছে ১৪০ জনকে। কিন্তু সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় সরকারের ভূমিকা অনেকটাই নীরব। গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন জরুরি।
