মাদার ভেসেল থেকে পণ্য আনায় ডব্লিউটিসির ছাড়পত্রের বাধ্যবাধকতা

নিজস্ব লাইটার জাহাজে পণ্য পরিবহনে বাধা, বেকায়দায় আমদানিকারকরা

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২০, ০৫:৫০ এএম

নাব্য সংকটের কারণে মাদার ভেসেল নোঙর করা হয় দূর সমুদ্রে। সেই জাহাজ থেকে আমদানি করা পণ্য ছোট বা লাইটার জাহাজে দেশের ৩৭টি ঘাট ও শিল্প মালিকদের কারখানার ঘাটে নিয়ে খালাস করা হয়। এর বড় অংশ সিমেন্টশিল্পের কাঁচামাল, ইস্পাতের কাঁচামাল, কয়লা, সার ও ভোগ্যপণ্য। তবে উপকূল অতিক্রমের অনুমতিপত্র থাকার পরও মালবাহী নৌযানকে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের (ডব্লিউটিসি) ছাড়পত্র নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করায় অভ্যন্তরীণ রুটে পণ্য পরিবহনে নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে। এতে অভ্যন্তরীণ নৌরুটে পণ্য পরিবহনে বিশৃঙ্খলা ও সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের লাইটার জাহাজের পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা থাকলেও অন্যের মুখ চেয়ে থাকতে হচ্ছে শিল্প উদ্যোক্তা ও আমদানিকারকদের।

সূত্র জানায়, উদ্যোক্তাদের আমদানি পণ্য নিজেদের জাহাজে নিজ কারখানায় পরিবহনে বাধা দিচ্ছে ডব্লিউটিসি। কর্ণফুলী নদী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন নৌঘাটে নিয়ে হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে। লাইসেন্স ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে জাহাজ আটক করা হচ্ছে। এ ধরনের বেপরোয়া কর্মকা-ে নদীপথে পণ্য পরিবহনে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বাধা পাচ্ছে ভোগ্যপণ্য ও শিল্প কারখানার পণ্য।

সূত্র আরও জানায়, ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের ‘এই নৈরাজ্যের’ মূলে রয়েছে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের এক আদেশ। গত ৪ জুন জারি করা মহাপরিচালক কমোডর সৈয়দ আরিফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই সার্কুলারে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ মালবাহী নৌযানগুলোর অনুকূলে উপকূল অতিক্রমের অনুমতিপত্র (বে-ক্রসিং) থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো অভ্যন্তরীণ মালবাহী নৌযান ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের ছাড়পত্র ব্যতীত মালামাল পরিবহন করে, তাহলে ওই সব মালবাহী নৌযানের মালিক ও এজেন্টের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।

অভিযোগ উঠেছে, নিজেদের নিয়ন্ত্রণ খর্ব হয়ে যাওয়ায় জোর করে সব লাইটার জাহাজ ডব্লিউটিসির অধীনে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। অথচ ডব্লিউটিসি নেতারা ইচ্ছেমতো জাহাজ চালান। আর অধিদপ্তরের আদেশ পেয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন তারা।

গত ২৯ জুন নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করেন শিল্প মালিক ও বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশন নেতারা। বৈঠকে মাদার ভেসেল থেকে ডব্লিউটিসির মাধ্যমে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাসের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরা হয়। আমদানিকারকরা বলেন, কোনো মালিকের জাহাজ কী কার্গো লোড করবে তার জন্য ডব্লিউটিসি ও মালিকরাই যথেষ্ট। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কারও পক্ষ নেওয়ার দরকার নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদার ভেসেলের জন্য ডব্লিউটিসি থেকে ভাড়া করা জাহাজে নানা সমস্যা। ভাড়া বেশি হলেও লাইটার জাহাজগুলো ত্রুটিপূর্ণ, মানহীন ও নেই বীমা। জাহাজের মাস্টার ও নাবিকরা কার্গো চুরিতে যুক্ত। এসব নিয়ে অভিযোগ করার পরও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। জাহাজের ডিবি ট্যাংকের কোনো সাউন্ডিং পাইপ না থাকায় জাহাজের কার্গো সঠিকভাবে পরিমাপ করা যায় না; বিধায় কার্গো অথবা ব্যালাস্ট ওয়াটার ডিবি ট্যাংকে স্থানান্তর করে কার্গো চুরি সহজ হয়।

আমদানিকারকরা বলছেন, লাইটার জাহাজ চাওয়া হলে যথাসময়ে পাওয়া যায় না। ডব্লিউটিসির অনীহার কারণে মাদার ভেসেলকে বসিয়ে রেখে খোয়াতে হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। এতে বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। আমদানি ব্যয় বাড়ায় চাপ পড়ছে ভোক্তার ওপর।

নদীপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনতে জাহাজ মালিকদের সংগঠনগুলো ২০০৩ সালে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি) গঠন করে। পণ্য পরিবহনে ডব্লিউটিসি থেকে লাইটার জাহাজ ভাড়া নিতে হতো। ২০১৩ সালে লাইটার জাহাজের চরম সংকটের সময় একটি জাহাজ বরাদ্দ পেতে এক মাসের বেশি সময় অপেক্ষায় থাকতে হয়েছিল। ঠিকমতো লাইটার জাহাজ বরাদ্দ না পেয়ে পণ্য পরিবহনে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে দেশের বড় শিল্প গ্রুপগুলো। তখন অন্তত ২৫ শিল্প মালিক নিজেদের বিনিয়োগে ছোট জাহাজ তৈরি করেন। একেকটি জাহাজ তৈরিতে খরচ হয় ১০ কোটি টাকার বেশি। তখন থেকেই নিজেদের জাহাজেই নিজেদের পণ্য পরিবহন শুরু করেন জাহাজ মালিকরা।

ডব্লিউটিসির ছাড়পত্র ছাড়া মালামাল পরিবহন করা যাবে নাÑ মর্মে সার্কুলার জারি হওয়ায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে লাইটার জাহাজ বানিয়েও পণ্য আনতে বাধা পাচ্ছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। এ অবস্থায় ডব্লিউটিসির ছাড়পত্র ছাড়া লাইটার জাহাজে পণ্য খালাস না করার আদেশ বাতিল করতে সম্প্রতি নৌপরিবহন অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ) মহাপরিচালক বরাবর পাঠানো ওই চিঠিতে বলেছে, ‘ডব্লিউটিসির অদক্ষতা ও উপকূল বাণিজ্যে জ্ঞানের অভাবে তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে লাইটার জাহাজের মাস্টারদের ওপর ডব্লিউটিসির কোনো কর্তৃত্ব নেই। জ্ঞানের অভাবে গন্তব্যে পণ্য পৌঁছাতে সাপ্লাই চেইন বাধা পাচ্ছে। বাড়তি ব্যয়ের কারণে স্থানীয় বাজারে পণ্যের বেশি দাম পড়ছে। আমদানিকারকরাও ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বৈদেশিক মুদ্রায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। অনিয়মের কারণে ডব্লিউটিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

দেশের বড় ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলেন, ‘লাইটার জাহাজ বরাদ্দ পেতে ভয়ানক সংকটের সময় বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছিলাম। তখন বাধ্য হয়ে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে লাইটার জাহাজ কেনা হয়। এসব জাহাজে নিজেদের পণ্যই পরিবহন করি। কিন্তু কয়েক দিন ধরে যা করা হচ্ছে তাতে আমাদের পক্ষে আর পণ্য পরিবহন চালু রাখা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় আছি। পদে পদে হয়রানি করা হলে যথাসময়ে নির্ধারিত গন্তব্যে ভোগ্যপণ্য পৌঁছানো সম্ভব হবে না। এতে দেশব্যাপী পণ্য পরিবহনের সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের এক জাহাজ মালিক বলেন, ‘গতকাল কর্ণফুলী নদীর ১৫ নম্বর ঘাটে গিয়ে একদল লোক লাটিসোঁটা নিয়ে জাহাজকর্মীদের হুমকি-ধামকি দিয়েছে। জাহাজে উঠে ডব্লিউটিসির ছাড়পত্র চেয়েছে; গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়েছে। এটা হতে পারে না। এটাকে আমি বলব নৈরাজ্য। সরকার যদি সিদ্ধান্ত নেয় ডব্লিউটিসির সিরিয়ালেই সব ছোট জাহাজ চলবে, তাহলে আলোচনার মাধ্যমে সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে।’

একাধিক জাহাজ মালিক বলছেন, ডব্লিউটিসির শীর্ষ নেতারা জাহাজের সিরিয়াল না মেনে নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী পণ্য পরিবহন করেন। করোনাকালে সাধারণ জাহাজ মালিকরা কোনো ট্রিপ না পেয়ে অলস বসে থাকলেও নেতারা ঠিকই পণ্য পরিবহন করে আয় করেছেন। কই তখনো তারা তো সিরিয়াল নেননি। আগে নেতাদের জাহাজ সিরিয়ালে আনেন; তারপরই শৃঙ্খলা ফিরবে।’

এ প্রসঙ্গে প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, ‘পণ্য পরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের প্রয়োজন আছে; কিন্তু নীতিমালা ঠিক করে প্রতিষ্ঠানটি সব স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণে পরিচালনা করতে হবে। একপক্ষীয়ভাবে ঠিক করা উচিত নয়। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে আমরা শিল্প মালিকরা ইতিমধ্যে বৈঠক করেছি। এতে তিনি বিষয়টির যৌক্তিকতা বুঝতে পেরেছেন। আশা করছি, ইতিবাচক কিছু হবে এবং সমাধান আসবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত