রাজধানীর উত্তরা ও মিরপুরে র্যাব অভিযান চালিয়ে রিজেন্ট হাসপাতালের দুটি শাখা সিলগালা করার পর সেগুলো অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কভিড-১৯ পরীক্ষা না করেই মনগড়া রিপোর্ট দেওয়ায় এবং মেয়াদপূর্তির পরও লাইসেন্স নবায়ন না করায় এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে গতকাল মঙ্গলবার অধিদপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। এর আগে গত সোমবার বিকেল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত হাসপাতালের শাখা দুটিতে অভিযান চালায় র্যাব।
অভিযান সংশ্লিষ্ট র্যাবের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযানে আটজন কর্মচারীকে আটক করা হয়। করোনা টেস্ট না করে সার্টিফিকেট প্রদানসহ বিভিন্ন অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় গতকাল রাতে মামলা করেছে র্যাব। রিজেন্টের মালিক শাহেদ করিমসহ ৯ জনকে পলাতক হিসেবে এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আটক আটজনকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মিরপুর মডেল থানায় আরেকটি মামলার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরি রেগুলেশন অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ওই হাসপাতালের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলো। অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও আরটি-পিসিআর পরীক্ষার নামে ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া, তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও লাইসেন্স নবায়ন না করাসহ আরও অনেক অনিয়মে প্রতিষ্ঠানটি জড়িত বলে প্রমাণিত হয়েছে।’ করোনা সংক্রামণ শুরুর পরপরই গত মার্চে হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশ
রিজেন্ট হাসপাতালকে কভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর প্রতিবাদ জানান উত্তরায় হাসপাতালটির বাসিন্দারা। পরে কভিড-১৯ নমুনা পরীক্ষার জাল সনদ তৈরি ও বিক্রির অভিযোগ পেয়ে সোমবার উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতাল ও রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালায় র্যাব। সেখানে অনুমোদনহীন টেস্ট কিট ও বেশকিছু ভুয়া রিপোর্ট পাওয়ার পর ওই হাসপাতাল এবং রিজেন্ট গ্রুপের কার্যালয় সিলগালা করে দেওয়া হয়। রাতে আলাদা অভিযানে হাসপাতালটির মিরপুর শাখাও সিলগালা করে দেওয়া হয়।
অভিযান শেষে র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিজেন্ট হাসপাতাল যে পরিমাণ পরীক্ষা বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে করিয়েছে, তার প্রায় তিন গুণ বেশি নমুনা সংগ্রহ করলেও পরীক্ষা না করেই ইচ্ছামতো প্রতিবেদন দিয়েছে। এভাবে তারা ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। অবস্থা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ৪ থেকে ৫ হাজার মানুষকে ভুয়া প্রতিবেদন দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি, যা বড় ধরনের ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে নমুনা সংগ্রহে নামা জেকেজি হেলথ কেয়ার নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ভুয়া কভিড-১৯ সনদ দেওয়ার ঘটনা সম্প্রতি পুলিশ ফাঁস করার পর রিজেন্টে অভিযানে গেল র্যাব। র্যাবের মিডিয়া উইংয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক এএসপি সুজয় সরকার বলেন, হাসপাতালটির বিরুদ্ধে করোনাভাইরাস পরীক্ষা না করেই প্রতিবেদন দেওয়া, অব্যবস্থাপনা, আবাসিক এলাকায় হাসপাতাল গড়ে তোলা, অনুমোদনের মেয়াদ দীর্ঘদিন আগে শেষ হয়ে যওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতেই তারা অভিযান চালান।
র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আরও বলেন, অভিযানের আগে তার কাছে ১৪টি করোনাভাইরাস পরীক্ষার প্রতিবেদন আসে, যেগুলো ভুয়া বলে নিশ্চিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে যে সিরিয়াল নাম্বার আছে, সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এগুলো ভুয়া। অভিযানকালে এমন আরও ২৮টি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। যার সবই ভুয়া প্রতিবেদন। এরা ইচ্ছেমতো নিজেরাই তৈরি করেছে।’ তিনি বলেন, সরকারিভাবে যেসব সনদ ফ্রি পাওয়ার কথা সেই নিয়ম অনুসরণ না করে রিজেন্ট ৪ হাজার ২০০ জনের নমুনা পরীক্ষা করে মনগড়া সনদ দিয়ে ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এসব মিলিয়ে এবং বাকি স্যাম্পল কালেকশন করে পরীক্ষা না করে মোট প্রায় ৩ কোটি টাকা আয় করে তারা। অবস্থাদৃষ্টে দেখা যায় চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষকে তারা ভুয়া প্রতিবেদন দিয়েছে।
র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ‘বেশকিছু দিন ধরে র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিট বিষয়টি নজরে রাখছিল। তা বুঝতে পেরে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ তাদের বেশকিছু স্টাফদের কাছ থেকে দুই মাস আগের পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে রাখে। আত্মরক্ষার জন্য এই কৌশল নেয় তারা। স্টাফদের অনেকেই এই অভিযোগ করেছেন।’
মধ্যরাতে অভিযান শেষে র্যাব-১ এর কর্মকর্তা এএসপি মোর্শেদুল ইসলাম বলেন, এই অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালত কোনো শাস্তি দেয়নি। মনগড়া রিপোর্ট দেওয়ায় থানায় দুটি মামলা করা হবে মালিক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। রিজেন্ট থেকে আটজন কর্মচারীকে আটক করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এরা মালিকের নির্দেশে ভুয়া প্রতিবেদন তৈরি করত। মামলায় তাদেরও আসামি করা হবে। অভিযান শুরুর পর থেকে মালিকপক্ষের লোকজন পালিয়ে গেছে। যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র্যাব কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে।’
