কভিড-১৯ এর প্রভাবে বড় রকমের ধাক্কা লেগেছে দেশের সৃজনশীল বইয়ের বাজারে। রাজধানীর কাঁটাবনের কনকর্ড টাওয়ার, শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের বইয়ের দোকানগুলোতে নেই বই বিক্রি। চেইন বুকশপ বাতিঘর, ধানম-ির বেঙ্গল বই নামের বুক ক্যাফেও নেই বললে চলে বইপ্রেমীদের আনাগোনা।
চলতি সপ্তাহে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, টানা দুই মাস বন্ধ থাকার পর জুন মাস থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান খোলা রাখা হলেও নেই বিক্রি। কেউ কেউ দোকান ছেড়ে দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন। আবার কেউ অনলাইনে বই বিক্রি শুরু করেছেন।
গত জুন মাসে ‘দীপনপুর’ এবং ‘কবিতা ক্যাফে’ নামের দুটি বুকশপ ক্যাফে লোকসান গুনতে না পেরে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে চলতি সপ্তাহে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে প্রতিষ্ঠান দুটি।
‘দীপনপুর’ বন্ধ ঘোষণার খবর ১৩ জুন এবং ‘কবিতা ক্যাফে’ বন্ধ ঘোষণার খবর ১৭ জুন প্রথম প্রকাশ করেছিল দেশ রূপান্তর। পরে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমেও খবরটি প্রকাশ হয়। এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে অনেকেই দীপনপুর এবং কবিতা ক্যাফে যেন বন্ধ না হয়, তার দাবি জানিয়ে স্ট্যাটাস লিখেন। কেউ কেউ গণ-অর্থায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান দুটির পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। এরই প্রেক্ষিতে সম্প্রতি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এই দুটি বুকশপকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছে। এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন (আইপিএ) থেকে দীপনপুরকে আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এক লাখ টাকা করে দুটি প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দেওয়া হয়েছে, ভ্যাট-ট্যাক্স কেটে সেখান থেকে ৮৫ হাজার টাকা করে পাওয়া যাবে। এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন (আইপিএ) থেকে ১ হাজার ডলার দেওয়া হয়েছে দীপনপুরকে। সেখান থেকে ৯০ হাজার টাকার মতো পাবে দীপনপুর। এছাড়া ব্যক্তি উদ্যোগেও অনেকেই সাহস জোগানোর চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠান দুটির স্বত্বাধিকারী।
দীপনপুরের স্বত্বাধিকারী রাজিয়া রহমান জলি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীপনপুর বন্ধ হওয়ার খবর শোনার পর অনেকেরই মন খারাপ হয়েছে। গণ-অর্থায়নের মাধ্যমে দীপনপুরকে টিকিয়ে রাখার জন্য কেউ কেউ চেষ্টাও করছেন। এটা দেখেই মূলত আমরা উৎসাহ পাচ্ছি। তাই এখনই বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবছি না। আরও কিছুদিন লড়াই করার শক্তি পাচ্ছি। এখনই হাল ছেড়ে দিতে চাই না। দীপনপুর তো আমাদের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান। এটা অন্য সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মতো না। এখানে দীপনের স্বপ্ন, আমাদের স্বপ্ন জড়িয়ে আছে। আরও কয়েক মাস আমরা টিকে থাকার লড়াই করব।’
একই রকম কথা জানালেন কবিতা ক্যাফের স্বত্বাধিকারী নাহিদা আশরাফী। তিনি দেশ রূপান্তরের কাছে খবর প্রকাশের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘কবিতা ক্যাফে বন্ধের খবর দেশ রূপান্তরে আসার পর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে এক লাখ টাকার প্রণোদনা দিয়েছে। এছাড়া কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করার আশ^াস দিয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রণোদনা গ্রহণ করেছি। কিন্তু ব্যক্তিগত সহযোগিতা গ্রহণ করার ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি। এখন টিকে থাকার জন্য কিছুটা সাহস পাচ্ছি। তাই আপাতত, কবিতা ক্যাফে বন্ধ হচ্ছে না।’
এদিকে করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউন শুরুর পর থেকেই হোম ডেলিভারি চালু করেছে চেইন বুকশপ বাতিঘর। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী দীপঙ্কর দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লকডাউন শুরু হওয়ার পর আমরা হোম ডেলিভারি সার্ভিস চালু করেছি। সেখানে ভালো সাড়া পেয়েছি। এখন বাতিঘর থেকে একটা ওয়েবসাইট তৈরির কাজ করছি। সেখান থেকে নিয়মিত বাসায় বসেই যেন আমাদের বই পেতে পারেন, সেই চেষ্টা করছি।’
বই বিপণনের ক্ষেত্রে সারা দেশে চেইন বুক শপ জরুরি উল্লেখ করে দীপঙ্কর দাস বলেন, ‘বইয়ের বাজারকে ছড়িয়ে দিতে শপিং মল, বাস কিংবা রেল স্টেশন, বিমানবন্দরগুলোতে বইয়ের দোকান রাখা বাধ্যতামূলক করা উচিত। প্রতিটি জেলা শহরে সরকারিভাবে একটি মার্কেট থাকা উচিত, যেখানে কম ভাড়াতে বইয়ের দোকান করা যাবে। পাশাপাশি সকল শপিং মলে কম ভাড়াতে একটা বইয়ের দোকান করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। তবেই সারা দেশে বইয়ের ক্রেতা বাড়বে।’
কাঁটাবনের কনকর্ড টাওয়ারে রয়েছে বেশ কয়েকটি সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থার বই বিপণন কেন্দ্র। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অনুপ্রাণন প্রকাশন, উজান, আবিষ্কার, নির্বাচিত বই বিপণন প্রতিষ্ঠান, প্রকৃতি, কবি প্রকাশনী, আদর্শ, সংহতি, গণপ্রকাশন, আলোঘর, সাতকাহনসহ বেশ কয়েকটি দোকানে জুন মাসে তেমন বিক্রি হয়নি বই।
আবিষ্কার প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক সুমি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মার্চ থেকে মে তো বন্ধই ছিল, জুনের ১ তারিখে শো রুম খোলা হয়েছে। পুরো এক মাসে একটাও বই বিক্রি হয়নি দোকান থেকে। তবে অনলাইন প্লাটফর্ম রকমারির মাধ্যমে কয়েকটা বই বিক্রি হয়েছে। বাংলাবাজারে এবং কনকর্ডে আমাদের দুটি শো-রুম ছিল। এখন বাংলাবাজারের শো-রুম ছেড়ে দিয়েছি। লোকসান দিয়ে কনকর্ডের দোকানটা কোনোমতে চালাচ্ছি।’
ঐতিহ্য প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক লাবলু বলেন, ‘এখন লোকজন বই কিনতে দোকানে আসে কম। অনেকেই অনলাইনে বই কেনেন।’ বই বিক্রেতারা এখন অনলাইনের দিকে ঝুঁকছেন। দীপনপুর, কবিতা ক্যাফে, বাতিঘরের সঙ্গে কথা বলেও জানা গেছে তারা এরই মধ্যে অনলাইনে বই বিক্রির দিকেই ঝুঁকছেন। পাশাপাশি রকমারি ডটকম, বইঘরসহ বেশ কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বই বিপণনের কাজ করছে। এভাবেই করপোরেট বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টিকে থাকার লড়াই করছে দেশের সৃজনশীল বইয়ের বাজার।
