পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংঘাত থামছে না। বছরের পর বছর ধরে বিবদমান সশস্ত্র রাজনৈতিক গ্রুপগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার আর প্রতিপক্ষের ওপর হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে চলেছে। এসব সশস্ত্র সংঘাতে বহু প্রাণহানিও ঘটছে। কিন্তু এসব সংঘাত থামানোর কোনো উদ্যোগই যেন কাজে আসছে না। রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর এসব ঘটনার বিচারও হচ্ছে না। আর এসব কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতিরও পরিবর্তন হচ্ছে না। অথচ আশা করা হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির মধ্য দিয়ে পাহাড়ে সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটবে। খেয়াল করা দরকার যে, দীর্ঘ সশস্ত্র লড়াইয়ের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলে থাকেন শান্তিচুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়াটাই পাহাড়ে এখনো অশান্তির অন্যতম প্রধান কারণ। পাহাড়ের রাজনৈতিক গ্রুপগুলোও শান্তিচুক্তির পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি করে আসছে। কিন্তু এসব গ্রুপই দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে পাহাড়ে খুনোখুনি ও সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।
মঙ্গলবার বান্দরবানে সশস্ত্র হামলায় ছয় জনের মৃত্যুর ঘটনায় পাহাড়ে সংঘাতের বিষয়টি আবারও সামনে এলো। বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘বান্দরবানে জেএসএস সংস্কার পক্ষের জেলা সভাপতিসহ নিহত ৬’ শিরোনামে বান্দরবানে সংঘাতের খবর প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গুলি চালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সংস্কারপন্থি অংশের ছয় নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে সদর উপজেলার রাজবিলা ইউনিয়নের বাজারপাড়া এলাকায় ওই হামলার ঘটনা ঘটে। যেখানে হামলা হয়েছে, সেটি জেএসএস’র সংস্কারপন্থি অংশের বান্দরবান জেলা কমিটির সভাপতি রতন সেন তঞ্চঙ্গ্যার বাড়ি। ৫৫ বছর বয়সী রতন নিজেও এ ঘটনায় নিহত হয়েছেন। একই হামলায় আহত হয়েছেন আরও ৩ জন। এদের মধ্যে একজন জানিয়েছেন, জেএসএস (সন্তু লারমা) গ্রুপের সদস্যরা তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। নিহতরা সবাই আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল জেএসএস’র ‘এম এন লারমা’ বা সংস্কারপন্থি অংশ হিসেবে পরিচিত। বান্দরবানের পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, তদন্তের পর সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ, সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা বাঘমারার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন জনসংহতি সমিতি (সন্তু লারমা), জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) এবং মগ লিবারেশন পার্টি (এমএলপি)-এর ত্রিমুখী বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত ‘জেএসএস- এম এন লারমা’ গ্রুপের কর্মীরা এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। সমাবেশে গণতান্ত্রিক-ইউপিডিএফের সহযোগী সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতারাও বক্তব্য রাখেন। সমাবেশে ওই হামলার ঘটনায় সন্তু লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে (জেএসএস- সন্তু লারমা) দায়ী করে নিন্দা জানান বক্তারা। তবে, সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস-এর কোনো প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। উল্লেখ্য যে, ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জেএসএস থেকে জ্যেষ্ঠ কিছু নেতা বের হয়ে ‘জেএসএস- এম এন লারমা’ গ্রুপটি গঠন করেন। আর ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে তৈরি হয়েছিল ইউপিডিএফের। সম্প্রতি সেটা ভেঙে গঠিত হয়েছে নতুন গ্রুপ ‘ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক’। এসব সশস্ত্র সংঘাতের কারণে পাহাড়ে স্থিতিশীলতা আসছে না। ফলে রাজনৈতিকভাবেও পাহাড়ের পরিস্থিতির বদল ঘটছে না।
বহুল আলোচিত পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তি অনুসারে চুক্তি স্বাক্ষরের পরের বছরই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত হয়েছে। চুক্তি অনুসারে পাহাড়ের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনও গঠিত হয়েছে। শান্তিচুক্তির পরের বছরই গঠিত হয়েছে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার আঞ্চলিক পরিষদ। কিন্তু তারপর থেকে গত দুই দশকে এসব পরিষদে একবারেরও জন্য হলেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। শুরুতে যারা ছিলেন তারাই এখনো এসব পরিষদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশনেরও উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে হতাশা থেকেই পাহাড়ি সংগঠনগুলো বারবার ভেঙে নতুন নতুন সংগঠন তৈরি হচ্ছে এবং তারা পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত রয়েছে। কিন্তু লক্ষ করা দরকার এসব দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ঘটনায় তিন পার্বত্য জেলার কাক্সিক্ষত উন্নয়নের বিষয়টি সেভাবে আলোচনায় আসছে না। ভৌগোলিকভাবে দুর্গম বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধাতেও অনেক পিছিয়ে আছে। পাশাপাশি, সেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও অনেকটা স্থবির। রাজনৈতিক গ্রুপগুলোর অবশ্যই স্থানীয় উন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগণের অধিকার রক্ষায় মনোনিবেশ করা উচিত। এটা মনে রাখা জরুরি যে, রাজনৈতিক পথেই রাজনৈতিক অধিকার আদায় করার সর্বোত্তম উপায়, সশস্ত্র সংঘাত নয়। আর সরকারকেও অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণে আন্তরিক হতে হবে।
