চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি চালের উৎপাদন হয়েছে গত এক বছরে। এ পরিস্থিতিতে কৃষক যাতে ধানের ন্যায্য দাম পান, সে জন্য গত ৩০ জানুয়ারি চাল রপ্তানিতে ১৫ শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা করে সরকার। আগামী আউশ মৌসুমেও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে। এরই মধ্যে আবার চাল আমদানির জন্য শুল্ক কমানোর নীতিগত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। সরকারের আমদানি-রপ্তানির এই টানপড়েনের মধ্যেই কয়েক মাস ধরে বাজারে চড়ছে চালের দাম। কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে যে পরিমাণ চাল উৎপাদন হয়েছে তাতে আমদানি হলে বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে কৃষকের ন্যায্য দাম পাওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চালের আমদানির প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নাসিরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে চালের যে উৎপাদন হয়েছে তা চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। সামনে আউশের আবাদও ভালো হবে বলে আশা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে চাল আমদানি করা হলে বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই আমি মনে করি, চাল আমদানি করার কোনো প্রয়োজন নেই; বরং বাজারে যাতে কেউ সিন্ডিকেট করতে না পারে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।’
দেশে বার্ষিক চালের চাহিদা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী মাথাপিছু ১৫২ কেজি চালের প্রয়োজন। তাদের হিসাবে ২০১৯ সালে দেশে বসবাসকারী মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫৫ লাখ। প্রায় ১ কোটি প্রবাসী এই হিসাবের বাইরে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, বিদেশিসহ বর্তমানে দেশে প্রায় ১৭ কোটি লোক বাস করে। সেই হিসাবে দেশে মোট বার্ষিক চালের চাহিদা প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ টন। অন্যদিকে চালকল মালিকরা বলছেন, দেশে এই মুহূর্তে জনসংখ্যা বিদেশিসহ প্রায় ২০ কোটি। সেই হিসাবে দেশে বার্ষিক চালের চাহিদা প্রায় ৩ কোটি টন। আর এই বিশাল চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন আরও বেশি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার বোরো আবাদ হয়েছে ২ কোটি ২ লাখ টন ও আমনের আবাদ হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টন। এ ছাড়া আউশ উৎপাদন হয়েছিল ৩০ লাখ ১২ হাজার টন। সব মিলিয়ে দেশে গত এক বছরে ৩ কোটি ৮২ লাখ টনেরও বেশি চাল উৎপাদন হয়। সরকারের উৎপাদন হিসাব ও মিল মালিকদের চাহিদার হিসাব ধরলেও এ বছর অন্তত ৮০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। তবে খাদ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এর পরিমাণ ৩০ লাখ টনের বেশি।
দেশে চালের উৎপাদন যখন এত বেশি, তখন আমদানি কেন? এমন প্রশ্ন উঠেছে খোদ কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে সর্বস্তরে। অনেকেই মনে করছেন, চাহিদার বেশি চাল থাকার পরেও আমদানি করা হলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে খাদ্য মন্ত্রণালয় বলছে ভিন্ন কথা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, চালের উৎপাদন ভালো হয়েছে। কৃষক ভালো দামও পেয়েছেন। এখন সেই চাল নিয়ে মিল মালিকরা চালবাজি করছেন। তারা বাজারকে অস্থিতিশীল করছেন। তারা সরকারকেও চাল দিচ্ছেন না। মূলত বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্যই চাল আমদানির পক্ষে সরকার।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চাল রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছিলাম কৃষক যাতে ন্যায্য দাম পান এ জন্য। কৃষক তার ন্যায্য দাম পেয়েছেন। কিন্তু বাজারে চালের দাম অস্থিতিশীল করে রেখেছে একটি অসাধু চক্র। সরকারি গুদাম এখন পর্যন্ত এক লাখ টন চালও কিনতে পারেনি। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি গুদামে চাল কিনতে আমদানিকৃত চালের শুল্ক কমানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
রপ্তানিতে প্রণোদনা দিয়ে আবার আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া স্ববিরোধী কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা কিন্তু তখন কৃষকের কথা ভেবে প্রণোদনা ঘোষণা করেছিলাম। কৃষক তার দাম পেয়েছেন। এখন বাজারে দাম অনেক বাড়তি, আমাদের গুদামেও চাল নেই। গুদাম তো ভরতে হবে। তাই জনগণের কথা ভেবে আমরা আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা মনে করি, এতে কৃষকের কোনো ক্ষতি হবে না। তবে মিল মালিকরা দাম কমালে এবং আমাদের চাল দিলে আমদানি করার প্রয়োজন হবে না।’
খাদ্য মন্ত্রণালয় যখন চাল না পাওয়ার অজুহাতে আমদানি করতে চাচ্ছে, তখন মিল মালিকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের বক্তব্য, সরকার ধানের দাম যে হারে নির্ধারণ করে দিয়েছে, সে অনুযায়ী চালের দাম দিচ্ছে না। এ জন্য সরকার চালও কিনছে না। সরকার নির্ধারিত ৩৬ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি করলে মিলারদের কেজিপ্রতি ৪ টাকা লোকসান হবে।
তারা আরও বলছেন, সরকার যদি তার প্রয়োজনীয় পরিমাণ চাল আমদানি করতে চায় তাহলে বাজারে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। কিন্তু যদি সরকার বেসরকারিভাবে চাল আমদানির অনুমোদন দেয় তাহলে বাজারে চাহিদার অনেক বেশি পরিমাণে চাল ঢুকবে। এতে করে বাজারে দাম অতিরিক্ত হারে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনটি হলে আগামী আউশ মৌসুমে কৃষক ধানের ন্যায্য মূল্য হারাবেন।
বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তো আর সরকারকে লোকসান দিয়ে চাল দেব না। সরকার আমাদের ধান দিক, আমরা চাল দেব। আর যদি আমদানি করেই, তবে সেটা অবশ্যই সরকারিভাবে করতে হবে। নইলে এই করোনাকালে কৃষক মরে যাবে।’
