হতাশায় ৩০ হাজার শ্রমিক

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২০, ০৬:২৭ এএম

করোনাকালে চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছে খুলনা নগরীর খালিশপুর শিল্পাঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক। হঠাৎই চাকরি হারানোর বেদনা-হতাশার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সম্প্রতি দুই শ্রমিক নেতাকে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার পর সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে গ্রেপ্তার আতঙ্ক। দুশ্চিন্তা আর অজানা আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে তাদের। এ পরিস্থিতিতে নিজেদের নিরাপদ রাখতে অনেক শ্রমিক পরিবার নগর ছেড়ে গ্রামে পাড়ি জমাচ্ছে। সব মিলিয়ে খালিশপুর শিল্পাঞ্চল যেন পরিণত হয়েছে এক ভুতুড়ে নগরীতে।

গত কয়েক দিন খালিশপুর শিল্পাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে শ্রমিকদের চিরচেনা পদচারণা নেই। সাইরেনের শব্দও শোনা যাচ্ছে না। থেমে গেছে কোলাহল। মিলগেটগুলোর সামনে বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন শ্রমিকরা। তাদের চোখেমুখে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে চাকরি হারানোর বেদনা, বেতন না পাওয়ার হতাশা ও গ্রেপ্তার আতঙ্ক। গত মঙ্গলবার প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলের ফটকে নাজমুল, রবিউল, রিপন, মেহেদী, জহির, বাবু ও শফিকুলসহ ৮-১০ জন হতাশ হয়ে বসে ছিলেন। তারা এই মিলে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে চাকরি করতেন। এখন চাকরি হারিয়ে অনিশ্চিত অবস্থায় পড়েছেন। হতাশার সুরে তারা বলেন, কী করবেন, কোথায় যাবেন তার কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না।

শ্রমিক নেতারা জানায়, খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি জুট মিলে বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক রয়েছে। এসব শ্রমিকের ১২ থেকে ১৫ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। মিলের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরও দুই মাসের বেতন বকেয়া। এ অবস্থায় গত ২ জুলাই রাতে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) নিয়ন্ত্রণাধীন খুলনাঞ্চলের ৯টিসহ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল আপাতত বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে শ্রমিকদের অবসায়নের (অব্যাহতি) সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

এদিকে মিল বন্ধের সিদ্ধান্তের পর শ্রমিকরা কোনোভাবেই যেন তাদের দাবি আদায়ে সংগঠিত বা রাস্তায় না নামতে পারে সেজন্য সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাজনৈতিক চাপও দেওয়া হচ্ছে কম-বেশি। এমন পরিস্থিতিতে গত ৫ জুলাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে বাড়ি থেকে গভীর রাতে ইস্টার্ন জুট মিলের শ্রমিক ও পাটশিল্প রক্ষা যুব জোটের আহ্বায়ক অলিয়ার রহমান এবং প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলের শ্রমিক ও পাটশিল্প রক্ষা যুব জোটের উপদেষ্টা নূর ইসলামকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। ২০ ঘণ্টা পর  তাদের পুরনো এক মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ওই দুই শ্রমিক নেতাকে আটকের পর থেকে শ্রমিকদের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ বিষয়ে মুখ খুলতেও ভয় পাচ্ছে শ্রমিকরা। এমন গুমোট পরিস্থিতিতে অনেক শ্রমিক মিল এলাকা ত্যাগ করে পরিবারসহ গ্রামের বাড়ি চলে যাচ্ছেন।

প্লাটিনাম জুট মিলের নিরাপত্তা বিভাগের কর্মী ছিলেন আবদুল জলিল। ২০১৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর অবসরে গেলেও এখনো বেতন আর গ্র্যাচুইটির টাকা না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন। তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে। আজও মজুরি আর গ্র্যাচুইটির টাকা পাইনি।’

ক্রিসেন্ট জুট মিলের অস্থায়ী শ্রমিক শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার চাকরির বয়স ৮ বছর। আমি কাজ হারালে কী করব। পাটকলে ছাড়া অন্য কাজ করিনি কখনো। আমার পরিবারে ছেলেমেয়ে মা-বাবা নিয়ে ৭ জন সদস্য। এই সাতজন মানুষের খাবার, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ কীভাবে জোটাব তা নিয়ে চিন্তায় হাবুডুবু খাচ্ছি।’

পাটশিল্প রক্ষা যুব জোটের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সমসেদ আলম শামশের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূলত বিজেএমসির ও মন্ত্রণালয়ের কিছু দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তার পাতা ফাঁদে এই সরকার পা দিয়েছে। করোনাকালে মিলগুলো বন্ধ করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে সরকার। যেদিন মিলগুলো বন্ধের ঘোষণা হয়েছে সেই দিন ৭০ হাজার শ্রমিক পরিবারের চোখের জলে মিলের মাটি ভিজে গেছে। সরকার যদি ওই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বাদ দিত তাহলে শ্রমিক ও মিল দুটোই  বাঁচত।’

এই শ্রমিক নেতা আরও বলেন, ‘মিল বন্ধ করতে গিয়ে সরকার রাষ্ট্রের সব বাহিনীকে ব্যবহার করছে। মিলের সার্বিক বিষয় কীভাবে তুলে ধরা যায় সেই বিষয়ে যেদিন সভা করলাম সেই রাতে আমাদের দুই নেতাকে রাতের আঁধারে সাদা পোশাকে তুলে নেওয়া হলো। অনেক নাটক করে একটি মিথ্যা মামলায় তাদের জেলে পাঠানো হলো। এখন পুলিশ, গোয়েন্দা, এনএসআইসহ বিভিন্ন বাহিনীর লোক শ্রমিকদের শুনিয়ে শুনিয়ে হুমকি দিয়ে বলছেÑ কেউ যদি দাবি আদায়ে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে তাদেরও গ্রেপ্তারসহ গুম করা হবে। শ্রমিকরা এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।’

গণসংহতি আন্দোলন খুলনা জেলা শাখার আহ্বায়ক মুনীর চৌধুরী সোহেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই দুঃসময়ে সরকার ৫০ হাজার শ্রমিককে কর্মহীন করে নিষ্ঠুর খেলায় মেতেছে। সরকার বলছে বছরে এই খাত থেকে ২০০ কোটি লোকসান হচ্ছে। তাহলে ৪৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ মওকুফ কার স্বার্থে। শ্রমিকরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোল গড়ে তুলতে গেলেই পুলিশ সন্ত্রাসী কায়দায় দুই শ্রমিক নেতাকে গভীর রাতে তুলে নিয়ে যায়। এটা শ্রমিকদের বাক স্বাধীনতা হরণের একটি জ্বলন্ত প্রামাণ।’

শ্রমিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে খুলনা মহানগর পুলিশ কমিশনার খন্দকার লুৎফুল কবির বলেন, ‘প্রশাসন থেকে কোনো হুমকি দেওয়া হচ্ছে না। কারণ পাটকল বন্ধ হয়েছে দিবালোকের মতো সত্য। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনকে তো কাজ করতেই হবে। এরকম কোনো অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট থানায় জানালে আমরা পদক্ষেপ নেব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত