১৯৯৭ সালে গৃহীত কিয়োটো প্রটোকলের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সেক্টরে পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমানোর জন্য বদ্ধপরিকর হয়। যার প্রথম পর্যায় ২০০৮ সাল থেকে শুরু হয় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য। তবে কিয়োটো প্রটোকল গৃহীত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কারখানার উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় এবং অনেক দেশের জন্য সেটি সমস্যার কারণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে স্থাপনা নির্মাণ কৌশল বিভিন্নভাবে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে যা অতীতেও প্রতীয়মান। করোনা মহামারীর সময়ে মাঠ পর্যায়ে বেশিরভাগ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে পারছে না। যার দরুন নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক মানবেতর জীবনযাপন করছে।
গত বছর দেশ রূপান্তরের চিন্তা পাতায় ‘নির্মাণ শ্রমিকের নিরাপত্তা এত অবহেলিত কেন’ শিরোনামে এ বিষয়ে লিখেছিলাম। সেখানে নির্মাণ শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয় নিয়ে বলেছিলাম। এই করোনা মহামারীর কালে সামাজিক নিরাপত্তায় নির্মাণ শ্রমিকের জন্য পেনশন স্কিম চালু করার বিষয় নিয়ে ইতিমধ্যে ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশ প্রস্তাবনা করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে এই সময়ে আমাদের নির্মাণ শিল্পকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে কীভাবে চলমান রাখা সম্ভব? গত এপ্রিলের পর থেকে শ্রমিকরা আবার মাঠ পর্যায়ে ধাপে ধাপে নির্মাণকাজ শুরু করে দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক্ষেত্রে তাদের কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হচ্ছে। আমরা অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের কথা উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি। অনেক ক্ষেত্রেই তারা রেসপন্সিবল কন্টাক্টচুয়াল নীতিমালা গ্রহণ করছে তাদের নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য। এমনকি পোশাক-পরিচ্ছদের কোড নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ চলছে। আমাদের দেশেও স্থাপনা নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজেদের প্রয়োজনে এবং অর্থনৈতিক মন্দা কাটানোর লক্ষ্যে নির্মাণ শিল্প শ্রমিকদের জন্য সহজেই গ্রহণযোগ্য হবে সে ধরনের স্বাস্থ্যবিধি অবলম্বন করতে পারে। সেই সঙ্গে নির্মাণশিল্পের ধরন কিংবা কৌশল নিয়ে আরও কীভাবে উন্নয়ন করা সম্ভব সেগুলো নিয়ে বিশেষ চিন্তা ভাবনা করতে পারে।
যেমন ‘অন-সাইট কনস্ট্রাকশন’ পরিচালনা করা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে। কারণ এক্ষেত্রে সংক্রমণ বাড়তে পারে। তাই অন্যান্য বিষয়ের মতো নির্মাণ শিল্পের করণ-কৌশল আধুনিকায়ন করা দরকার। এক্ষেত্রে ‘মডুলার কনস্ট্রাকশন সিস্টেম’ ব্যবহার করা যেতে পারে। তাছাড়া বিভিন্নভাবে ‘প্লাগ-ইন কনস্ট্রাকশন’ সিস্টেম দিন দিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এ ধরনের নির্মাণ প্রণালীতে আবাসন শিল্পের ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো নির্দিষ্ট একটি কারখানায় স্থাপনা নির্মাণের বিভিন্ন উপাদান ‘ফেব্রিকেশন’-এর মাধ্যমে তৈরি করতে পারে। সেক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সহজ হবে। স্থাপনা নির্মাণে যদি এমন একটি ফেব্রিকেটেড কিংবা প্লাগ-ইন কনস্ট্রাকশনের কারখানা গড়ে তোলা সম্ভব হয়, তাহলে সেটি একদিকে যেমন পরিবেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে, ঠিক তেমনি নির্মাণ জটিলতা কমিয়ে অল্পসময়ের মধ্যে স্থাপনা নির্মাণ আরও সহজতর হবে।
এই ধরনের মডুলেশন প্রযুক্তির সব থেকে বড় যে সুবিধা সেটা হচ্ছে, উপকরণের পরবর্তী বাজারমূল্য বজায় থাকবে এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলো খুব সহজে পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এমনকি পছন্দ অনুযায়ী নকশা পরিবর্তনের বিষয়টিও থাকবে, যা ক্রেতাদের আরও বেশি আকৃষ্ট করবে এবং নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করবে। বিষয়টি আরেকটু সহজভাবে বলা যাক। নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি নির্দিষ্ট কারখানা থাকবে শহর থেকে দূরে। যেখানে যে কোনো স্থাপনার দেয়াল, জানালা, ফ্লোরের অংশবিশেষসহ বিভিন্ন অংশ মডুলেশনের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট নকশার ভিত্তিতে তৈরি হবে। সেক্ষেত্রে ক্রেতা এবং নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক থাকবে এবং সাপ্লাই চেইনের ভিত্তিতে অন্যান্য নির্মাণের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো সংযুক্ত থাকবে। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের ডিজিটাল পদ্ধতিতে ট্রেনিং দেওয়া যেতে পারে। যার মাধ্যমে স্থপতি কিংবা প্রকৌশলীরা দূর থেকেও নির্মাণের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের সঙ্গে খুব সহজেই স্থাপনা নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে কনস্ট্রাকশন সাইটগুলোতে সরাসরি কাজের বদলে আমরা কোনো কারখানায় সেগুলো তৈরি করে একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্মাণ সাইটে সেগুলোকে সংযোজনের মাধ্যমে অনেক সমস্যা থেকে রক্ষা পেতে পারি।
স্থাপনা নির্মাণের তদারকিতে ডিজিটাল ম্যানেজমেন্ট এবং রিয়েল টাইম সিস্টেমস-এর প্রচলন করা যেতে পারে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, অতিদ্রুত হাসপাতাল নির্মাণ এবং ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আদতে মডুলার ও প্লাগ-ইন সিস্টেম ব্যবহার করে করা হয়েছে। এখন আমাদের দেশের নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে এসব বিষয় প্রয়োগ করা নিয়ে বিশদভাবে ভাববার সময় হয়েছে। পূর্বে প্রচলিত নির্মাণ উপকরণের ব্যবহার এবং নির্মাণকৌশলের পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কারণে নয় বরং পরিবেশগত কারণে। একই সঙ্গে মানসিক-সামাজিক অনেক বিষয় এর সঙ্গে জড়িত। এ জন্য দরকার সূক্ষ্ম নকশা প্রণয়ন ও ড্রয়িং এবং পেশাদারি উৎকর্ষ। এজন্য একটি পেশাদারি সাপ্লাই চেইন এবং অপারেশনাল মেকানিজম তৈরি করতে হবে। যেখানে অর্থনৈতিক নির্ণায়ক বিধিবদ্ধ থাকবে। কম খরচে কীভাবে নির্মাণকাজ সম্পাদন করা যায় সেটির পলিসি থাকবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রত্যেকটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে তাদের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণার ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে হবে। যারা তাদের সুনির্দিষ্ট স্থাপনা নির্মাণকল্পে নির্দিষ্ট ম্যানেজমেন্ট নিয়ে আরও গবেষণার মাধ্যমে সব থেকে বেশি সুযোগ-সুবিধা কীভাবে পাওয়া যায় সেটি খুঁজে বের করবে।
সরকারিভাবে বিভিন্ন স্থাপনার কার্বন নির্গমন মাত্রার একটি লক্ষ্য ঠিক করা জরুরি। এটা করা হলে পরিবেশগত বিপর্যয় এড়িয়ে স্থাপনা নির্মাণ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। আর এতে নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে। স্থাপনা নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখ লাখ শ্রমিক। যারা কাজের খোঁজে একসময় গ্রাম থেকে শহরে এসেছিল। যাদের ঘামে ভেজা কর্মঠ হাত এই শহরকে নতুন করে জীবন দান করেছে। কিন্তু এই মহামারীর প্রভাব স্থাপনা শিল্পের ওপর পড়েছে চরমভাবে। থমকে গেছে দেশীয় স্থাপনা নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো যারা আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক বড় অংশীদার।
লেখক : শিক্ষক ও স্থপতি। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণারত।
