অনলাইনে সদস্য সংগ্রহসহ তাদের জিহাদি কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধের কাজ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এবার শারীরিক উপস্থিতিতেও বৈঠকে মিলিত হচ্ছে দেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) বা আনসার আল ইসলামের সদস্যরা। দেশের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক ব্যক্তিকে হত্যার পরিকল্পনাও করছেন তারা। জঙ্গি কর্মকাণ্ড অনুসরণকারী কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে। তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, সাইবার স্পেসে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় এবিটির সদস্যরা। এতদিন অনলাইনে বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ ও অর্থ জোগাড়ের কাজ করে থাকলেও বর্তমানে তারা শারীরিক উপস্থিতির মাধ্যমেও বৈঠক করছেন। আর এসব বৈঠকে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা করছেন তারা।
ওই পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, দেশের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক ব্যক্তিকে হত্যার জন্য রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার একাধিক জায়গায় গোপনে সভা করেছেন এবিটির সদস্যরা। সভায় অংশগ্রহণকারী এবিটির সিøপার সেলের সদস্য মুহম্মদ ওয়ালী উল্লাহকে গ্রেপ্তারের পর চাঞ্চল্যকর এই তথ্য জানতে পেরেছে পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা জানান, গত শনিবার আদালতের মাধ্যমে এবিটির সক্রিয় সদস্য মুহম্মদ ওয়ালী উল্লাহকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদে হত্যা ও হামলা পরিকল্পনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন ওয়ালী উল্লাহ। তিনি বৈঠকে অংশ নেওয়া এবিটির সদস্যদের ছদ্মনামও জানিয়েছেন। এখন সেই তথ্যের ভিত্তিতে বাকি সদস্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এটিইউ-এর অর্গানাইজড ক্রাইমের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবিটির সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনে প্রপাগাণ্ডা পরিচালনা করে এলেও বর্তমানে তাদের বেশ কয়েকটি গ্রুপ ফিজিক্যালি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বৈঠকও করেছে। সেসব বৈঠকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক ব্যক্তিকে হত্যার পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সংগঠনটির হিটলিস্টে থাকা ব্যক্তিদের এ বিষয়ে অবহিত করে সতর্ক হয়ে চলাচলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থেই তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি জঙ্গিবাদ দমনে নিয়োজিত এই কর্মকর্তা।
তিনি আরও জানান, এবিটির এই গ্রুপের সদস্য ৫-৭ জন। তাদের অন্যতম সদস্য গ্রেপ্তার হওয়া মুহম্মদ ওয়ালী উল্লাহর বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুরের রামনগর গ্রামে। যিনি ৪-৫ বছর আগে অনলাইনে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য হন। তিনি বর্তমানে সংগঠনটির ‘আসকারি’ (হত্যা ও হামলা) বিভাগের সদস্য।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা জানান, এবিটির গোপনীয় বার্তায় হত্যাকাণ্ডের নির্দেশনা পেয়েছিলেন ৫-৭ সদস্যের এই সেলটি। যারা সাংগঠনিকভাবে আসকারি সদস্য হিসেবে পরিচিত। সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যা করে দেশে অস্থিরতা তৈরির জন্য কিছুদিন ধরে মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত বৈঠক করত এই দলটি।
এবিটির কর্মকাণ্ড অনুসরণকারী ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা ইন সাবকন্টিনেন্ট বা একিউআইএসের মতাদর্শী জঙ্গি সংগঠন এবিটির সদস্যরা সুযোগ পেলেই হামলা করবে। এই প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। বর্তমানে তারা অনলাইন ও সাইবার স্পেসের মাধ্যমে জঙ্গি কর্মকাণ্ডের প্রচার-প্রচারণা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য নিয়মিত গোপনে একত্রিত হওয়ার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এটিইউ-এর অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের কারণে অধিকাংশ জঙ্গি সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে গেছে। পরিকল্পিত হামলার শক্তি-সামর্থ্য কোনোটিই নেই। তারপরও কেউ কেউ লোন উলফ হামলা বা একা একা মোটিভেটেড হয়ে নাশকতার পরিকল্পনা করলেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। কারণ আমরা তাদের সব কর্মকাণ্ড সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে রেখেছি। পরিকল্পনার তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করছি।’
জঙ্গিবাদ দমন সংশ্লিষ্ট এটিইউ-এর এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবিটির সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা বা আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার (একিউআইএস) আদর্শিক মিল রয়েছে। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে সব জঙ্গি সংগঠন। সাময়িকভাবে হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে আসে সংগঠনগুলো। তবে বেশ কিছুদিন ধরে অনলাইনে সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুতের চেষ্টা করছিল এবিটি। এখন হামলা বা হত্যার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়ায় তাদের শক্তিমত্তার বিষয়টি ফের ভাবিয়ে তুলেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) আরেক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, এবিটির সংগঠনটির সাংগঠনিক কাঠামো বেশ শক্তিশালী। প্রধান চারটি শাখার মাধ্যমে সংগঠনটি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। শাখাগুলো হচ্ছে দাওয়া, মিডিয়া ও আইটি, আসকারি (হামলা বা হত্যা বাস্তবায়নকারী শাখা) এবং লজিস্টিক। এদের মধ্যে দাওয়া ও লজিস্টিক শাখার কর্মকাণ্ড সবচেয়ে বেশি। দাওয়া শাখার মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহের পাশাপাশি লজিস্টিক শাখার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের কাজ করছেন তারা। এছাড়া দাওয়া শাখার মাধ্যমে প্রত্যেক মামুরকে (প্রাথমিক সদস্য) প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা, প্রযুক্তিবিষয়ক জ্ঞান ও ইমান-আকিদার ওপরে বয়ান দেওয়া হয়। আসকারি শাখার রয়েছে তিনটি অণু বিভাগ। এগুলো হচ্ছে ইনটেল, অপস ও ল্যাব।
সিটিটিসির ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ইনটেল বিভাগের জঙ্গিরা সাধারণত গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে টার্গেট করা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে। তাদের তথ্য নিয়ে অপস বিভাগের জঙ্গিরা অপারেশন বাস্তবায়ন করে। যদিও অপারেশনের আগে ফতোয়া বোর্ডের অনুমোদন নিতে হয়। সংগঠনটির শীর্ষ নেতা জসিম উদ্দীন রাহমানি কারাগারে থাকায় আত্মগোপনে থাকা আরেক জঙ্গি নেতা চাকরিচ্যুত মেজর জিয়ার নির্দেশনাতেই এবিটির কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান মনিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত জঙ্গি সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড ভার্চুয়াল মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ। শারীরিকভাবে কাউকে আঘাত বা হত্যা করার মতো সাংগঠনিক শক্তি তাদের নেই।’
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলাকালে এবিটির মাধ্যমে বেশ কিছু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে আল-কায়েদা নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা (একিউআইএস) প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এরপর আনসার আল ইসলাম তাদের টুইটার পেজে নিজেদের একিউআইএসের বাংলাদেশ শাখা দাবি করে। আনসার আল ইসলাম ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত ১৩টি হামলার দায় স্বীকার করে। এসব ঘটনায় নিহত হন ১১ জন, যাদের অধিকাংশ ছিলেন ব্লগার। নিহতদের মধ্যে ছিলেন প্রকাশক, শিক্ষক ও সমকামীদের অধিকারকর্মী।
