দেশব্যাপী লকডাউন চলাকালে ৯৮ দশমিক ৩ শতাংশ দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৮৭ শতাংশ দরিদ্র মানুষ পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্যপ্রাপ্তির সমস্যায় পড়েছেন। দরিদ্র পরিবারগুলোর ৫ শতাংশই দিনে মাত্র একবেলা খেয়েছে। দরিদ্র মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির ওপর কভিড-১৯-এর প্রভাব নিয়ে এক জরিপ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
‘দরিদ্র মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির ওপর কভিড-১৯-এর প্রভাব’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার ভিডিও কনফারেন্সে এ সভার আয়োজন করে ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠন। একই বিষয়ে সংগঠনের পরিচালিত জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। সভাপতিত্ব করেন খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ এবং পিকেএসএফের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মহসিন আলীর সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি ছিলেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নাজমানারা খানম।
সেমিনারে বলা হয়, দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারের সহায়তা আরও বাড়াতে হবে। খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করতে বছরব্যাপী তাদের জন্য খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। দরিদ্রদের জন্য সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সব দরিদ্রের মাঝে সুষ্ঠুভাবে সহায়তা পৌঁছাতে গ্রহণযোগ্য একটি হালনাগাদ ডাটাবেজ থাকা দরকার। তাহলে খুব সহজেই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সহায়তাগুলো পৌঁছানো যাবে।
গত মে থেকে জুন পর্যন্ত দেশের ৩৭টি জেলায় প্রশ্নোত্তরের ভিত্তিতে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়। দরিদ্র মানুষ হিসেবে রিকশাচালক, হকার, দিনমজুর, ক্ষুদ্র দোকানি, কৃষি শ্রমিক, গৃহ শ্রমিকরা জরিপে অংশ নেন। সভায় জরিপের বিস্তারিত তুলে ধরেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ। তিনি বলেন, সব বিভাগেই দরিদ্র লোকেরা পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবারের তীব্র অভাবে ভুগছিলেনÑ যা তাদেরকে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকির সামনে ফেলে দিয়েছে। যদিও মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ এ সময় সাধারণ অসুস্থতায় ভুগেছেন। তুলনামূলকভাবে ময়মনসিংহ ও সিলেটে খাবারের ঘাটতি বেশি ছিল। রংপুর অঞ্চলের দরিদ্ররা খাদ্য সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুষ্টিকর খাদ্য সংকটের বেশি প্রভাব পড়েছে রাজশাহী অঞ্চলে। দরিদ্র মানুষের জরুরি খাদ্য সহায়তা সহজলভ্য করা, নগদ সহায়তাসহ অন্যান্য সহায়তা বাড়ানোর কথা বলা হয় জরিপের সুপারিশে। এছাড়া ক্ষুদ্র, মধ্যম ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোগের জন্য সরকার কর্তৃক ঘোষিত বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ অবিলম্বে কার্যকর করা ও কৃষির সরবরাহ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা।
সভায় খাদ্য সচিব বলেন, দরিদ্র মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা করোনাকালে সংকটের মধ্যে পড়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় খাদ্য, বিশেষত চাল সরবরাহের দিকটি কঠোরভাবে নজরদারি করছে। তবে শুধু চাল দিয়েই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বছরব্যাপী দরিদ্র মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ ফুড প্যাকেজ অব্যাহত রাখতে হবে।
ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে দরিদ্রদের জন্য সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে সুষ্ঠুভাবে এ সহায়তা কার্যক্রমে বেসরকারি খাত ও এনজিওদেরও যুক্ত করা দরকার। খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটা আইন থাকা অত্যন্ত জরুরি। সংবিধানে ‘অধিকার’ আকারে উল্লেখ না থাকায় মানুষ খাদ্যের জন্য আইনগত দাবি তুলতে পারেন না। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা অবশ্যই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
আলোচনায় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দেশ এখন একটি জটিল অবস্থার মধ্যে রয়েছে। লকডাউন শেষে অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুরু হলেও অবস্থার এখনো খুব উন্নতি হয়নি। আগামী দিনে আয়ের সুযোগ না বাড়লে দরিদ্র মানুষ খাদ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রে আরও খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়বেন। কারণ, টিকে থাকার জন্য মানুষের সুযোগগুলো কমে যাচ্ছে। বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. এস এম জুলফিকার আলী বলেন, পুষ্টির ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে বিগত দিনের অগ্রগতি মহামারীকালে ব্যাহত হয়েছে। সরকারকে অবশ্যই এদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
