ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক উপাচার্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গতকাল শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন তার ছেলে জিয়া হাসান ইবনে আহমদ। ৮৭ বছর বয়সী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন সর্বশেষ ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের (ইউডা) উপাচার্য ছিলেন। দুই দফা জানাজা শেষে বাদ আসর মিরপুরে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে স্ত্রী সেলিনা আহমদের কবরে একুশে পদকপ্রাপ্ত এ শিক্ষাবিদকে দাফন করা হয়।
স্বজনরা জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর কাটাবনের বাসভবনে স্ট্রোক করেন এমাজউদ্দীন আহমদ। এরপর রাত ২টায় তাকে ল্যাবএইড হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। এরপর তার মরদেহ হাসপাতাল থেকে কাঁটাবনের বাসায় নেওয়া হয়।
অধ্যাপক এমাজউদ্দীনের স্ত্রী সেলিমা আহমদ ২০১৬ সালে মারা গেছেন। অধ্যাপক দিলরুবা শওকতা আরা ইয়াসমিন ও অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন তাদের দুই মেয়ে। দুই ছেলের মধ্যে জিয়া হাসান ইবনে আহমদ যুগ্ম সচিব (বর্তমানে ওএসডি) ও তানভীর ইকবাল ইবনে আহমদ একজন চিকিৎসক।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দীন আহমদের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্ন রাজনীতিবিদ ও শ্রেণি-পেশার মানুষ। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিএনপি মহাসচিবসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা কাটাবনের বাসভবনে ছুটে যান। মির্জা ফখরুল অধ্যাপক এমাজউদ্দীনের ছেলে জিয়া হাসান ইবনে আহমদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান। এ সময় ঢাবির অধ্যাপক সদরুল আমিন, কবি আবদুল হাই শিকদার, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এরপর অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন মির্জা ফখরুল। এ সময় তিনি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিনি এভাবে হঠাৎ করে চলে যাবেন, এটা আমরা কেউ বিশ্বাস করতে পারছি না। কয়েক দিন আগেও আমরা তার সঙ্গে কথা বলেছি। তার এ চলে যাওয়া আমাদের জন্য একটি বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করল, এ শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। আমরা বিএনপির পক্ষ থেকে, দলের চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।’
এছাড়া অধ্যাপক এমাজউদ্দীনের বাসায় যান বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইকবালুর রহমান রোকন, সাবেক সাংসদ হাবিবুল ইসলাম হাবিবসহ আরও অনেকে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের জন্ম ১৯৩৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর অবিভক্ত বাংলার মালদহে (চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ভারতের কিছু অংশ)। ভারত ভাগের পর তার পরিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলে আসে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের ‘গোহাল বাড়ি’ এলাকায় পরিবারসহ দীর্ঘদিন বসবাস করেন তিনি। এমাজউদ্দীন শিবগঞ্জের আদিনা সরকারি ফজলুল হক কলেজ ও রাজশাহী কলেজে পড়ালেখা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ফজলুল হক হলের নির্বাচিত ভিপিও ছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতে এমাজউদ্দীন আহমদ বাগেরহাটের পিসি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর নীলফামারী কলেজে প্রভাষকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রংপুর কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন। চুয়াডাঙ্গা কলেজেও কিছুদিন চাকরি করেন।
বিদেশ থেকে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে এসে ১৯৭০ সালে ঢাবি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন এমাজউদ্দীন। তিনি ডক্টরেট করেন কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে। দীর্ঘদিন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করা এমাজউদ্দীন আহমদ ঢাবির প্রক্টর ও প্রো-ভিসির দায়িত্বও পালন করেছেন। ১৯৯২-৯৬ পর্যন্ত ঢাবি উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৯৮ সালে ঢাবি থেকে অবসরের পর ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভে (ইউডা) যোগ দেন।
মহান ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯৫২-পরবর্তী সময়ে ঢাবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রনেতা হিসেবে এমাজউদ্দীন আহমদ কারাবরণও করেন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির প্রথম সরকারের সময় ১৯৯২ সালে শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদানের জন্য একুশে পদক পান এমাজউদ্দীন আহমদ। বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে গঠিত শত নাগরিক কমিটির সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।
৪০ বছর ধরে এমাজউদ্দীন আহমদ তুলনামূলক রাজনীতি, প্রশাসন-ব্যবস্থা, বাংলাদেশের রাজনীতি, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক বাহিনী সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। এসব ক্ষেত্রে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় তিনি বিশেষজ্ঞ হিসেবেও প্রখ্যাত। তার লেখা গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা জার্নালে তার প্রকাশিত গবেষণামূলক প্রবন্ধের সংখ্যা শতাধিক। দেশ রূপান্তরসহ বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন তিনি। তার লিখিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কথা (১৯৬৬), মধ্যযুগের রাষ্ট্রচিন্তা (১৯৪৫), তুলনামূলক রাজনীতি : রাজনৈতিক বিশ্লেষণ (১৯৮২), বাংলাদেশে গণতন্ত্র সংকট (১৯৯২), সমাজ ও রাজনীতি (১৯৯৩), বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ (১৯৯৪), শান্তিচুক্তি ও অন্যান্য প্রবন্ধ (১৯৯৮), আঞ্চলিক সহযোগিতা, জাতীয় নিরাপত্তা (১৯৯৯), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০০০)।
শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান ও সৃজনশীল লেখার জন্য তিনি দেশ-বিদেশে বিশেষভাবে সম্মানিত হয়েছেন। সৃষ্টিশীল গবেষণা ও আলেখ্য রচনার জন্য ‘মহাকাল কৃষ্টি চিন্তা সংঘ স্বর্ণপদক’, জাতীয় সাহিত্য সংসদ স্বর্ণপদক, জিয়া সাংস্কৃতিক স্বর্ণপদক অর্জন করেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মাইকেল মধুসূদন দত্ত গোল্ড মেডেল, শেরেবাংলা স্মৃতি স্বর্ণপদক, ঢাকা সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক স্বর্ণপদক, বাংলাদেশ যুব ফ্রন্ট গোল্ড মেডেল, রাজশাহী বিভাগীয় উন্নয়ন ফোরাম স্বর্ণপদকসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বহু পুরস্কার-সম্মাননা অর্জন করেন।
বাদ জুমা কাটাবন মসজিদে এমাজউদ্দীনের প্রথম জানাজা হয়। জানাজার আগে লাশ সামনে রেখে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার বড় ছেলে জিয়াউল হাসান ইবনে আহমদ বলেন, ‘বাবার সঙ্গে এই মসজিদে (কাটাবনের মসজিদে মুনাওঅর) বহু বছর ধরে নামাজ আদায় করেছি। মসজিদে বাবা আর আসবেন না, কিন্তু আমি আসব। করোনার কারণে কয়েক মাস ধরে বাবা এই মসজিদে আসতে পারতেন না। এজন্য তিনি অনেক অনুশোচনা করতেন।’
জানাজায় অংশগ্রহণ করেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, বিএফইউজের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবিএম আবদুল্লাহ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, কবি আবদুল হাই শিকদারসহ দলীয় নেতাকর্মী, আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা।
শোক : অধ্যাপক এমাজউদ্দীনের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান। শোকবার্তায় তিনি বলেন, ‘একুশে পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন একজন প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। বয়োজ্যেষ্ঠ এ শিক্ষাবিদ ছিলেন মৃদুভাষী ও সৌজন্য বোধসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তার মৃত্যুতে জাতি একজন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদকে হারাল।’ প্রয়াত এমাজউদ্দীন আহমদের আত্মার শান্তি ও তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনাও জানিয়েছেন ঢাবি উপাচার্য।
এছাড়া আরও শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান।
