করোনাকালেও থেমে নেই বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সারা দেশে গ্রেপ্তারের আগে-পরে ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শারীরিক নির্যাতনে ১৫৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে পুলিশের নির্যাতনে ১১ ও দুজন হেফাজতে অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন।
মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে মার্চের প্রথম দিকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। এরপর ভাইরাস মোকাবিলায় সরকার লম্বা সময় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে অঘোষিত লকডাউন জারি করে। কিন্তু মহামারী পরিস্থিতিতেও বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর চিত্র পাল্টায়নি। পরোয়ানা কিংবা বিনা পরোয়ানায় আটক ও গ্রেপ্তারের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও নির্যাতনজনিত কারণে কারও মৃত্যু হলে ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ)’ আইনে বিচারের বিধান রয়েছে। এই আইনের অপরাধ জামিন অযোগ্য ও অ-আপসযোগ্য হবে। হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণ হলে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড এবং মৃত্যু প্রমাণ হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড ও ক্ষতিগ্রস্তকে অতিরিক্ত ২ লাখ টাকা দিতে হবে। এ ধরনের অপরাধে প্ররোচনার শাস্তি ১০ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। কিন্তু ২০১৩ সালে আইনটি হলেও বিচারিক প্রয়োগ নেই বললেই চলে। এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কারও বিরুদ্ধে বিচার বা দৃষ্টান্তমূলক সাজার নজির নেই। দুই-একটি ঘটনা তদন্ত হলেও শেষ পর্যন্ত অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি। এজন্য হেফাজতে নির্যাতন, মৃত্যু ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বাড়ছে বলে জানান তারা।
সম্প্রতি হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর একাধিক ঘটনা উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। গত ৬ জুলাই চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানা-পুলিশের রিমান্ডে থাকা মাদক মামলার আসামি ভ্যানচালক আফসার আলীর (৩৫) মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং ক্ষতিপূরণের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন আসকের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না। আসকের আইনজীবী ইয়াদিয়া জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আফসার আলীর মৃত্যুর ঘটনায় গত ১৪ জুলাই পুলিশ হাইকোর্টে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। এতে বলা হয়, আফসার আলী আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু এ প্রতিবেদন নিয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে। কারণ, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী হাসপাতালে নেওয়ার পর আফসার আলীর বুকে ব্যথা ওঠে এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। তাকে নির্যাতন করা হয়েছে বলে পরিবার অভিযোগ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিচারিক তদন্তের আর্জি জানালে গত ১৫ জুলাই মৌখিক আদেশে হাইকোর্ট দায়রা আদালতে আবেদনের নির্দেশ দেয়। সেখানে আবেদন গ্রহণ করা না হলে হাইকোর্ট বিষয়টি দেখবে বলেছে।’
গত ৩ জুন যশোরে কলেজছাত্র ইমরান হোসেনকে স্থানীয় একটি পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ধরে নির্যাতন করে। ঘুষ নিয়ে পরে ছেড়ে দেয়। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তির পর নির্যাতনে ইমরানের কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত পাওয়া যায়। পুলিশ ইমরানকে মাদকাসক্ত দাবি করলেও ডোপ টেস্টে তা ধরা পড়েনি। এ ঘটনায় গত ৬ জুলাই হাইকোর্টের একটি ভার্চুয়াল বেঞ্চ বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
ফৌজদারি বিধানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আদালতের পরোয়ানা বা বিনা পরোয়ানায় কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করলে ওই সময় থেকে হেফাজত ধরে নেওয়া হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা, সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং ১৬৭ ধারা অনুযায়ী পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের (রিমান্ড) বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শারীরিক নির্যাতন করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাংবিধানিক অধিকার, মানবাধিকার ও আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। গণতন্ত্রের ভিত হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং এর কাছেই আত্মসমর্পণ করতে হবে। কী কারণে ক্রসফায়ার হচ্ছে, মানুষ মারা যাচ্ছে, তদন্ত হলে সবাই জানতে পারত। কিন্তু এখন কী কারণে এসব ঘটনার তদন্ত হয় না। অপরাধী যেই হোক না কেন আইনি সহায়তা পাওয়া তার অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন কার্যকর করা গেলে হয়তো এ ধরনের ঘটনা কমে আসত।’
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বেড়েই চলেছে। করোনাকালেও তা থেমে নেই। রাষ্ট্রযন্ত্র বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেওয়ায় এমন হচ্ছে। আমাদের কারও কারও মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের মহৌষধ ক্রসফায়ার। দ্রুত স্বস্তি প্রকাশে এটিকেই হাতিয়ার করা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিগত ১০ বছরে হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু নিবারণ আইনে ১৭টির মতো মামলা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো মামলার বিচার নিষ্পত্তি হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনীহার কারণে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বেশিরভাগ মামলায় অভিযোগপত্র পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।’
