সাহেদের সঙ্গে সাবরিনা-আরিফের যোগসূত্র খুঁজছে গোয়েন্দারা

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২০, ০৬:২৬ এএম

শুধু করোনার সনদ নয়, মাস্ক ও পিপিই সরবরাহ নিয়েও বড় ধরনের দুর্নীতি করেছেন বহুমাত্রিক জালিয়াতিতে আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম। তার চেয়েও কম যাননি ডা. সাবরিনা-আরিফ দম্পতি। করোনার ক্রান্তিকালে এই তিন চক্র জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। করোনা পরীক্ষার নকল সনদের পাশাপাশি তারা নকল মাস্ক ও পিপিই সরবরাহ করে হাতিয়ে নিয়েছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। এর মাধ্যমে বিপন্ন করে তুলেছেন চিকিৎসক ও নার্সসহ হাজার হাজার মানুষের জীবন। তাদের ওই কেলেংকারি প্রকাশ্যে আসার পর এখন গোয়েন্দারা তাদের তিনজনের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি-না তার খোঁজ করছেন। কারণ হিসেবে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের প্রতারণার টার্গেট ও কৌশলে যথেষ্ট সামঞ্জস্য পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে তারা তিনজনেই রয়েছেন ডিবির হেফাজতে। সেখানে তাদের তিনজনের একে অপরের সঙ্গে যোগসাজশ আছে কি-না তা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক ডিবি কর্মকর্তা গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

প্রাথমিক তদন্তে সাহেদের বিরুদ্ধে একটি প্রতিষ্ঠান খুলে সরকারি অনুমতি নিয়ে হাসপাতালের চিকিৎসকদের মাস্ক-পিপিই সরবরাহ করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটির বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই, যা শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। একইভাবে জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা চৌধুরী চিকিৎসক হিসেবে তার ফেইসভ্যালু ও পরিচিতিকে পুঁজি করে প্রতারণা করেছেন বিভিন্ন মহলে। ভুক্তভোগীরা এখন তাদের বিচার চেয়ে ডিবি ও র‌্যাব কার্যালয়ে ছুটছেন। ডিবি জানিয়েছে, সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতাল যখন করোনার নমুনা পরীক্ষা ছাড়াই নকল রিপোর্ট দিয়েছে, তখন তারাই আবার একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে নকল মাস্ক ও পিপিই সরবরাহ করেছে। রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ আলবার্ট গ্লোবাল গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি লিমিটেড নামে একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান খুলে সরকারকে নিম্নমানের মাস্ক ও পিপিই সরবরাহ করেন। এই নামে আসলে তার কোনো পোশাক কারখানা নেই। ফেইসবুকে পেজ খুলে এই প্রতারণা শুরু করেছিলেন তিনি।

এ সম্পর্কে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন সাংবাদিকদের জানান আলবার্ট গ্লোবাল গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি লিমিটেড নামে একটি ফেইসবুক পেজ খুলেছিল সাহেদ। আসলে এই নামে তার কোনো কারখানা বা প্রতিষ্ঠান নেই। সাহেদের এই প্রতিষ্ঠান করোনা সংক্রমণের প্রথম দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নিম্নমানের মাস্ক ও পিপিই সরবরাহ করে।

আবদুল বাতেন বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানের কথা বলে কাজ নিয়ে সাহেদ বিভিন্ন কারখানায় সাবকন্ট্রাকে মাস্ক ও পিপিই বানানোর কাজ দিত। সেখান থেকে এসব সুরক্ষা সামগ্রী তৈরি করে সরবরাহ করত। সাহেদের প্রতারণার নতুন নতুন তথ্য পাচ্ছে গোয়েন্দা পুলিশ। তদন্ত চলছে। আরও অনেকেই প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ নিয়ে আসছেন। সাহেদ কীভাবে এত টাকা-পয়সার মালিক হলো সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ডিবির পাশাপাশি অন্য সংস্থাও তদন্ত করে দেখছে।’

সাহেদের মতোই একই কায়দায় করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা না করেই রিপোর্ট দিয়েছে ডা. সাবরিনা ও আরিফ দম্পতি। তারাও হাজার হাজার মানুষের নমুনা সংগ্রহ না করেই টেবিলে বসে করোনার সনদ তৈরি করে বিক্রি করেছে। একপর্যায়ে তারা করোনার অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী মাস্ক, পিপিই ও স্যানিটাইজারও সরকারকে সরবরাহ করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ধরা পড়ে যাওয়ায় তা আর হয়ে ওঠেনি। সাবরিনাকে গত ১২ জুলাই গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রথমে তাকে তেজগাঁও থানা পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকলেও সন্তোষজনক উত্তর দিতে না পারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ১৩ জুলাই তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। ১৭ জুলাই তাকে আরও দুই দিনের রিমান্ডে পাঠায় আদালত। এ সংক্রান্ত মামলার তদন্তের বিষয়ে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. আবদুল বাতেন বলেন, ‘ডা. সাবরিনা চিকিৎসক হিসেবে তার ফেইসভ্যালু এবং পরিচিতিকে পুঁজি করে প্রতারণা করেছেন। তিনি সরকারি সংস্থার কাজ করছিলেন। তদন্তে তার যেসব অনিয়মের তথ্য আমরা পাব, সেগুলো সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও মন্ত্রণালয়কে (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়) জানাব। তারা অনিয়ম বিবেচনা করবে যে, সেগুলো ডিপার্টমেন্টাল অফেন্স নাকি ক্রিমিনাল অফেন্স। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা পদক্ষেপ নেব।’

সাবরিনার অনিয়মের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে আবদুল বাতেন বলেন, ‘তদন্তে যাদের সংশ্লিষ্ট মনে হবে তাদেরই আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করব।’

সাহেদকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ ও তার মামলার তদন্তের বিষয়ে আবদুল বাতেন বলেন, ‘সাহেদ আলবার্ট গ্লোবাল গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি নামে একটি প্রতিষ্ঠান খুলে সরকারিভাবে অনুমতি নিয়ে হাসপাতালের চিকিৎসকদের মাস্ক-পিপিই সরবরাহ করতেন। অথচ প্রতিষ্ঠানটির কোনো অস্তিত্ব নেই। তিনি করোনাকালে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে একটি ফেইসবুকে পেজ খুলেই পিপিই সরবরাহের সাব-কন্ট্রাক্ট নিয়ে পিপিই সরবরাহ করছিলেন। এছাড়া তার ঠিকাদারি ব্যবসা ও প্রতারণার বিষয়ে আমরা আরও তথ্য পেয়েছি। উত্তরাসহ কয়েকটি থানায় এ সংক্রান্ত পাঁচটি মামলাও হয়েছে।’

এদিকে র‌্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাহেদের মামলাটির তদন্তভার ডিবি থেকে র‌্যাবে গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের বিষয়টি সম্পন্ন হয়ে গেলেই র‌্যাব দায়িত্বভার গ্রহণ করবে। র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, সাহেদকে গ্রেপ্তারের আগে পরের বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। বিশেষ করে সাহেদ সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সময় আশ্রয় প্রশ্রয় ও সহয়তাকারীদেরও চিহ্নিত ও আটক করা হবে। সাহেদ দেশের তিনটি সীমান্ত এলাকা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নেন সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার শাখরা কোমরপুর সীমান্ত। সেখানে দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়াটা নিরাপদ মনে হয়েছে তার কাছে। নিজ এলাকার চিরচেনা সীমান্তকেই তিনি বেছে নেন। এজন্য একজন দালালের সঙ্গে মোটা অঙ্কের টাকার চুক্তিও করেছিলেন। যদিও তা কোনো কাজে আসেনি। ঘটনার পর থেকেই পিছু লেগে থাকা র‌্যাবের জালে তাকে ধরা পড়তে হয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গতকাল সন্ধ্যায় র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারাই সাহেদকে পালাতে সাহায্য করেছিল তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে। বিশেষ করে দেবহাটার নৌকা পাড়ি দেওয়ার সহায়তাকারী বাচ্চু দালালকে ধরার জন্য র‌্যাব সক্রিয় রয়েছে।’

করোনা পরীক্ষার নামে প্রতারণার অভিযোগে গত ৬ জুলাই বিকালে রাজধানীর উত্তরা ও মিরপুরে রিজেন্ট হাসপাতাল এবং অফিসে অভিযান চালায় র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। অভিযানে হাসপাতাল দুটি সিলগালা করে দেওয়া হয়। গ্রেপ্তার করা হয় সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের। ১৫ জুলাই ভোরে সাতক্ষীরার সীমান্ত এলাকা থেকে র‌্যাব সাহেদকে গ্রেপ্তার করে। সাহেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, জাল টাকা, প্রতারণাসহ একাধিক মামলা হয়েছে। বর্তমানে সাহেদ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের রিমান্ডে রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত