নগরীর ডবলমুরিং থানার আগ্রাবাদে কিশোর মারুফের আত্মহত্যার ঘটনায় সাদাপোশাকে ঘটনাস্থলে যাওয়া ডবলমুরিং থানার এসআই হেলাল খানের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
গতকাল সোমবার দুপুরে তদন্ত কমিটির প্রধান নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (ডিবি-পশ্চিম) মো. মনজুর মোর্শেদ এই প্রতিবেদন সিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন। এরপর অভিযুক্ত এসআই হেলালকে সাময়িক বরখাস্ত ও ওসি সদীপ কুমার দাশকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে। নগর পুলিশের উপকমিশনার (পশ্চিম) ফারুক উল হক বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে এসআই হেলাল এককভাবে ঘটনার জন্য অভিযুক্ত হয়েছেন। তাকে বরখাস্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া ঘটনায় থানার ওসির ‘তদারকির ঘাটতি’ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ জন্য ডবলমুরিং থানার ওসি সদীপ কুমার দাশকে শোকজ করা হয়েছে। সাত কর্মদিবসের মধ্যে তাকে জবাব দিতে হবে।
গত বৃহস্পতিবার রাত ৭টার দিকে ডবলমুরিং থানার দুই সোর্স এসে মারুফের বাসার পেছনে ঘুরতে থাকে। কয়েক দিন আগে বাসায় চুরি হওয়ায় মারুফ কে বা কারা উঁকি দিচ্ছে দেখেই চোর চোর বলে স্থানীয়রাসহ মিলে তাদের পিটুনি দেয়। এরপর সাদাপোশাকে এসআই হেলাল মারুফকে পিটিয়ে টাকা দাবি করেন, তাকে আটকের চেষ্টা করেন। তখন মারুফের মা-বোন বাধা দেন। ধস্তাধস্তিতে মারুফের বোন আহত হলে তাকে মাসহ হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ। এর মধ্যে রাতেই মারুফ বাসায় ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করে। ঘটনার পর রাতেই বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভের মুখে সিএমপির পশ্চিম জোনের উপকমিশনার ফারুক উল হক অভিযুক্ত এসআই মো. হেলালকে ক্লোজ করার ঘোষণা দেন। এরপর পরিস্থিতি শান্ত হয়।
এ ঘটনার পর প্রথমে সিএমপির ডবলমুরিং জোনের সহকারী কমিশনার শ্রীমা চাকমাকে প্রধান ও ডবলমুরিং থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জহির হোসেনকে সদস্য করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরে সিএমপি কমিশনারের নির্দেশে ডিবির উপকমিশনার মনজুর মোর্শেদকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি করা হয়। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন ডবলমুরিং জোনের সহকারী কমিশনার শ্রীমা চাকমা ও বিশেষ শাখার সহকারী কমিশনার নুরুল আফসার ভূঁইয়া।
তদন্ত কমিটির প্রধান সিএমপির উপকমিশনার মনজুর মোর্শেদ বলেন, তদন্ত শেষে আমরা পাঁচ দফা সুপারিশসহ ১৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। আমরা মারুফের মা-বোনসহ পরিবারের ৬ সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছি। ঘটনাস্থলে থাকা ১১ জন প্রত্যক্ষদর্শী এবং ১৫ জন পুলিশ সদস্যের বক্তব্য নিয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদনে আমরা উল্লেখ করেছি এসআই হেলাল কাউকে কিছু অবহিত না করে, থানায় জিডি না করে সাদাপোশাকে ঘটনাস্থলে যান। সিনিয়র অফিসারদের মৌখিকভাবেও কিছু জানাননি। এভাবে সাদাপোশাকে অভিযানে যাওয়ার নিয়ম নেই।
তিনি বলেন, সিনিয়র অফিসারদের অবহিত না করেই সেখানে গিয়ে এসআই হেলাল সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন। মারুফ ও তার মা-বোনকে মারধর এবং ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেন। যার কারণে এই অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসআই হেলালকে বরখাস্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে এবং ওসি অধস্তন অফিসারের শৃঙ্খলাপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করতে পারেননি এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন। এসআই হেলালের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
১২ এসআইকে একযোগে বদলি
এদিকে মারুফের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন থানায় কর্মরত ১২ জন উপপরিদর্শককে (এসআই) একযোগে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে আছেন এই হেলালও। তবে এই বদলি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ বলে জানান সিএমপির উপকমিশনার (সদর) আমীর জাফর। তিনি বলেন, তাদের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বদলি করা হয়েছে। ডবলমুরিং থানার ঘটনার সঙ্গে এই বদলির সম্পর্ক নেই। এসআইদের বদলির বিষয়টি নিয়ম অনুযায়ী এক থানা থেকে বদলি করে অন্য থানায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এক থানায় থাকায় এটি করা হয়েছে। তবে সবাইকে ‘অ্যালার্ট’ করার জন্য এই আদেশ।
